ইসমাইল হোসেন বাবু:
পুণ্য সেবার মধ্য দিয়ে শেষ হলো কুষ্টিয়ার কুমারখালীর লালন আঁখড়াবাড়ীতে চলা সাধুদের সঙ্গ। সেবা শেষে সাধু ও লালন অনুসারীরা ফিরে যাচ্ছেন তাদের নিজ নিজ আশ্রমে।
আধ্যাত্মিক সাধক ফকির লালন শাহ–এর স্মরণে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়ার আঁখড়াবাড়িতে একদিনের জন্য বসেছিল সাধুদের হাট। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পবিত্র রমজানের কারণে মাত্র একদিনের আয়োজন রাখলেও ভক্ত-অনুসারীদের উপস্থিতি ছিল ব্যাপক।
গতকাল ২ মার্চ সোমবার বিকেলে রাখাল সেবা ও রাতে অধিবাসের মধ্য দিয়ে শুরু হয় সাধুসঙ্গ। আজ মঙ্গলবার সকালে বাল্যসেবা এবং দুপুরে পূর্ণসেবার মধ্য দিয়ে শেষ হয় লালন দোল উৎসব।
বাউল সম্রাট লালন শাহ জীবদ্দশায় ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে প্রতি বছর চৈত্রের দোলপূর্ণিমার রাতে বাউলদের নিয়ে সাধুসঙ্গ উৎসব করতেন। ১২৯৭ বঙ্গাব্দের ১ কার্তিক তাঁর মৃত্যুর পরও ভক্ত-অনুসারীরা এ উৎসবের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন।
প্রতি বছর দোলপূর্ণিমা উপলক্ষে লালন আখড়াবাড়ি প্রাঙ্গণে বসে সাধুদের মিলনমেলা। জীবদ্দশায় লালন সাঁই দোলের রাতে ভক্ত-শিষ্যদের নিয়ে সাধুসঙ্গে মিলিত হতেন। তার দেহত্যাগের পর সেই রেওয়াজ অনুসরণ করেই আয়োজন করা হয় দোল উৎসব।
তবে এবার রমজান মাস চলমান থাকায় অনুষ্ঠানসূচি সংক্ষিপ্ত করে লালন একাডেমি। আখড়াবাড়ি প্রাঙ্গণে ছিল না গ্রামীণ মেলা বা বড় পরিসরের সাংস্কৃতিক আয়োজন। কেবল ভক্ত-অনুসারীরা নিজস্ব রীতি অনুযায়ী সাধুসঙ্গের মধ্য দিয়েই পালন করেন উৎসব।
দূর-দূরান্ত থেকে আগত সাধুভক্তরা খণ্ড খণ্ড আসন গেড়ে বসে প্রচার করেন লালনের মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক দর্শন। রাতভর চলে আধ্যাত্মিক আলোচনা। শেষপর্যন্ত পূর্ণ সেবা ও প্রার্থনার মাধ্যমে সমাপ্তি ঘোষণা করা হয় সাধুসঙ্গের।
সরেজমিন দেখা যায়, পুরো আখড়াবাড়িতে যেন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সাধু, বাউল, লালনভক্ত ও অনুসারীদের গান, আলোচনা আর ভাব বিনিময়ে প্রাঙ্গণজুড়ে বিরাজ করে অন্যরকম এক আধ্যাত্মিক পরিবেশ।
লালন মাজার প্রাঙ্গণ ও আঁখড়াবাড়িতে অবস্থানরত সাধুদের একসঙ্গে পরিবেশন করা হয় দুপুরের সেবা—সিদ্ধ চালের সাদা ভাত, রুই মাছ, কলাইয়ের ডাল, আলুর সবজি ও দই।
দৌলতপুর থেকে আসা ফকির শরাফত আলী বলেন, সাঁইজির বাণী নিয়ে ফিরে যাচ্ছি আপন ধামে। আবার আসবো তিরোধান দিবসে। আমরা সাধু ফকিররা অপেক্ষায় থাকি কবে আসবে আবার এই দিন, যেখানে একসঙ্গে সাঁইজির বাণী শুনবো।
ফকির নহির শাহ বলেন, এই বিদায়ের মুহূর্ত আমাদের কাছে সবচেয়ে কষ্টের সময়। এই আশ্রম ছেড়ে যেতে মন চায় না।
দাউদ আলী শাহ বলেন, লালনের বাণী অনুসরণ করলে সমাজ থেকে মারামারি-হানাহানি, অন্যায়-অত্যাচার দূর হয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় মানবসেবা—এই কথাই সাঁইজি তাঁর গানে বলে গেছেন।
সাধুসঙ্গে অংশ নেওয়া কয়েকজন ভক্ত জানান, জাঁকজমক না থাকলেও লালনের দর্শন ও সাধুসঙ্গই তাদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। বাহ্যিক আয়োজনের চেয়ে অন্তরের ভক্তিই এই উৎসবের মূল শক্তি—“মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।”
কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আখতার বলেন, গতকাল থেকে লালন উৎসব ২০২৬ শুরু হয়েছিল। সন্ধ্যায় রাখাল সেবা, রাতে অধিবাস, ভোরে বাল্যসেবা এবং সর্বশেষ পূর্ণসেবার মাধ্যমে লালন দোল উৎসবের সমাপ্তি ঘটে।
লালন একাডেমির শিক্ষার্থী মুসলিমা খাতুন বলেন, “সাঁইজি মানুষকে ভালোবাসা ও সৎপথে চলার শিক্ষা দিয়েছেন। মানুষকে ভালোবাসার মাধ্যমেই স্রষ্টার কাছে পৌঁছানো যায়। তাই তিনি বলেছেন—মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।”

সাতক্ষীরার শ্যামনগরে দুই সংখ্যালঘু পরিবারকে দেশছাড়ার হুমকি 
ইসমাইল হোসেন বাবু, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার 





















