আলিফ হোসেনঃ
রাজশাহীতে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের(বিএডিসি)ধান বীজ নিয়ে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে।এসব ধান বীজ কিনে অসংখ্য চাষি প্রতারিত হয়ে নিঃস্ব হতে চলেছে। ভুক্তভোগী চাষিরা জানান,পবা উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের (ইউপি) বিএডিসির অনুমোদিত পরিবেশক (ডিলার) আনারুল ইসলামের কাছ থেকে তারা এসব ধান বীজ নিয়েছেন। ধানের এই অবস্থা হওয়ার পরে একাধিকবার তারা তার কাছে গিয়েছেন। তিনি একটি দরখাস্ত লিখে তার ওপরে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের সই নিয়েছেন। তারা বলেন, ‘পাইটের (শ্রমিকের) কাছে গিয়েছিলাম। ওরা বলছে এই ধান কাটতে পারবো না। এবার এসব চাষিদের ধানের আশা একদম নাই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক চাষি বলেন,ডিলার রিপ্যাক করে বীজ ধানের পরিবর্তে বাজার থেকে কেনা সাধারণ ধান দিয়েছে,তা না হলে এমন হবার কথা নয়।তিনি বলেন, বিএডিসির ধান বীজ খারাপ হলে ফলন কমবেশি হতে পারে, তবে কখানোই একাধিক জাতের ধান হবার কথা নয়।
এদিকে একই খেত, তিন রকম ধান। এক জাতের ধান পেকে নাড়ার সঙ্গে লুটিয়ে পড়েছে। আরেক জাত সদ্য পেকেছে। গাছ দাঁড়িয়ে আছে। অন্য একটি জাতের শিষ বেরিয়েছে। দুই জাতের পাকা ধান নিচে ফেলে পরের শিষগুলো মাথা উঁচু করে বাতাসে দুলছে। এ জন্য দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে, সবুজ ধানের খেত; কিন্তু কাছে গেলেই দেখা যাচ্ছে, সবুজ ধানের মধ্যে আগে-পরে আরও দুই জাতের ধান পেকেছে।বিএডিসির ধান বীজ বিএডিসির নির্ধারিত পরিবেশকের কাছ থেকে ভিত্তিবীজ ‘ব্রি ধান–৮৮’ চাষ করে চাষিরা এভাবেই প্রতারিত হয়েছেন। তাঁরা বলছেন, তাঁদের সর্বনাশ হয়ে গেছে।তবে বিএডিসির কর্মকর্তারা বলছেন, ব্রি ধান–৯২ এর বীজ এই জাতের সঙ্গে কোনোভাবে মিশে যেতে পারে। কীভাবে এটা হলো, তা নিয়ে তদন্ত চলছে।
চাষিদের অভিযোগ, ব্রি ধান-৮৮ এর ভিত্তিবীজ চাষ করে তাঁরা প্রতারিত হয়েছেন। ভিত্তিবীজ মানে বিএডিসির গবেষণা মাঠে চাষ করার পর প্রথমবারের মতো কৃষক পর্যায়ে বিক্রি করা বীজ। বলা হয়, অন্তত তিন বছর এই বীজের গুণ অটুট থাকবে; কিন্তু প্রথম বছরেই চাষিরা ধরা খেয়েছেন। এই বীজ সরকারিভাবে ৭২ টাকা কেজি হিসেবে বিক্রি করা হয়েছে। বাড়তি চাহিদার কারণে নির্ধারিত পরিবেশকদের কাছ থেকে চাষিরা ৭৬ টাকা কেজি দরে এই বীজ কিনেছেন। এক বিঘার জন্য পাঁচ কেজি বীজ প্রয়োজন হয়।
রাজশাহীর পবা উপজেলার নতুন কসবা গ্রামের মোর্শেদ আলী(৪০) তিনি উপজেলার হরিপুর মাঠে চার বিঘা জমিতে ব্রি ধান–৮৮ চাষ করেছেন। তাঁর জমিতে গিয়ে দেখা যায়, চার বিঘায় একই অবস্থা। তিন রকম ধান হয়েছে। একটি পেকে নিচে পড়ে গেছে। আরেকটি সদ্য পেকেছে। তার ওপর দিয়ে এখন নতুন আরেক জাতের শিষ বের হচ্ছে। প্রথম যে জাতটা পেকেছিল, তার গাছ নরম খড়ের মতো হয়ে মাটির দিকে ঝুলে পড়েছে। তিনি বলেন, গত বছর আমি সাড়ে ২৭ মণ হারে এই ধানের ফলন পেয়েছিলাম। আমার দেখাদেখি এবার মাঠের অনেকেই করেছে। ওরা আমাকে বিশ্বাস করে। আমি যে ধান লাগাই, অন্য চাষিরাও সেই ধানই করে। এবার আমার সঙ্গে অন্যদেরও সর্বনাশ হয়েছে।
পবা উপজেলার মুরারিপুর গ্রামের চাষি মাসুদ রানা (৩৩) এবার তাঁর তিন বিঘা জমিতে এই ধান চাষ করেছিলেন। এর মধ্যে দেড় বিঘা জমি জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার উদপাড়ায় ও বাকি দেড় বিঘা পবা উপজেলার শিতলাই মাঠে। তিনি বলেন, তাঁর খেতের ধান একটা পেকেছে, একটা শিষ মাঝারি, আরেকটার শিষ বের হচ্ছে। পাকা ধানটা কাটার জন্য শ্রমিক নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁরা জবাব দিয়ে দিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, কাটলে সব ধান একসঙ্গে কাটতে হবে। বেছে পাকা ধান কাটা যাবে না। মাসুদ রানা জানান, এবার সার ও পানির দাম দুটিই বেশি ছিল। তিন বিঘা ধান চাষ করতে তাঁর ৩৩ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এই টাকা তিনি ধার-দেনা করে জোগাড় করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি শ্যাষ হয়্যা গেলছি। ভাই, আপনারা একটু কিছু করেন।’
চাষিরা হরিপুর ইউনিয়নের (ইউপি) ডিলার আনারুল ইসলামের কাছ থেকে বীজ কিনেছেন। এবিষয়ে জানতে চাইলে আনারুল ইসলাম বলেন, তিনি প্রায় ২০ জন চাষির কাছে এই ধানের বীজ বিক্রি করেছেন। সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তিনি সব চাষির সই নিয়ে বিএডিসির উপপরিচালকের কাছে চাষিদের ক্ষতিপূরণের জন্য আবেদন করেছেন।
এবিষয়ে বিএডিসি রাজশাহীর উপপরিচালক এ কে এম গোলাম সারওয়ার বলেন, দু একজন তাঁর কাছে এসেছেন। তিনি পবা উপজেলার হরিপুর মাঠে গিয়েছেন। তবে তিনি দাবি করেন, যে মাঠগুলো দেখেছেন, তাতে দুই রকম ধান ছিল। বিষয়টি ঢাকায় তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও প্রধান কার্যালয়ে জানিয়েছেন। তিনি জানান, এ রকম ঘটনা রাজশাহী ছাড়া আরও দু-এক জায়গায় হয়েছে। সেখানে তদন্ত কমিটি হয়েছে। তদন্ত হচ্ছে। তবে রাজশাহীতে এখনো হয়নি। তাঁরা রাজশাহীতে যতটুকু দেখেছেন, ব্রি ধান–৯২–এর সঙ্গে ব্রি ধান–৮৮ মিশে গেছে। ভিত্তিবীজে এ রকম হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে কোথায় যে এই দুই রকমের ধান মিশে গেছে, সেটি তাঁরা ঠিক বুঝতে পারছেন না।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা প্রচন্ড ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তদন্ত হবে ঠিক আছে।কিন্ত্ত তাদের যে ক্ষতি হলো তার দায় নিবে কে ? এক বিঘা জমিতে ধান চাষে তাদের প্রায় সাড়ে ১১ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।এর সঙ্গে নিজের শ্রমের মুল্য ধরলে প্রায় ১৫ হাজার টাকা।তারা ক্ষতি পুরুণের পাশাপাশি এঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্তদের দৃশ্যমান দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান।

দেড় লাখ টাকার গাছ ৫০ হাজারে নিলাম 
আলিফ হোসেন, তানোর (রাজশাহী) প্রতিনিধি 




















