আলিফ হোসেনঃ
রাজশাহী অঞ্চলে উৎপাদিত ও জনপ্রিয় ‘জিরা ধান’-এর চাল রাজধানী ঢাকায় সবচেয়ে ভালো মানের ‘মিনিকেট’ নামে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।অথচ দেশে ‘মিনিকেট’ নামের কোনও ধানের জাত নেই। রাজশাহী ও নওগাঁয় উৎপাদিত বিভিন্ন জাতের ধানের মধ্যে জিরা ধান অন্যতম উৎকৃষ্ট মানের। আর এই ধান থেকে উৎপাদিত চাল কৌশলে ঢাকায় গিয়ে মিনিকেট নামে চড়া মূল্যে বাজারজাত করা হচ্ছে।
সরেজমিন স্থানীয় প্রান্তিক কৃষক, ধান কেনা-বেচার সঙ্গে জড়িত ফড়িয়া এবং চাল উৎপাদনকারী অটো রাইস মিল মালিকদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই ধানের আকৃতি জিরার ন্যায় অত্যন্ত চিকন হওয়ার কারণেই এর নামকরণ করা হয়েছে ‘জিরা ধান’। এই ধানের ফলনও বেশ আশানুরূপ।
রাজশাহীর তানোর উপজেলার কৃষক লুৎফর রহমান বলেন, জিরা ধানের ফলন ও দাম ভাল পাওয়া যায়।অন্যান্য ধানের তুলনায় অনেক বেশি চিকন এবং লম্বা সাইজের। মসলা জিরার চাইতে সামান্য মোটা হলেও দেখতে হুবহু জিরার মতোই। এই কারণে একে সবাই জিরা ধান বলে।”
নওগাঁর মান্দা উপজেলার কৃষক আবদুল জলিল বলেন, “এই অঞ্চলে যে কয়েকটি জাতের ধান উৎপাদন হয় তার মধ্যে জিরা অন্যতম। এই ধান অন্যান্য ধানের তুলনায় অনেক বেশি চিকন এবং লম্বা সাইজের। মসলা জিরার চাইতে সামান্য মোটা হলেও দেখতে হুবহু জিরার মতোই। এই কারণে একে সবাই জিরা ধান বলে। তিনি আরও জানান, এই ধানের চাল থেকে উৎপাদিত চাল বেশ ভালো এবং এর ভাত খেতেও সুস্বাদু। বাজারে ও হাটে বিক্রি করতে গেলে এই ধানের চাহিদাই থাকে সবার শীর্ষে। ভালো দাম ও অতিরিক্ত চাহিদার কারণে এই অঞ্চলের কৃষকরা জিরা ধান চাষে বেশি ঝুঁকছেন।
আরেক কৃষক রেজাউল ইসলাম বলেন, এক বিঘা জমিতে (৩৩শতক) জিরা ধানের ফলন প্রায় ২০ মণের কাছাকাছি হয়। অর্থাৎ ফলন একেবারে খারাপ না। বাজারে ভালো চাহিদা থাকা এবং দ্রুত বিক্রি হওয়ার নিশ্চয়তা থাকায় আমরা এই ধানই বেশি আবাদ করি।” তিনি আরও জানান, জিরার পাশাপাশি তারা ব্রি-২৫, ব্রি-৫৬ এবং ব্রি-৭৫ জাতের ধানও উৎপাদন করেন। তবে বাজারে সেগুলোর চাহিদা কম থাকায় উৎপাদনও তুলনামূলক কম হয়।
এ অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ ধানের হাট ‘সাবাই হাট’-এ সরেজমিন দেখা যায়, হাটজুড়েই জিরা ধানের আধিপত্য। ক্রেতাদেরও উপচে পড়া ভিড়। হাটে এই ধানের আমদানিও প্রচুর। দরদাম বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, হাটে প্রতি মণ (৪০কেজি) জিরা ধান বিক্রি হচ্ছে ১৫০০ থেকে ১৬০০ টাকা দরে। অপরদিকে ব্রি-২৫, ব্রি-৫৬ এবং ব্রি-৭৫ জাতের ধান প্রতি মণ বিক্রি হচ্ছে ১১০০ থেকে ১২০০ টাকায়। অর্থাৎ অন্য ধানের চেয়ে জিরা ধানের দাম মণপ্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি।
হাটের ফড়িয়া (পাইকারি ক্রেতা) আনসার আলী বলেন, “আজকের হাটটি কোরবানির ঈদের পর প্রথম হাট। বাজারে জিরা ধানের দাম এখন বেশ ভালো। ১৫০০ থেকে ১৬০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। অন্যান্য ধানের চাহিদা কম থাকায় দামও একটু কম।”
এদিকে মিনিকেট চালের রহস্য নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি সরাসরি বলেন, “মিনিকেট নামে কোনও ধান এই এলাকায় কখনও উৎপাদন হয় না। জিরা ধানই মূলত মিলাররা কিনে নিয়ে আরো চিকন ছাঁটাই করে এবং মিনিকেট নামে বিক্রি করে।” তিনি আরও আভাস দেন, মাস খানেক পর বাজারে জিরা ধানের দাম আরও বাড়বে, কারণ এই ধানের চালের চাহিদা সারা বছরই থাকে।
অন্যদিকে মিলারদের স্বীকারোক্তি: ‘জিরা’ চালই যাচ্ছে ‘মিনিকেট’ প্যাকেটে। ধান ছাঁটাই ও চাল উৎপাদনকারী মিল মালিকরাও কৃষকদের এই দাবির সঙ্গে শতভাগ একমত পোষণ করেছেন।
স্থানীয় এক চালকল মালিক অকপটে বলেন, “জিরা ধান থেকে যখন চাল উৎপাদন করা হয়, তখন সেটি প্রাকৃতিকভাবেই অত্যন্ত চিকন, সরু ও ভালো মানের হয়। ঢাকাসহ দেশের বড় বড় শহরে ‘মিনিকেট’ চালের ব্র্যান্ডিং ও নামডাক বেশি। ক্রেতারাও মিনিকেট চালই খোঁজেন। এ কারণে আমরা জিরা ধানের চালকেই আরো চিকন করে ‘মিনিকেট’ নাম দিয়ে আকর্ষণীয় প্যাকেটে ভরে বাজারজাত করি।
চালকল মালিকরা জানান, নওগাঁ অঞ্চলের এই সুস্বাদু ও চিকন চাল প্রতিদিন শত শত ট্রাকে রাজধানী ঢাকা, বাণিজ্যিক নগরী চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাইকারি ও খুচরা বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে। এসব চাল মিনিকেট নামেই চড়া মূল্যে বিক্রি হচ্ছে।

সাতক্ষীরার শ্যামনগরে দুই সংখ্যালঘু পরিবারকে দেশছাড়ার হুমকি 
আলিফ হোসেন, তানোর (রাজশাহী) প্রতিনিধি 




















