আরমান হোসেনঃ (পর্বঃ- ১)
গাজীপুর মহানগরীর কাশিমপুর এখন আর সড়ক বা ফুটপাতের শহর নয়—এটি কার্যত পরিণত হয়েছে চাঁদাবাজদের দখলে থাকা উন্মুক্ত বাজারে। সড়ক ও ফুটপাত দখল করে গড়ে ওঠা অসংখ্য অবৈধ বাজারে প্রতিনিয়ত চাঁদা আদায় হলেও প্রশাসনের নীরবতায় দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে দখলবাজ চক্র।
মহাসড়ক নয়, যেন চাঁদাবাজদের ব্যক্তিগত মার্কেট
কাশিমপুরের জিরানী এলাকায় সরকারি ইজারাকৃত বাজারের সীমানা অতিক্রম করে মহাসড়কের পাশে প্রায় দেড় কিলোমিটারজুড়ে গড়ে উঠেছে অবৈধ বাজারের সারি। বিকেএসপি, সাথী গার্মেন্টস ও আশপাশের এলাকায় বিকেল নামলেই সড়ক পুরোপুরি হারিয়ে যায়। তখন সেখানে চলে প্রকাশ্য বেচাকেনা, হকারদের হাঁকডাক আর চাঁদাবাজদের দাপট।
পুরো কাশিমপুর যেন অবৈধ বাজারের মানচিত্র
কাশিমপুর-শ্রীপুর সড়কের ডিবিএল ১নং গেট থেকে কাজী মার্কেট, সুলতান মার্কেট, হাজী মার্কেট, আলীম নিটওয়্যার ফ্যাক্টরির সামনে, মোল্লা মার্কেট, হাতীমারা স্কুল গেট, ঈদগাহ মাঠ, পানিশাইল, রেডিয়াল গার্মেন্টসের দুই পাশ, মোজারমেইল স্ট্যান্ড, বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক থেকে নবীনগর-চন্দ্রা সড়কের মুখ পর্যন্ত—প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক দখল করে বসেছে অবৈধ ভাসমান বাজার।
যানজট, দুর্ঘটনা আর দুর্ভোগ—সবই নিত্যদিনের সড়কের ওপর দোকান বসানোর কারণে প্রতিদিন সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট, ঘটছে দুর্ঘটনা। হাজারো শিল্পকারখানার শ্রমিক, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ পড়ছেন চরম ভোগান্তিতে। পথচারীরা বলছেন, “ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে সড়কের মাঝ দিয়ে হাঁটতে হয়। মৃত্যুঝুঁকি নিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে।
কোনো ইজারা নেই, তবু প্রকাশ্য বাণিজ্য
সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো—এই সড়কগুলোর ওপর বাজার বসানোর কোনো অনুমোদন নেই। জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন বা সিটি কর্পোরেশন—কেউই কোনো ইজারা দেয়নি। তারপরও শত শত দোকান কীভাবে বসছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে আসে চাঁদাবাজির ভয়ংকর চিত্র।
রাজনৈতিক পরিচয়ই লাইসেন্স
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দোকান বসাতে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, তাঁদের আত্মীয় ও প্রভাবশালীদের ‘ম্যানেজ’ করে নেওয়া হচ্ছে নিয়মিত চাঁদা। সিকিউরিটি বিল, বিদ্যুৎ বিল, ময়লা অপসারণ বিল—নানা নামে প্রতিদিন আদায় করা হচ্ছে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা। কাশিমপুরের বিভিন্ন এলাকায় কমপক্ষে ৫০০টির বেশি দোকান রয়েছে। গড়পড়তা প্রতিদিন ৫০ টাকা করে আদায় হলেও বছরে এই চাঁদার অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় এক কোটি টাকা। অথচ সরকার বা সিটি কর্পোরেশন পাচ্ছে না একটি টাকাও।
দোকানদাররাও জিম্মি
দোকানদারদের ভাষ্য, সড়কে দোকান বসিয়ে বিক্রি ভালো না হলেও চাঁদা দিতে কোনো ছাড় নেই। চাঁদা না দিলে দোকান বসাতে দেওয়া হয় না, এমনকি হুমকিও দেওয়া হয়। পেটের দায়ে বাধ্য হয়েই তারা এই অবৈধ ব্যবস্থার অংশ হতে বাধ্য হচ্ছেন।
যাদের নাম উঠে এসেছে
দোকানদারদের অভিযোগ অনুযায়ী, জিরানী রেডিয়াল গার্মেন্টস এলাকার দোকান থেকে মহানগর বিএনপির ১নং ওয়ার্ড সভাপতি এনায়েত হোসেন মোল্লা (সাবেক মেম্বার)-এর ছোট ভাই শাহাদাত ও তার সহযোগী আশিক, মামুন, নাহিদ ও সাহেদ নিয়মিত চাঁদা আদায় করছেন। জিরানী বাজার থেকে সাথী গার্মেন্টস পর্যন্ত এলাকায় সোহেল রানা ও আব্দুল আলীমসহ আরও কয়েকজন এই চাঁদাবাজিতে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রশাসনের নীরবতা প্রশ্নবিদ্ধ
কাশিমপুরের স্থানীয় স্কুল শিক্ষক আব্দুস সাত্তার বলেন, যারা সড়ক দখল করছে তাদের রাজনৈতিক পরিচয় আছে। সেই পরিচয়ের কারণেই প্রশাসন চোখ বন্ধ করে আছে। অনেক ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিরাও জড়িত।
কবে মুক্ত হবে কাশিমপুর?
প্রকাশ্য সড়ক দখল, প্রকাশ্য চাঁদাবাজি আর প্রকাশ্য রাজনৈতিক আশ্রয়—সব মিলিয়ে কাশিমপুর যেন এখন আইনশৃঙ্খলার বাইরে। প্রশ্ন উঠেছে, প্রশাসন কি আদৌ এই অবৈধ বাজার ও চাঁদাবাজ চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে? নাকি কাশিমপুরের সড়কগুলো চিরদিনই থাকবে দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে—এই প্রশ্নই এখন নগরবাসীর।
প্রিন্ট

সদরপুরে নিম্ম আয়ের মানুষের ভীড় বাড়ছে ফুটপাতের পুরানো শীতবস্ত্রের দোকানে 
আরমান হোসেন, গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি 




















