ঢাকা , সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রতিনিধি নিয়োগ
দৈনিক সময়ের প্রত্যাশা পত্রিকার জন্য সারা দেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আপনি আপনার এলাকায় সাংবাদিকতা পেশায় আগ্রহী হলে যোগাযোগ করুন। Hotline- +880 9617 179084

বেঁচে থাকার লড়াই মানুষ ও গবাদিপশুর

পদ্মার ঢলে ভেসে যাচ্ছে লালপুরের চর

রাশিদুল ইসলাম রাশেদ:

 

পদ্মার ঢল যেন লালপুরের চরবাসীর জীবনে নতুন করে দুর্ভোগ ডেকে এনেছে। হঠাৎ নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে ডুবে গেছে শত শত হেক্টর আবাদি জমি। ফসল হারিয়ে দিশেহারা কৃষকরা, আবার পানিবন্দী হয়ে পড়া সহস্রাধিক পরিবার ও গবাদিপশুর জন্যও সৃষ্টি হয়েছে নানামুখী সংকট।

 

চরের মানুষজন এখন শুধু বেঁচে থাকার লড়াই করছেন। একদিকে ঘরে খাবার নেই, অন্যদিকে ফসল তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকের চোখে অন্ধকার। পানিতে নিমজ্জিত ঘরে ঢুকে পড়ছে সাপ, ব্যাঙ আর পোকামাকড়। দূষিত হয়ে পড়েছে নলকূপের পানি। শিশুরা কাঁদছে ক্ষুধায়, গর্ভবতী নারীরা ঝুঁকির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

 

মোহরকয়া গ্রামের কৃষক আ. সামাদ মাঝি (৫৫) কণ্ঠ ভারী করে বলেন, “দেড় লাখ টাকা খরচ করে ৫ বিঘা জমিতে চালকুমড়া, ২ বিঘা জমিতে পটল আর এক বিঘায় ধুন্দল চাষ করেছিলাম। সব শেষ হয়ে গেল চোখের সামনে।”  ইলশামারী গ্রামের শিল্পী বেগম (৪৩) এর বেদনার কণ্ঠ আরও তীব্র। তিনি বলেন, “পানিতে হাঁস-মুরগি ও ছাগল মারা যাচ্ছে। নলকূপের পানি থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। পড়েছি বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে।”

 

শুধু মানুষ নয়, পশুপাখিও বেঁচে থাকার সংগ্রাম করে চলেছে। বিলমাড়িয়ার খামারি মজনু আহমেদ ৪৫টি মহিষ নিয়ে এখন আশ্রয় খুঁজছেন উপজেলার রাস্তায় রাস্তায়। চরাঞ্চলের ঘাস সব ডুবে গেছে। গরু-ছাগলের খাবারের দাম বেড়েছে কয়েকগুণ।

 

উপজেলা কৃষি ও প্রাণিসম্পদ দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী ৬৬০ হেক্টর আখ, ১৪ হেক্টর সবজি, ১১ হেক্টর কলা, ২ হেক্টর তুলা, ২ হেক্টর আউশ ধান তলিয়ে গেছে।  চরাঞ্চলে প্রায় ১০ হাজার গরু, ৪ হাজার মহিষ, ১২ হাজার ছাগল ও ভেড়া রয়েছে। এসব গবাদিপশু তীব্র খাদ্য সংকটে রয়েছে।

 

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রীতম কুমার হোড় বলেন, “বর্তমানে পানি চর থেকে নামা শুরু করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রাথমিক তালিকা করা হচ্ছে। পরবর্তীতে কোন সহযোগিতা আসলে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা হবে।”

 

উপজেলা প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুল্লাহ বলেন, “চরের চারণভূমি ও লাগানো ঘাস ডুবে যাওয়ায় গো-খাদ্যের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। পানি নেমে গেলে নতুন ঘাস জন্মাতে দুই মাস সময় লাগবে। তারপর সংকট কেটে যাবে।”

 

উপজেলা প্রশাসন কিছুটা সহায়তা দিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ইউএনও মেহেদী হাসান জানিয়েছেন, “ইতিমধ্যে ১২০ পরিবারকে শুকনো খাবার দেয়া হয়েছে। শিগগিরই আরও ৭৭৭ পরিবার সহায়তা পাবে। তবে পরিস্থিতি কত দ্রুত স্বাভাবিক হবে, তা নির্ভর করছে পদ্মার পানি নামার গতির ওপর।”

 

চরের মানুষ এখন শুধু অপেক্ষায় কবে পানি নামবে? কবে ফসল ফলবে? আর কবে জীবন ফিরবে স্বাভাবিক ছন্দে?

Tag :
এই অথরের আরো সংবাদ দেখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

e-Paper-29.06.2026

error: Content is protected !!

বেঁচে থাকার লড়াই মানুষ ও গবাদিপশুর

পদ্মার ঢলে ভেসে যাচ্ছে লালপুরের চর

আপডেট টাইম : ১২:৪৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৫
রাশিদুল ইসলাম রাশেদ, লালপুর (নাটোর) প্রতিনিধি :

রাশিদুল ইসলাম রাশেদ:

 

পদ্মার ঢল যেন লালপুরের চরবাসীর জীবনে নতুন করে দুর্ভোগ ডেকে এনেছে। হঠাৎ নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে ডুবে গেছে শত শত হেক্টর আবাদি জমি। ফসল হারিয়ে দিশেহারা কৃষকরা, আবার পানিবন্দী হয়ে পড়া সহস্রাধিক পরিবার ও গবাদিপশুর জন্যও সৃষ্টি হয়েছে নানামুখী সংকট।

 

চরের মানুষজন এখন শুধু বেঁচে থাকার লড়াই করছেন। একদিকে ঘরে খাবার নেই, অন্যদিকে ফসল তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকের চোখে অন্ধকার। পানিতে নিমজ্জিত ঘরে ঢুকে পড়ছে সাপ, ব্যাঙ আর পোকামাকড়। দূষিত হয়ে পড়েছে নলকূপের পানি। শিশুরা কাঁদছে ক্ষুধায়, গর্ভবতী নারীরা ঝুঁকির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

 

মোহরকয়া গ্রামের কৃষক আ. সামাদ মাঝি (৫৫) কণ্ঠ ভারী করে বলেন, “দেড় লাখ টাকা খরচ করে ৫ বিঘা জমিতে চালকুমড়া, ২ বিঘা জমিতে পটল আর এক বিঘায় ধুন্দল চাষ করেছিলাম। সব শেষ হয়ে গেল চোখের সামনে।”  ইলশামারী গ্রামের শিল্পী বেগম (৪৩) এর বেদনার কণ্ঠ আরও তীব্র। তিনি বলেন, “পানিতে হাঁস-মুরগি ও ছাগল মারা যাচ্ছে। নলকূপের পানি থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। পড়েছি বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকটে।”

 

শুধু মানুষ নয়, পশুপাখিও বেঁচে থাকার সংগ্রাম করে চলেছে। বিলমাড়িয়ার খামারি মজনু আহমেদ ৪৫টি মহিষ নিয়ে এখন আশ্রয় খুঁজছেন উপজেলার রাস্তায় রাস্তায়। চরাঞ্চলের ঘাস সব ডুবে গেছে। গরু-ছাগলের খাবারের দাম বেড়েছে কয়েকগুণ।

 

উপজেলা কৃষি ও প্রাণিসম্পদ দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী ৬৬০ হেক্টর আখ, ১৪ হেক্টর সবজি, ১১ হেক্টর কলা, ২ হেক্টর তুলা, ২ হেক্টর আউশ ধান তলিয়ে গেছে।  চরাঞ্চলে প্রায় ১০ হাজার গরু, ৪ হাজার মহিষ, ১২ হাজার ছাগল ও ভেড়া রয়েছে। এসব গবাদিপশু তীব্র খাদ্য সংকটে রয়েছে।

 

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রীতম কুমার হোড় বলেন, “বর্তমানে পানি চর থেকে নামা শুরু করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রাথমিক তালিকা করা হচ্ছে। পরবর্তীতে কোন সহযোগিতা আসলে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা হবে।”

 

উপজেলা প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আব্দুল্লাহ বলেন, “চরের চারণভূমি ও লাগানো ঘাস ডুবে যাওয়ায় গো-খাদ্যের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। পানি নেমে গেলে নতুন ঘাস জন্মাতে দুই মাস সময় লাগবে। তারপর সংকট কেটে যাবে।”

 

উপজেলা প্রশাসন কিছুটা সহায়তা দিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ইউএনও মেহেদী হাসান জানিয়েছেন, “ইতিমধ্যে ১২০ পরিবারকে শুকনো খাবার দেয়া হয়েছে। শিগগিরই আরও ৭৭৭ পরিবার সহায়তা পাবে। তবে পরিস্থিতি কত দ্রুত স্বাভাবিক হবে, তা নির্ভর করছে পদ্মার পানি নামার গতির ওপর।”

 

চরের মানুষ এখন শুধু অপেক্ষায় কবে পানি নামবে? কবে ফসল ফলবে? আর কবে জীবন ফিরবে স্বাভাবিক ছন্দে?