ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রতিনিধি নিয়োগ
দৈনিক সময়ের প্রত্যাশা পত্রিকার জন্য সারা দেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আপনি আপনার এলাকায় সাংবাদিকতা পেশায় আগ্রহী হলে যোগাযোগ করুন। Hotline- +880 9617 179084

জয়ের বাড়িতে বৈঠক বসেছিল হত্যা কাণ্ডের আড়াই ঘণ্টা আগে

আত্রাইয়ে একই পরিবারের তিন খুন

মোঃ আব্দুল জব্বার ফারুক:

 

নওগাঁর আত্রাই উপজেলার কাশিয়াবাড়ী এলাকার বলরামচক চৌধুরী পাড়ায় স্বামী রাজ সরকার জয় (২৫), স্ত্রী দৃষ্টিরাণী সরকার (২২) ও শিশু কন্যা জেনি সরকার (২) ছুরিকাঘাতে নিহত হওয়ার ঘটনায় নতুন তথ্য উঠে এসেছে। ছুরিকাঘাতের অন্তত দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা আগে রাজ সরকার জয়ের বাসায় একটি বৈঠক বসেছিল বলে দাবি করেছেন দৃষ্টিরাণীর বাবা রবি সরকার।

 

এছাড়া প্রেম করে বিয়ের পর থেকেই দৃষ্টিরাণীকে জয়ের পরিবারের সদস্যরা মেনে নিতে পারেননি এবং যৌতুকের টাকার জন্য প্রায়ই দ্বন্দ্ব চলছিল বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।

 

রবি সরকার দিনাজপুর জেলা সদরের গোপালগঞ্জ মহল্লার কৃষ্ণ বাহাদুরের ছেলে। তিনি জানান, প্রায় পাঁচ বছর আগে প্রেমের সম্পর্কের জেরে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে জয় সরকার দৃষ্টিরাণীকে বিয়ে করেন। এরপর থেকে জয়ের পরিবারের লোকজন দৃষ্টিরাণীকে ঠিকভাবে মেনে নিতে পারছিল না এবং তাকে নানাভাবে নির্যাতন করত।

 

তিনি আরও বলেন, বিয়ের দেড় মাস পর মেয়ে-জামাই বেড়াতে এলে তাদের ভালো থাকার জন্য তিন লাখ টাকা ও এক ভরি স্বর্ণালঙ্কার দেওয়ার কথা বলেন। এর মধ্যে দুই লাখ টাকা ও এক ভরি স্বর্ণালঙ্কার দেওয়া হলেও বাকি এক লাখ টাকা দিতে না পারায় জয়ের পরিবার বারবার টাকার জন্য চাপ দিচ্ছিল।

 

এরই মধ্যে তাদের সংসারে একটি কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। গত দেড় বছর ধরে দৃষ্টিরাণীকে বাবার বাড়িতে যেতে দেওয়া হয়নি। অনেক অনুরোধের পর সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দুই দিন আগে জয়ের বাবা দেগতি সরকার সান্তাহার স্টেশনে দৃষ্টিরাণীকে পৌঁছে দেন। এরপর দৃষ্টিরাণী আর জয়ের সংসারে ফিরতে রাজি হয়নি।

 

দৃষ্টিরাণীর বাবা বলেন, জয় ছিল জেদি ও বিলাসী স্বভাবের। সে প্রায়ই শ্বশুরের কাছে কখনো পৃথিয়াজার আবার কখনো এক লাখ টাকা পর্যন্ত চাইত। এসব কারণে মেয়ের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো। এতে অতিষ্ঠ হয়ে দৃষ্টিরাণী জয়ের সংসার না করার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে আর এমন ঘটনা ঘটবে না বলে আশ্বাস দিয়ে ঘটনার প্রায় ১০ দিন আগে জয় দৃষ্টিরাণীকে আবার সংসারে ফিরিয়ে নিয়ে আসে।

 

তিনি বলেন, গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে মোবাইল ফোনে জানতে পারি আমার মেয়ে দৃষ্টিরাণী সরকার ও নাতনি জেনি সরকারকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। তবে কে বা কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে তা কেউ জানাতে পারেনি। শুক্রবার দুপুরে আত্রাই থানায় এসে মেয়ের মরদেহ দেখতে পাই।

 

রবি সরকারের দাবি, তার জামাই জয় সরকার তার মেয়ে ও নাতনিকে হত্যা করতে পারে না এবং জয় নিজেও আত্মহত্যা করতে পারে না। তিনি ধারণা করছেন, জয়ের পরিবারের কেউ এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।

 

তিনি আরও জানান, স্থানীয়দের কাছ থেকে জেনেছেন যে ঘটনার রাতে জয়ের বাড়িতে একটি বৈঠক হয়েছিল। সেই বৈঠকের দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা পরই এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। তবে বৈঠকে কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল তা তিনি জানেন না।

 

এ ঘটনায় দৃষ্টিরাণীর বাবা রবি সরকার বাদী হয়ে দৃষ্টিরাণীর শ্বশুর-শাশুড়িসহ চারজনকে আসামি করে শুক্রবার রাতে আত্রাই থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। অন্যদিকে জয়ের মৃত্যুর ঘটনায় তার বাবা গৌতম সরকার বাদী হয়ে একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করেছেন।

 

বলরামচক এলাকার স্থানীয় মেম্বার গোলাম মোস্তফা বলেন, জয়ের বাড়িতে ওই রাতে বৈঠকের বিষয়টি তার জানা নেই। তবে সাবেক মেম্বার স্বপন কুমার জানান, জয় মাদকাসক্ত ছিল। তাকে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তির বিষয়ে পারিবারিকভাবে বৈঠক হয়েছিল। সেখান থেকে সবাই চলে যাওয়ার কিছু সময় পরই ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটে।

 

জয়ের মা চায়না রাণী সরকার বলেন, ঘটনার দুই-তিন দিন আগে জয় একটি টেলিভিশন ভেঙে ফেলেছিল। যাতে সে আর ভাঙচুর না করে সে বিষয়ে আলোচনা করতেই বৈঠক হয়েছিল। পরে সবাই চলে গেলে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা পর ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটে।

 

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শাহাজুল ইসলাম বলেন, ওই রাতে বৈঠকের বিষয়টি শোনা গেছে। কারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এবং কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি ঘটনার অন্যান্য দিকও খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

 

উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে রাজ সরকার জয়ের স্ত্রী দৃষ্টিরাণী সরকারের চিৎকারে স্থানীয়রা ছুটে যান। পরে দৃষ্টিরাণী সরকার, শিশু কন্যা জেনি সরকার ও জয় সরকারকে গলায়, পিঠে ও বুকে ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে আত্রাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক দৃষ্টিরাণীকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য শিশু জেনি ও জয়কে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে রাতেই জেনি সরকার এবং শুক্রবার সকাল ৮টার দিকে জয় সরকার মারা যান।

Tag :
এই অথরের আরো সংবাদ দেখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

কবরের ফুলগাছ চুরি, পুরো গ্রামে ফুলগাছ লাগিয়ে চোরকে অভিনব জবাব যুবকের

error: Content is protected !!

জয়ের বাড়িতে বৈঠক বসেছিল হত্যা কাণ্ডের আড়াই ঘণ্টা আগে

আত্রাইয়ে একই পরিবারের তিন খুন

আপডেট টাইম : ০৪:৪৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬
মোঃ আব্দুল জব্বার ফারুক, আত্রাই (নওগাঁ) প্রতিনিধি :

মোঃ আব্দুল জব্বার ফারুক:

 

নওগাঁর আত্রাই উপজেলার কাশিয়াবাড়ী এলাকার বলরামচক চৌধুরী পাড়ায় স্বামী রাজ সরকার জয় (২৫), স্ত্রী দৃষ্টিরাণী সরকার (২২) ও শিশু কন্যা জেনি সরকার (২) ছুরিকাঘাতে নিহত হওয়ার ঘটনায় নতুন তথ্য উঠে এসেছে। ছুরিকাঘাতের অন্তত দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা আগে রাজ সরকার জয়ের বাসায় একটি বৈঠক বসেছিল বলে দাবি করেছেন দৃষ্টিরাণীর বাবা রবি সরকার।

 

এছাড়া প্রেম করে বিয়ের পর থেকেই দৃষ্টিরাণীকে জয়ের পরিবারের সদস্যরা মেনে নিতে পারেননি এবং যৌতুকের টাকার জন্য প্রায়ই দ্বন্দ্ব চলছিল বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।

 

রবি সরকার দিনাজপুর জেলা সদরের গোপালগঞ্জ মহল্লার কৃষ্ণ বাহাদুরের ছেলে। তিনি জানান, প্রায় পাঁচ বছর আগে প্রেমের সম্পর্কের জেরে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে জয় সরকার দৃষ্টিরাণীকে বিয়ে করেন। এরপর থেকে জয়ের পরিবারের লোকজন দৃষ্টিরাণীকে ঠিকভাবে মেনে নিতে পারছিল না এবং তাকে নানাভাবে নির্যাতন করত।

 

তিনি আরও বলেন, বিয়ের দেড় মাস পর মেয়ে-জামাই বেড়াতে এলে তাদের ভালো থাকার জন্য তিন লাখ টাকা ও এক ভরি স্বর্ণালঙ্কার দেওয়ার কথা বলেন। এর মধ্যে দুই লাখ টাকা ও এক ভরি স্বর্ণালঙ্কার দেওয়া হলেও বাকি এক লাখ টাকা দিতে না পারায় জয়ের পরিবার বারবার টাকার জন্য চাপ দিচ্ছিল।

 

এরই মধ্যে তাদের সংসারে একটি কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। গত দেড় বছর ধরে দৃষ্টিরাণীকে বাবার বাড়িতে যেতে দেওয়া হয়নি। অনেক অনুরোধের পর সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দুই দিন আগে জয়ের বাবা দেগতি সরকার সান্তাহার স্টেশনে দৃষ্টিরাণীকে পৌঁছে দেন। এরপর দৃষ্টিরাণী আর জয়ের সংসারে ফিরতে রাজি হয়নি।

 

দৃষ্টিরাণীর বাবা বলেন, জয় ছিল জেদি ও বিলাসী স্বভাবের। সে প্রায়ই শ্বশুরের কাছে কখনো পৃথিয়াজার আবার কখনো এক লাখ টাকা পর্যন্ত চাইত। এসব কারণে মেয়ের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো। এতে অতিষ্ঠ হয়ে দৃষ্টিরাণী জয়ের সংসার না করার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে আর এমন ঘটনা ঘটবে না বলে আশ্বাস দিয়ে ঘটনার প্রায় ১০ দিন আগে জয় দৃষ্টিরাণীকে আবার সংসারে ফিরিয়ে নিয়ে আসে।

 

তিনি বলেন, গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে মোবাইল ফোনে জানতে পারি আমার মেয়ে দৃষ্টিরাণী সরকার ও নাতনি জেনি সরকারকে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে। তবে কে বা কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে তা কেউ জানাতে পারেনি। শুক্রবার দুপুরে আত্রাই থানায় এসে মেয়ের মরদেহ দেখতে পাই।

 

রবি সরকারের দাবি, তার জামাই জয় সরকার তার মেয়ে ও নাতনিকে হত্যা করতে পারে না এবং জয় নিজেও আত্মহত্যা করতে পারে না। তিনি ধারণা করছেন, জয়ের পরিবারের কেউ এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।

 

তিনি আরও জানান, স্থানীয়দের কাছ থেকে জেনেছেন যে ঘটনার রাতে জয়ের বাড়িতে একটি বৈঠক হয়েছিল। সেই বৈঠকের দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা পরই এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। তবে বৈঠকে কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল তা তিনি জানেন না।

 

এ ঘটনায় দৃষ্টিরাণীর বাবা রবি সরকার বাদী হয়ে দৃষ্টিরাণীর শ্বশুর-শাশুড়িসহ চারজনকে আসামি করে শুক্রবার রাতে আত্রাই থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। অন্যদিকে জয়ের মৃত্যুর ঘটনায় তার বাবা গৌতম সরকার বাদী হয়ে একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করেছেন।

 

বলরামচক এলাকার স্থানীয় মেম্বার গোলাম মোস্তফা বলেন, জয়ের বাড়িতে ওই রাতে বৈঠকের বিষয়টি তার জানা নেই। তবে সাবেক মেম্বার স্বপন কুমার জানান, জয় মাদকাসক্ত ছিল। তাকে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তির বিষয়ে পারিবারিকভাবে বৈঠক হয়েছিল। সেখান থেকে সবাই চলে যাওয়ার কিছু সময় পরই ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটে।

 

জয়ের মা চায়না রাণী সরকার বলেন, ঘটনার দুই-তিন দিন আগে জয় একটি টেলিভিশন ভেঙে ফেলেছিল। যাতে সে আর ভাঙচুর না করে সে বিষয়ে আলোচনা করতেই বৈঠক হয়েছিল। পরে সবাই চলে গেলে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা পর ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটে।

 

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শাহাজুল ইসলাম বলেন, ওই রাতে বৈঠকের বিষয়টি শোনা গেছে। কারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এবং কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি ঘটনার অন্যান্য দিকও খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

 

উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে রাজ সরকার জয়ের স্ত্রী দৃষ্টিরাণী সরকারের চিৎকারে স্থানীয়রা ছুটে যান। পরে দৃষ্টিরাণী সরকার, শিশু কন্যা জেনি সরকার ও জয় সরকারকে গলায়, পিঠে ও বুকে ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে আত্রাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক দৃষ্টিরাণীকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য শিশু জেনি ও জয়কে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে রাতেই জেনি সরকার এবং শুক্রবার সকাল ৮টার দিকে জয় সরকার মারা যান।