রাশিদুল ইসলাম রাশেদ:
নাটোরের লালপুরে হাড় কাঁপানো শীতে কাঁপছে পুরো জনপদ। বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে স্বাভাবিক জনজীবন। রাতভর কনকনে ঠান্ডা, সপ্তাহজুড়ে কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল এবং উত্তরের হিমেল হাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। শীত নিবারণে অনেককে খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুন পোহাতে দেখা যাচ্ছে।
ঈশ্বরদী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) লালপুর উপজেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১০ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এরপর ধাপে ধাপে তাপমাত্রা কমতে থাকে। সপ্তাহজুড়ে লালপুর ও আশপাশের এলাকায় তাপমাত্রা ৯ দশমিক ২ ডিগ্রি থেকে ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে ঈশ্বরদী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের অফিসার ইনচার্জ মো. হেলাল উদ্দিন জানান, বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) সকালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৯ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে, যা চলতি মৌসুমে উপজেলার সর্বনিম্ন। ঘন কুয়াশা ও উত্তরের হিমেল বাতাসের কারণে শীতের অনুভূতি তুলনামূলকভাবে বেশি হচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো এলাকায় দিনের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ এবং ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়। সে হিসেবে বর্তমানে লালপুর উপজেলায় মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন ছিন্নমূল মানুষ ও নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া শ্রমজীবীরা। উপজেলার রহিমপুর গ্রামের ভ্যানচালক গিয়াস উদ্দিন (৪৫) বলেন, “তিন দিন ধরে সূর্যের দেখা নেই। শীতে হাত-পা চলছে না। তবুও জীবিকার তাগিদে ভ্যান নিয়ে বের হতে হয়েছে। কিন্তু যাত্রী না পাওয়ায় কোনো আয় ছাড়াই ঘরে ফিরতে হচ্ছে।”
ঢুষপাড়া গ্রামের নুরজামান (৪২) বলেন, “ঠান্ডার কারণে দুদিন কাজে যেতে পারিনি। আজ বাধ্য হয়ে পদ্মার চরে কাজে গিয়েছিলাম। কিন্তু জমির মালিক না আসায় ফিরে আসতে হলো। পেট তো আর ঠান্ডা মানে না।”
তীব্র শীতে হাটবাজারের কার্যক্রমও অনেকটা কমে গেছে। সবজি বিক্রেতা শরিফুল ইসলাম বলেন, “শীতে মানুষ একান্ত প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছে না। সকাল থেকে বসে আছি, কোনো ক্রেতা আসছে না। কয়েকদিন ধরে আয় অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে।” শরিফুলের মতো অনেক বিক্রেতাই পড়েছেন একই দুর্ভোগে।
সবচেয়ে বেশি কষ্টে রয়েছেন হাটবাজার ও পথে-ঘাটে থাকা ছিন্নমূল মানুষরা। শীতবস্ত্রের অভাবে তাদের অবস্থা জুবুথুবু। আব্দুলপুর রেলস্টেশনে অবস্থানরত আব্দুল হালিম নামের এক বৃদ্ধা বলেন, “কনকনে শীতে রাতে ঘুমাতে পারিনি। গরম কাপড় পেলে একটু আরামে থাকতে পারতাম।”
এদিকে ঠান্ডাজনিত রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে লালপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। বিষয়টি নিশ্চিত করে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মুনজুর রহমান বলেন, “তীব্র শীতে শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া তাদের বাইরে না যাওয়াই ভালো।”
এমন অবস্থায় ছিন্নমূল ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য প্রশাসনের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগে শীতবস্ত্র বিতরণ জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জুলহাস হোসেন সৌরভ বলেন, “ইতোমধ্যে উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় প্রায় তিন হাজার কম্বল ও শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী আরও শীতবস্ত্র বিতরণ করা হবে।” একই সঙ্গে তিনি অসহায় শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সমাজের বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানান।
প্রিন্ট

সদরপুরে নিম্ম আয়ের মানুষের ভীড় বাড়ছে ফুটপাতের পুরানো শীতবস্ত্রের দোকানে 
রাশিদুল ইসলাম রাশেদ, লালপুর (নাটোর) প্রতিনিধি 





















