ঢাকা , রবিবার, ০৫ জুলাই ২০২৬, ২১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রতিনিধি নিয়োগ
দৈনিক সময়ের প্রত্যাশা পত্রিকার জন্য সারা দেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আপনি আপনার এলাকায় সাংবাদিকতা পেশায় আগ্রহী হলে যোগাযোগ করুন। Hotline- +880 9617 179084

হারানো স্বপ্নে ফের আশার আলোঃ শিক্ষামন্ত্রীর হস্তক্ষেপে পরীক্ষার হলে ফিরলেন লালপুরের ৮ শিক্ষার্থী

রাশিদুল ইসলাম রাশেদঃ

কয়েক দিন আগেও তাদের চোখে ছিল হতাশা, অনিশ্চয়তা আর অশ্রু। বছরের পর বছর প্রস্তুতি নেওয়ার পরও শুধু একটি প্রতারণার কারণে এইচএসসি পরীক্ষার প্রথম দিন কেন্দ্রে যেতে পারেননি তারা। স্বপ্ন যেন মুহূর্তেই ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু সেই অন্ধকার বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনা ও রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের দ্রুত পদক্ষেপে অবশেষে আবারও পরীক্ষার খাতায় কলম ধরলেন নাটোরের লালপুর উপজেলার আব্দুলপুর সরকারি কলেজের প্রতারণার শিকার আট শিক্ষার্থী।
শনিবার (৪ জুলাই) সকালে আব্দুলপুর সরকারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. মামদুদুর রহমান শিক্ষার্থীদের হাতে প্রবেশপত্র তুলে দেন। এরপর তারা বাগাতিপাড়া সরকারি কলেজ কেন্দ্রে গিয়ে নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে পরীক্ষায় অংশ নেন। কয়েক দিনের উৎকণ্ঠা শেষে এ দৃশ্য শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, তাদের অভিভাবক ও এলাকাবাসীর মধ্যেও স্বস্তি ও স্বপ্ন ফিরে আসার বার্তা দেয়।
পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা হলেন—ইসরাত জাহান সূচি, সবুজ আহমেদ, শিমুল শেখ, আকিবুল হাসান, তানভীর হোসাইন, শিমুল আলী, মুক্তাদি হাসান সাব্বির এবং হাসিবুল হাসান শাওন।
রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. শামীম আরা চৌধুরী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ইফফাত জেরিন জানান, শুক্রবারই শিক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র প্রস্তুত করে কলেজে পাঠানো হয়। ফলে তারা অবশিষ্ট সব পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছেন। প্রথম পরীক্ষার বিষয়ে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
পরীক্ষার সুযোগ ফিরে পাওয়ার পর শিক্ষার্থীরা শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষা বোর্ড, কলেজ প্রশাসন, জেলা প্রশাসন, পুলিশ এবং বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
এদিকে, ঘটনাটি ধামাচাপা না দিয়ে তদন্তে নেমেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। কলেজের রসায়ন বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল মাহমুদকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. মামদুদুর রহমান জানিয়েছেন, কমিটি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে।
আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। অভিযুক্ত গ্রন্থাগারের অফিস সহকারী অমিত কুমার সরকারকে শুক্রবার বড়াইগ্রামের বনপাড়া এলাকা থেকে আটক করে পুলিশ। শনিবার আদালতের মাধ্যমে তাকে নাটোর জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান সূচির বাবা ইমামুল হক বাদী হয়ে তার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইফতে খায়ের আলম শনিবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান।
ঘটনার সূত্রপাত হয়, যখন অভিযোগ ওঠে—২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের জন্য আট শিক্ষার্থীর কাছ থেকে জনপ্রতি সাড়ে তিন হাজার টাকা নেওয়া হলেও তাদের ফরম পূরণই করা হয়নি। ফলে তারা প্রবেশপত্র পাননি এবং বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত প্রথম পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ হারান।
ঘটনাটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর দেশজুড়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এরপর শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলনের নির্দেশনায় রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সেই উদ্যোগের ফলেই হারিয়ে যেতে বসা আটটি শিক্ষাজীবন আবারও মূল স্রোতে ফিরতে শুরু করেছে।
এই ঘটনা শুধু আট শিক্ষার্থীর পরীক্ষায় ফেরা নয়; এটি শিক্ষা ব্যবস্থায় দায়িত্বশীলতা, দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এবং গণমাধ্যমের কার্যকর ভূমিকারও একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল। একই সঙ্গে এমন প্রতারণা যেন ভবিষ্যতে আর কোনো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন ভেঙে না দেয়, সেই প্রত্যাশাও সংশ্লিষ্ট সবার।
Tag :
এই অথরের আরো সংবাদ দেখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

বোয়ালমারীতে বহিস্কৃত বি এন পি নেতার বিরুদ্ধে মাদ্রাসার জমি দখলের অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন

error: Content is protected !!

হারানো স্বপ্নে ফের আশার আলোঃ শিক্ষামন্ত্রীর হস্তক্ষেপে পরীক্ষার হলে ফিরলেন লালপুরের ৮ শিক্ষার্থী

আপডেট টাইম : ০৩:০৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬
রাশিদুল ইসলাম রাশেদ, :

রাশিদুল ইসলাম রাশেদঃ

কয়েক দিন আগেও তাদের চোখে ছিল হতাশা, অনিশ্চয়তা আর অশ্রু। বছরের পর বছর প্রস্তুতি নেওয়ার পরও শুধু একটি প্রতারণার কারণে এইচএসসি পরীক্ষার প্রথম দিন কেন্দ্রে যেতে পারেননি তারা। স্বপ্ন যেন মুহূর্তেই ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু সেই অন্ধকার বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনা ও রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের দ্রুত পদক্ষেপে অবশেষে আবারও পরীক্ষার খাতায় কলম ধরলেন নাটোরের লালপুর উপজেলার আব্দুলপুর সরকারি কলেজের প্রতারণার শিকার আট শিক্ষার্থী।
শনিবার (৪ জুলাই) সকালে আব্দুলপুর সরকারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. মামদুদুর রহমান শিক্ষার্থীদের হাতে প্রবেশপত্র তুলে দেন। এরপর তারা বাগাতিপাড়া সরকারি কলেজ কেন্দ্রে গিয়ে নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে পরীক্ষায় অংশ নেন। কয়েক দিনের উৎকণ্ঠা শেষে এ দৃশ্য শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, তাদের অভিভাবক ও এলাকাবাসীর মধ্যেও স্বস্তি ও স্বপ্ন ফিরে আসার বার্তা দেয়।
পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা হলেন—ইসরাত জাহান সূচি, সবুজ আহমেদ, শিমুল শেখ, আকিবুল হাসান, তানভীর হোসাইন, শিমুল আলী, মুক্তাদি হাসান সাব্বির এবং হাসিবুল হাসান শাওন।
রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. শামীম আরা চৌধুরী বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ইফফাত জেরিন জানান, শুক্রবারই শিক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র প্রস্তুত করে কলেজে পাঠানো হয়। ফলে তারা অবশিষ্ট সব পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছেন। প্রথম পরীক্ষার বিষয়ে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
পরীক্ষার সুযোগ ফিরে পাওয়ার পর শিক্ষার্থীরা শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষা বোর্ড, কলেজ প্রশাসন, জেলা প্রশাসন, পুলিশ এবং বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
এদিকে, ঘটনাটি ধামাচাপা না দিয়ে তদন্তে নেমেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। কলেজের রসায়ন বিভাগের প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল মাহমুদকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. মামদুদুর রহমান জানিয়েছেন, কমিটি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে।
আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। অভিযুক্ত গ্রন্থাগারের অফিস সহকারী অমিত কুমার সরকারকে শুক্রবার বড়াইগ্রামের বনপাড়া এলাকা থেকে আটক করে পুলিশ। শনিবার আদালতের মাধ্যমে তাকে নাটোর জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান সূচির বাবা ইমামুল হক বাদী হয়ে তার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. ইফতে খায়ের আলম শনিবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান।
ঘটনার সূত্রপাত হয়, যখন অভিযোগ ওঠে—২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের জন্য আট শিক্ষার্থীর কাছ থেকে জনপ্রতি সাড়ে তিন হাজার টাকা নেওয়া হলেও তাদের ফরম পূরণই করা হয়নি। ফলে তারা প্রবেশপত্র পাননি এবং বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত প্রথম পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ হারান।
ঘটনাটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর দেশজুড়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এরপর শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলনের নির্দেশনায় রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সেই উদ্যোগের ফলেই হারিয়ে যেতে বসা আটটি শিক্ষাজীবন আবারও মূল স্রোতে ফিরতে শুরু করেছে।
এই ঘটনা শুধু আট শিক্ষার্থীর পরীক্ষায় ফেরা নয়; এটি শিক্ষা ব্যবস্থায় দায়িত্বশীলতা, দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এবং গণমাধ্যমের কার্যকর ভূমিকারও একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল। একই সঙ্গে এমন প্রতারণা যেন ভবিষ্যতে আর কোনো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন ভেঙে না দেয়, সেই প্রত্যাশাও সংশ্লিষ্ট সবার।