ঢাকা , শুক্রবার, ০৯ জানুয়ারী ২০২৬, ২৫ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo সদরপুরে নিম্ম আয়ের মানুষের ভীড় বাড়ছে ফুটপাতের পুরানো শীতবস্ত্রের দোকানে Logo মধুখালীর রায়পুর ইউনিয়নে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট চেয়ে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু Logo মধুখালীতে দোয়া মাহফিল ও গণমাধ্যম কর্মিদের সাথে মতবিনিময় Logo বাঘায় মুক্তিযোদ্ধার সাথে সংসদ সদস্য প্রার্থী চাঁদের মতবিনিময় Logo শিবগঞ্জে চোখ উপড়ে পাহারাদারকে হত্যা Logo মধুখালীতে সাংবাদিক সাগর চক্রবর্তীর মোটরসাইকেল চুরি Logo বালিয়াকান্দিতে মোবাইলকোট পরিচালনায় দুই ট্রলি চালককে জরিমানা  Logo বগুড়া পৌরসভার ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্য পালশা ডে নাইট শর্ট পিচ ক্রিকেট টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত Logo তানোর বিএনপির রাজনীতিতে জাহাঙ্গীরকে দায়িত্বশীল পদে দেখতে চায় তৃণমুল Logo কালুখালীতে জাতীয় সমবায় দিবস পালিত
প্রতিনিধি নিয়োগ
দৈনিক সময়ের প্রত্যাশা পত্রিকার জন্য সারা দেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আপনি আপনার এলাকায় সাংবাদিকতা পেশায় আগ্রহী হলে যোগাযোগ করুন। Hotline- +880 9617 179084

কুষ্টিয়ায় কৃষিজমির মাটি-বালু যাচ্ছে ইটভাটায়, নির্বিকার প্রশাসন

ইসমাইল হােসেন বাবুঃ

আইন অনুযায়ী নদী থেকে অবৈধভাবে মাটি ও বালু কাটা নিষিদ্ধ। তবে আইনকে বৃদ্ধাঙ্গলি দেখিয়ে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে পদ্মা নদীর মাটি ও বালু বেচাকেনা করছেন কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহ ইউনিয়নের অন্তত ১২টি ইটভাটার মালিক, শ্রমিক ও কিছু অসাধু কৃষক। ইউনিয়নের মাজগ্রাম, ছোট মাজগ্রাম ও জুড়ালপুর এলাকার কয়েকশ বিঘা জমির মাটি কেটে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য চলছে।

 

অভিযুক্তদের ভাষ্য, জমিগুলো নিজ মালিকানাধীন। নদীর কারণে বছরে একবার ফসল হয়। এতে তেমন লাভ হয় না। সেজন্য ফসল চাষ না করে মাটি ও বালু ইটভাটায় বিক্রি করা হয়। মানভেদে প্রতিবিঘা জমি ৫০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকায় বেচাকেনা হয়। প্রশাসন ও পরিবেশকে ম্যানেজ করেই তারা প্রতিবছর এ কাজ করে চলেছেন।

 

তবে প্রতিবছর নদীর মাটি ও বালু কাটায় হুমকিতে পড়েছে হাজার হাজার বিঘা ফসলসহ কৃষি জমি ও পরিবেশ। ভারী যানবহনে ভেঙে গেছে গ্রামীণ সড়ক। প্রকাশ্যে এমন অবৈধ কর্মকাণ্ড চললেও প্রশাসনের কোনো তৎপরতা নেই। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষকরা।

 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক যুগ আগেও পদ্মা নদীর কোলঘেঁষে কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহ ইউনিয়নের মাজগ্রাম, ছোট মাজগ্রাম ও জুড়ালপুর এলাকার কয়েক হাজার বিঘা জমিতে বাদাম, সরিষা, মসুর, তিলসহ নানান জাতের ফসলের আবাদ করতেন কৃষকরা। কিন্তু ফসলের চেয়ে মাটি ও বালু বিক্রি অধিক লাভজনক হওয়ায় মাটি বিক্রি করছেন অনেকে। এতে কৃষিজমির পরিমাণ কমছে, নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য।

 

শিলাইদহ ইউনিয়নে বর্তমানে ১২টি ইটভাটা রয়েছে। প্রতিটি ভাটায় প্রতিবছর ৫০ থেকে ৬০ লাখ পিস ইট তৈরি করা হয়। এসব ইট তৈরির প্রধান কাঁচামাল মাটি ও বালু সংগ্রহ করা হয় পদ্মা নদী থেকে।

 

সরেজমিন শিলাইদহ ইউনিয়নের মাজগম, ছোট মাজগ্রাম ও জুড়ালপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পদ্মা নদীর পানি শুকিয়ে বিস্তীর্ণ চর জেগেছে। সেখানে সরিষা, মসুর, মটর, পেঁয়াজ, কলাসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ করা হয়েছে। এসব ফসলের পাশাপাশি অন্তত ছয়টি ভেকু দিয়ে মাটি ও বালু কাটা হচ্ছে। বিভিন্ন যান দিয়ে মাটি ও বালু এসবিসি, এনএসবি, মাস্ট্রার্স ব্রিকসসহ বিভিন্ন ভাটায় নেওয়া হচ্ছে। ভারী যানবাহন চলাচল করায় উঠে গেছে সড়কের কার্পেটিং। এসময় সাংবাদিকদের দেখে ভেকু রেখে মাটি ও বালু কাটা বন্ধ করে দ্রুত চলে যান চালক ও শ্রমিকরা।

 

এসময় নাম প্রকাশ না করা শর্তে একজন কৃষক আক্ষেপ করে বলেন, ‌ওরে বাবা! আগে ধান, পাট, কুসোর (আখ), বাদাম, মসুর কত ফসল হতো। এহন বছর বছর ভাটা হচ্ছে। মানুষ টাহার লোভে ভাটায় মাটি বিক্রি করে দিচ্ছে। একজনের কারণে সব কৃষকের সমস্যা হচ্ছে। সমস্যা হলিও কথা কবার দেয় না। কলিই (বললেই) সমস্যা।’

 

মাজগ্রাম এলাকায় পদ্ম নদীতে প্রায় পাঁচ বিঘা জমি আছে ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মনোয়ার হোসেনের। তিনি বলেন, পানির কারণে ঠিকঠাক চাষ করা যায় না। আগে বছরে একবার চাষ হতো। এতে সংসার চলে না। সেজন্য প্রতিবিঘা এক লাখ টাকা দরে ইটভাটায় বিক্রি করেছি। বন্যা এলে আবার ভরাট হয়ে যাবে।

 

মনোয়ার হোসেনের ভাষ্য, চাষাবাদের চেয়ে ভাটায় মাটি বিক্রিতে লাভ বেশি। প্রশাসন কোনো বাঁধা দেয় না। একটি ভাটায় বছরে প্রায় ১০ লাখ টাকার মাটি ব্যবহার হয় বলে জানান এসবিসি ইটভাটার মালিক মো. শাহিন। তিনি বলেন, এখানে অবৈধভাবে কিছু করা হয় না। জমির মালিকের কাছ থেকে টাকা দিয়ে মাটি কেনা হয়। মানভেদে প্রতিবিঘা জমির দাম ৫০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা। এসব ঘটনা পরিবেশ ও প্রশাসনের লোকজন জানে।

 

জুড়ালপুর গ্রামের কৃষক কুদ্দুস আলী বলেন, আগে চরজুড়ে বাদাম, সরিষা, তিল, মসুরসহ হরেকরকম ফসল আবাদ হতো। কিন্তু সেখানে ভাটা বেশি হওয়ায় মাটির দাম ভালো। তাই অনেকেই ভাটায় মাটি বিক্রি করছেন।

 

কৃষক আমির হোসেনের ভাষ্য, চাষাবাদ করলেই পদ্মার বুকে ভালো ফসল ফলানো সম্ভব। কিন্তু কিছু অসাধু ভাটা মালিক ও কৃষক আইন অমান্য করে বালু ও মাটি বেচাকেনা করছেন। দোষীদের শাস্তি হওয়া দরকার।

 

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. রাইসুল ইসলাম বলেন, সরকার কৃষির উৎপাদন বাড়াতে প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু ইটভাটার কারণে জমি ও উৎপাদন কমেছে। এ বিষয়ে জানতে কুষ্টিয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এমদাদুল হককে বারবার কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

 

অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আখতার বলেন, ‌বৈধ ইজারা ছাড়া নদীর মাটি ও বালু কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। খুব শিগগির অভিযান চালিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


প্রিন্ট
Tag :
এই অথরের আরো সংবাদ দেখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

গণধর্ষণের অভিযোগে মহম্মদপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক ২ নেতা গ্রেফতার

error: Content is protected !!

কুষ্টিয়ায় কৃষিজমির মাটি-বালু যাচ্ছে ইটভাটায়, নির্বিকার প্রশাসন

আপডেট টাইম : ০৫:৪৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ জানুয়ারী ২০২৬
ইসমাইল হোসেন বাবু, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার :

ইসমাইল হােসেন বাবুঃ

আইন অনুযায়ী নদী থেকে অবৈধভাবে মাটি ও বালু কাটা নিষিদ্ধ। তবে আইনকে বৃদ্ধাঙ্গলি দেখিয়ে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে পদ্মা নদীর মাটি ও বালু বেচাকেনা করছেন কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহ ইউনিয়নের অন্তত ১২টি ইটভাটার মালিক, শ্রমিক ও কিছু অসাধু কৃষক। ইউনিয়নের মাজগ্রাম, ছোট মাজগ্রাম ও জুড়ালপুর এলাকার কয়েকশ বিঘা জমির মাটি কেটে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য চলছে।

 

অভিযুক্তদের ভাষ্য, জমিগুলো নিজ মালিকানাধীন। নদীর কারণে বছরে একবার ফসল হয়। এতে তেমন লাভ হয় না। সেজন্য ফসল চাষ না করে মাটি ও বালু ইটভাটায় বিক্রি করা হয়। মানভেদে প্রতিবিঘা জমি ৫০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকায় বেচাকেনা হয়। প্রশাসন ও পরিবেশকে ম্যানেজ করেই তারা প্রতিবছর এ কাজ করে চলেছেন।

 

তবে প্রতিবছর নদীর মাটি ও বালু কাটায় হুমকিতে পড়েছে হাজার হাজার বিঘা ফসলসহ কৃষি জমি ও পরিবেশ। ভারী যানবহনে ভেঙে গেছে গ্রামীণ সড়ক। প্রকাশ্যে এমন অবৈধ কর্মকাণ্ড চললেও প্রশাসনের কোনো তৎপরতা নেই। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষকরা।

 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক যুগ আগেও পদ্মা নদীর কোলঘেঁষে কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহ ইউনিয়নের মাজগ্রাম, ছোট মাজগ্রাম ও জুড়ালপুর এলাকার কয়েক হাজার বিঘা জমিতে বাদাম, সরিষা, মসুর, তিলসহ নানান জাতের ফসলের আবাদ করতেন কৃষকরা। কিন্তু ফসলের চেয়ে মাটি ও বালু বিক্রি অধিক লাভজনক হওয়ায় মাটি বিক্রি করছেন অনেকে। এতে কৃষিজমির পরিমাণ কমছে, নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য।

 

শিলাইদহ ইউনিয়নে বর্তমানে ১২টি ইটভাটা রয়েছে। প্রতিটি ভাটায় প্রতিবছর ৫০ থেকে ৬০ লাখ পিস ইট তৈরি করা হয়। এসব ইট তৈরির প্রধান কাঁচামাল মাটি ও বালু সংগ্রহ করা হয় পদ্মা নদী থেকে।

 

সরেজমিন শিলাইদহ ইউনিয়নের মাজগম, ছোট মাজগ্রাম ও জুড়ালপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পদ্মা নদীর পানি শুকিয়ে বিস্তীর্ণ চর জেগেছে। সেখানে সরিষা, মসুর, মটর, পেঁয়াজ, কলাসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ করা হয়েছে। এসব ফসলের পাশাপাশি অন্তত ছয়টি ভেকু দিয়ে মাটি ও বালু কাটা হচ্ছে। বিভিন্ন যান দিয়ে মাটি ও বালু এসবিসি, এনএসবি, মাস্ট্রার্স ব্রিকসসহ বিভিন্ন ভাটায় নেওয়া হচ্ছে। ভারী যানবাহন চলাচল করায় উঠে গেছে সড়কের কার্পেটিং। এসময় সাংবাদিকদের দেখে ভেকু রেখে মাটি ও বালু কাটা বন্ধ করে দ্রুত চলে যান চালক ও শ্রমিকরা।

 

এসময় নাম প্রকাশ না করা শর্তে একজন কৃষক আক্ষেপ করে বলেন, ‌ওরে বাবা! আগে ধান, পাট, কুসোর (আখ), বাদাম, মসুর কত ফসল হতো। এহন বছর বছর ভাটা হচ্ছে। মানুষ টাহার লোভে ভাটায় মাটি বিক্রি করে দিচ্ছে। একজনের কারণে সব কৃষকের সমস্যা হচ্ছে। সমস্যা হলিও কথা কবার দেয় না। কলিই (বললেই) সমস্যা।’

 

মাজগ্রাম এলাকায় পদ্ম নদীতে প্রায় পাঁচ বিঘা জমি আছে ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মনোয়ার হোসেনের। তিনি বলেন, পানির কারণে ঠিকঠাক চাষ করা যায় না। আগে বছরে একবার চাষ হতো। এতে সংসার চলে না। সেজন্য প্রতিবিঘা এক লাখ টাকা দরে ইটভাটায় বিক্রি করেছি। বন্যা এলে আবার ভরাট হয়ে যাবে।

 

মনোয়ার হোসেনের ভাষ্য, চাষাবাদের চেয়ে ভাটায় মাটি বিক্রিতে লাভ বেশি। প্রশাসন কোনো বাঁধা দেয় না। একটি ভাটায় বছরে প্রায় ১০ লাখ টাকার মাটি ব্যবহার হয় বলে জানান এসবিসি ইটভাটার মালিক মো. শাহিন। তিনি বলেন, এখানে অবৈধভাবে কিছু করা হয় না। জমির মালিকের কাছ থেকে টাকা দিয়ে মাটি কেনা হয়। মানভেদে প্রতিবিঘা জমির দাম ৫০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা। এসব ঘটনা পরিবেশ ও প্রশাসনের লোকজন জানে।

 

জুড়ালপুর গ্রামের কৃষক কুদ্দুস আলী বলেন, আগে চরজুড়ে বাদাম, সরিষা, তিল, মসুরসহ হরেকরকম ফসল আবাদ হতো। কিন্তু সেখানে ভাটা বেশি হওয়ায় মাটির দাম ভালো। তাই অনেকেই ভাটায় মাটি বিক্রি করছেন।

 

কৃষক আমির হোসেনের ভাষ্য, চাষাবাদ করলেই পদ্মার বুকে ভালো ফসল ফলানো সম্ভব। কিন্তু কিছু অসাধু ভাটা মালিক ও কৃষক আইন অমান্য করে বালু ও মাটি বেচাকেনা করছেন। দোষীদের শাস্তি হওয়া দরকার।

 

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. রাইসুল ইসলাম বলেন, সরকার কৃষির উৎপাদন বাড়াতে প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু ইটভাটার কারণে জমি ও উৎপাদন কমেছে। এ বিষয়ে জানতে কুষ্টিয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এমদাদুল হককে বারবার কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

 

অভিযোগ অস্বীকার করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আখতার বলেন, ‌বৈধ ইজারা ছাড়া নদীর মাটি ও বালু কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। খুব শিগগির অভিযান চালিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


প্রিন্ট