ঢাকা , শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo কুষ্টিয়া সীমান্তে বিএসএফের পুশইন চেষ্টা, বিজিবির বাধায় ফিরে গেল ৪ জন Logo ঠাকুরগাঁওয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ও জেলা শিক্ষা অফিসের যৌথ পরিচ্ছন্নতা অভিযান Logo ১৫ বছর পর ভাঙ্গার কুমার নদে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচঃ লাখো মানুষের ঢল। Logo আলফাডাঙ্গা প্রেসক্লাবে লাইব্রেরি উদ্বোধন Logo রায়ের পর বদলে গেল গোগ্রামের পাঁচ বছরের নির্বাচনী হিসাব Logo শতবর্ষী সরকারি খাল দখলমুক্তে অভিযান, মালামাল স্পট নিলামে Logo মধুখালী থানার এএসআই শরীফুলের সাফল্য, ৬২ হারানো মোবাইল উদ্ধার Logo বিদ্যুৎ সংকটে গঙ্গাচড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সোলার-আইপিএস দিলেন জিওন Logo নরসিংদীর চরাঞ্চলে যৌথ অভিযান, অস্ত্র-গুলাবারুদ ও ১৩৬ ককটেলসহ গ্রেপ্তার ৩ Logo সারাদেশে জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস-২০২৬ পালিত
প্রতিনিধি নিয়োগ
সারা দেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আপনি আপনার এলাকায় সাংবাদিকতা পেশায় আগ্রহী হলে যোগাযোগ করুন। Hotline- +880 1728311111

কুষ্টিয়ায় ভুল চিকিৎসায় ১০ শিশুর জীবন বিপন্ন

ইসমাইল হােসেন বাবুঃ

কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে এক পল্লী চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসায় অন্তত ১০ শিশুর জীবন বিপন্ন হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শিশুদের কারো মুখ অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাচ্ছে। আবার কারো মুখে গজাচ্ছে লোম। শরীরের জ্বালা যন্ত্রণার পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে ক্ষত। তারা ভুগছে হরমোনজনিত রোগে।

 

এমন পরিস্থিতিতে ওই চিকিৎসকের শাস্তির চেয়ে গত রোববার ( ৮ মার্চ) দুপুরে ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ দেন ওই শিশুদের অভিভাবকরা।

 

অভিযুক্ত পল্লী চিকিৎসকের নাম হাফেজ মো. ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ (২৮। তিনি উপজেলার শিলাইদহ ইউনিয়নের দাড়িগ্রাম এলাকার রশিদ শেখের ছেলে। তার বেলগাছি গগণ হরকরা মোড়ে বেলগাছী মেডিকেল হল নামে একটি চেম্বার রয়েছে।

 

লিখিত অভিযোগকারীদের মধ্যে একজন উপজেলার শিলাইদহ ইউনিয়নের বড় মাজগ্রামের কৃষক আশরাফুলের মেয়ে তাসলিমা খাতুন।

 

দুপুরে সরেজমিন দেখা যায়, ঘরের বারান্দায় তিন শিশু সুমাইয়া (৬), রাফাত ( ৩) ও তাইবাকে ( ৬ মাস) নিয়ে বসে আছেন তাদের মা তাসলিমা খাতুন। শিশুদের মুখমণ্ডল ফোলা, জন্মেছে লোম। জ্বালা যন্ত্রণায় কাঁদছে সবার ছোট তাইবা। আর মায়ের চোখেমুখে হতাশার ছাপ।

 

এ সময় তাসলিমা খাতুন অভিযোগ করে বলেন, তিনমাস আগে সন্তানদের শরীরে চুলকানি রোগ দেখা দেয়। তখন বেলগাছি এলাকার ডাক্তার ইব্রাহিমের কাছে গিয়েছিলাম। ইব্রাহিম ‘আলফাকর্ট’ নামের একটি ইনজেকশন দেন। ইনজেকশন দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে সন্তানরা কাঁদতে শুরু করেন। এরপর আস্তে আস্তে ওদের মুখ অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যায়, ইনজেকশনের স্থানে ক্ষত তৈরি হয়। সম্প্রতি মুখে লোম গজাচ্ছে। পরে কুষ্টিয়ার এক ভালো চিকিৎসকের কাছে গেলে তিনি বলেন, ভুল চিকিৎসায় এমন হয়েছে।

 

তাসলিমা বলেন, বড় ডাক্তার বলেছেন ভুল চিকিৎসার কারণে শিশুদের হরমোনজনিত রোগ হয়েছে। ভালো হতে সময় লাগবে। আমি ভুয়া চিকিৎসক ইব্রাহিমের বিচার চাই।

 

একই এলাকার জাহিদ হোসেনের স্ত্রী মৌ খাতুন বলেন, ৬ মাস আগে মেয়ে মরিয়ম (৭) ও ছেলে ইউসুফের (২) শরীরে চুলকানি দেখা যায়। সেজন্য ইব্রাহিম ডাক্তারের কাছে গেছিলাম। ডাক্তার ‘আলফাকর্ট’ ইনজেকশন দিলে ছেলে-মেয়ে দুজনই অসুস্থ হয়ে পড়ে। বর্তমানে মেয়ের মুখে ছেলেদের মত লোম গজিয়েছে। শরীরে জ্বালাপোড়া করে। কুষ্টিয়ার এক চিকিৎসক দেখানো হচ্ছে। চিকিৎসক বলেছেন হরমোনজনিত সমস্যা। সেরে উঠতে সময় লাগবে।

 

তার ভাষ্য, ডাক্তার সেজে ইব্রাহিম ভুল চিকিৎসা করছেন। এতে অনেক শিশুর জীবন এখন হুমকিতে পড়েছে। সঠিক বিচারের আশায় ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।

 

এ বিষয়ে শিলাইদহ ইউনিয়নের দাড়িগ্রামের ফারুক হোসেনের ছেলে খাইরুল ইসলাম বলেন, নামের আগে চিকিৎসক লিখে ইব্রাহিম ভুল চিকিৎসা দিচ্ছে। এই ভুয়া ডাক্তারের চিকিৎসায় আমার ১৩ মাসের মেয়ে খাদিজার জীবন বিপন্ন। হরমোনজনিত সমস্যায় ভুগছে। বর্তমানে মেয়েকে রাজশাহী মেডিকেলে চিকিৎসা দিচ্ছি। ভুয়া ডাক্তার ইব্রাহিমের কঠিন বিচার চাই।

 

এ দিকে ঘটনার ভুল স্বীকার করে পল্লী চিকিৎসক হাফেজ মো. ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ বলেন, মানবিক বিভাগ থেকে ২০১৪ সালে এসএসসি পাশ করে একটি কলেজ থেকে ডিগ্রি সম্পন্ন করেছি। ২০২৩ সালে কুমারখালী হাসপাতাল থেকে তিন মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে আসছি। আগে না বুঝে সিল-প্যাড ও ডাক্তার পদবি ব্যবহার করতাম।’

 

তার ভাষ্য, তিনি নিয়ম মেনে চুলকানি রোগীদের আলফাকর্ট ইনজেকশন দিয়েছিলেন।

 

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা চিকিৎসক খালেদ সাইফুল বলেন, ‘একজন পল্লী চিকিৎসক সিল, প্যাডসহ নাম ব্যবহার করতে পারেন না। আবার এ ধরনের চিকিৎসাও দিতে পারেন না। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

 

কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী রেজিস্টার (মেডিসিন) চিকিৎসক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘আলফাকর্ট এক ধরনের স্টোরায়েড ওষুধ। এটা ব্যবহার করলে দ্রুত ঠাণ্ডা, কাশি, জ্বর, চুলকানি কমে যায়, তাৎক্ষণিকভাবে উন্নতি হয়। তবে এটার দীর্ঘমেয়াদী পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হিসেবে চুলকানি-দাদ এসবের পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। এটা বয়স অনুযায়ী ডোজ দিতে হয়। তবে পল্লী চিকিৎসক বা প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে এটা দেয়া যায় না।’

 

তিনি আরও বলেন, ‘শুধু আরএমপি করে এ ধরনের চিকিৎসা দেয়া যায় না।’

 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার বলেন, ‘ভুল চিকিৎসায় অন্তত ১০ শিশুর শরীরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়ার লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

Tag :
এই অথরের আরো সংবাদ দেখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

ম্যাপে আটলান্টিকের নাম বদলে নিজের নাম বসাতে গুগল সিইওকে ট্রাম্পের ফোন

error: Content is protected !!

কুষ্টিয়ায় ভুল চিকিৎসায় ১০ শিশুর জীবন বিপন্ন

আপডেট টাইম : ০৫:৪৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১০ মার্চ ২০২৬
ইসমাইল হোসেন বাবু, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার :

ইসমাইল হােসেন বাবুঃ

কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে এক পল্লী চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসায় অন্তত ১০ শিশুর জীবন বিপন্ন হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শিশুদের কারো মুখ অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যাচ্ছে। আবার কারো মুখে গজাচ্ছে লোম। শরীরের জ্বালা যন্ত্রণার পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে ক্ষত। তারা ভুগছে হরমোনজনিত রোগে।

 

এমন পরিস্থিতিতে ওই চিকিৎসকের শাস্তির চেয়ে গত রোববার ( ৮ মার্চ) দুপুরে ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ দেন ওই শিশুদের অভিভাবকরা।

 

অভিযুক্ত পল্লী চিকিৎসকের নাম হাফেজ মো. ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ (২৮। তিনি উপজেলার শিলাইদহ ইউনিয়নের দাড়িগ্রাম এলাকার রশিদ শেখের ছেলে। তার বেলগাছি গগণ হরকরা মোড়ে বেলগাছী মেডিকেল হল নামে একটি চেম্বার রয়েছে।

 

লিখিত অভিযোগকারীদের মধ্যে একজন উপজেলার শিলাইদহ ইউনিয়নের বড় মাজগ্রামের কৃষক আশরাফুলের মেয়ে তাসলিমা খাতুন।

 

দুপুরে সরেজমিন দেখা যায়, ঘরের বারান্দায় তিন শিশু সুমাইয়া (৬), রাফাত ( ৩) ও তাইবাকে ( ৬ মাস) নিয়ে বসে আছেন তাদের মা তাসলিমা খাতুন। শিশুদের মুখমণ্ডল ফোলা, জন্মেছে লোম। জ্বালা যন্ত্রণায় কাঁদছে সবার ছোট তাইবা। আর মায়ের চোখেমুখে হতাশার ছাপ।

 

এ সময় তাসলিমা খাতুন অভিযোগ করে বলেন, তিনমাস আগে সন্তানদের শরীরে চুলকানি রোগ দেখা দেয়। তখন বেলগাছি এলাকার ডাক্তার ইব্রাহিমের কাছে গিয়েছিলাম। ইব্রাহিম ‘আলফাকর্ট’ নামের একটি ইনজেকশন দেন। ইনজেকশন দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে সন্তানরা কাঁদতে শুরু করেন। এরপর আস্তে আস্তে ওদের মুখ অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যায়, ইনজেকশনের স্থানে ক্ষত তৈরি হয়। সম্প্রতি মুখে লোম গজাচ্ছে। পরে কুষ্টিয়ার এক ভালো চিকিৎসকের কাছে গেলে তিনি বলেন, ভুল চিকিৎসায় এমন হয়েছে।

 

তাসলিমা বলেন, বড় ডাক্তার বলেছেন ভুল চিকিৎসার কারণে শিশুদের হরমোনজনিত রোগ হয়েছে। ভালো হতে সময় লাগবে। আমি ভুয়া চিকিৎসক ইব্রাহিমের বিচার চাই।

 

একই এলাকার জাহিদ হোসেনের স্ত্রী মৌ খাতুন বলেন, ৬ মাস আগে মেয়ে মরিয়ম (৭) ও ছেলে ইউসুফের (২) শরীরে চুলকানি দেখা যায়। সেজন্য ইব্রাহিম ডাক্তারের কাছে গেছিলাম। ডাক্তার ‘আলফাকর্ট’ ইনজেকশন দিলে ছেলে-মেয়ে দুজনই অসুস্থ হয়ে পড়ে। বর্তমানে মেয়ের মুখে ছেলেদের মত লোম গজিয়েছে। শরীরে জ্বালাপোড়া করে। কুষ্টিয়ার এক চিকিৎসক দেখানো হচ্ছে। চিকিৎসক বলেছেন হরমোনজনিত সমস্যা। সেরে উঠতে সময় লাগবে।

 

তার ভাষ্য, ডাক্তার সেজে ইব্রাহিম ভুল চিকিৎসা করছেন। এতে অনেক শিশুর জীবন এখন হুমকিতে পড়েছে। সঠিক বিচারের আশায় ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে।

 

এ বিষয়ে শিলাইদহ ইউনিয়নের দাড়িগ্রামের ফারুক হোসেনের ছেলে খাইরুল ইসলাম বলেন, নামের আগে চিকিৎসক লিখে ইব্রাহিম ভুল চিকিৎসা দিচ্ছে। এই ভুয়া ডাক্তারের চিকিৎসায় আমার ১৩ মাসের মেয়ে খাদিজার জীবন বিপন্ন। হরমোনজনিত সমস্যায় ভুগছে। বর্তমানে মেয়েকে রাজশাহী মেডিকেলে চিকিৎসা দিচ্ছি। ভুয়া ডাক্তার ইব্রাহিমের কঠিন বিচার চাই।

 

এ দিকে ঘটনার ভুল স্বীকার করে পল্লী চিকিৎসক হাফেজ মো. ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ বলেন, মানবিক বিভাগ থেকে ২০১৪ সালে এসএসসি পাশ করে একটি কলেজ থেকে ডিগ্রি সম্পন্ন করেছি। ২০২৩ সালে কুমারখালী হাসপাতাল থেকে তিন মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে আসছি। আগে না বুঝে সিল-প্যাড ও ডাক্তার পদবি ব্যবহার করতাম।’

 

তার ভাষ্য, তিনি নিয়ম মেনে চুলকানি রোগীদের আলফাকর্ট ইনজেকশন দিয়েছিলেন।

 

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা চিকিৎসক খালেদ সাইফুল বলেন, ‘একজন পল্লী চিকিৎসক সিল, প্যাডসহ নাম ব্যবহার করতে পারেন না। আবার এ ধরনের চিকিৎসাও দিতে পারেন না। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

 

কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী রেজিস্টার (মেডিসিন) চিকিৎসক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘আলফাকর্ট এক ধরনের স্টোরায়েড ওষুধ। এটা ব্যবহার করলে দ্রুত ঠাণ্ডা, কাশি, জ্বর, চুলকানি কমে যায়, তাৎক্ষণিকভাবে উন্নতি হয়। তবে এটার দীর্ঘমেয়াদী পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হিসেবে চুলকানি-দাদ এসবের পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। এটা বয়স অনুযায়ী ডোজ দিতে হয়। তবে পল্লী চিকিৎসক বা প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে এটা দেয়া যায় না।’

 

তিনি আরও বলেন, ‘শুধু আরএমপি করে এ ধরনের চিকিৎসা দেয়া যায় না।’

 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার বলেন, ‘ভুল চিকিৎসায় অন্তত ১০ শিশুর শরীরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়ার লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’