ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রতিনিধি নিয়োগ
দৈনিক সময়ের প্রত্যাশা পত্রিকার জন্য সারা দেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আপনি আপনার এলাকায় সাংবাদিকতা পেশায় আগ্রহী হলে যোগাযোগ করুন। Hotline- +880 9617 179084

রংপুরের প্রাণ শ্যামাসুন্দরী খাল: ১৫ কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

মো. নাঈমুল ইসলাম:

 

রংপুর নগরীর ঐতিহ্যবাহী শ্যামাসুন্দরী খাল পুনরুজ্জীবনে ১৫ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবিদদের দাবি, আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করে দায়সারাভাবে খননকাজ পরিচালনা করা হচ্ছে, যা প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে।

 

বালতি দিয়ে খননের অভিযোগ

সরেজমিনে দেখা গেছে, খালের বিভিন্ন অংশে শ্রমিকরা বালতি দিয়ে মাটি উত্তোলন করছেন। উত্তোলিত মাটি খালের পাড়েই স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সামান্য বৃষ্টি বা বাতাসে এসব মাটি আবার খালে ফিরে যাচ্ছে। তাদের মতে, প্রকল্পের উদ্দেশ্য অনুযায়ী কার্যকর খননকাজের পরিবর্তে লোকদেখানো কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

 

দখল ও অবকাঠামোগত বাধা

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় খাল পুনঃখননের পাশাপাশি সাইড ওয়াল নির্মাণ, সিসি ব্লক স্থাপন এবং বনায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে খালের দুই পাড়ে চার শতাধিক অবৈধ স্থাপনা এবং খালের ওপর নির্মিত ৩৫টি কালভার্ট এখনো স্বাভাবিক পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে।

 

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় প্রায় ১৫০ ফুট প্রশস্ত শ্যামাসুন্দরী খাল বর্তমানে অনেক স্থানে সরু নালায় পরিণত হয়েছে। দখল উচ্ছেদ ছাড়াই সৌন্দর্যবর্ধনমূলক কার্যক্রম গ্রহণের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

 

বিশেষজ্ঞদের মতামত

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রিভারাইন পিপলের পরিচালক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, “ঘাঘট নদীর সঙ্গে খালের সংযোগ পুনঃস্থাপন এবং দখল উচ্ছেদ ছাড়া শ্যামাসুন্দরী খালকে টেকসইভাবে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়। কেবল সৌন্দর্যবর্ধনমূলক কাজ করে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যাবে না।”

 

তিনি আরও বলেন, সঠিক খনন ও পানিপ্রবাহ নিশ্চিত না করা হলে প্রকল্পের অর্থ ব্যয় কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনবে না।

 

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

কাজের মান ও অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে পাউবো রংপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, প্রকল্পের মাধ্যমে কিছু তাৎক্ষণিক সুফল পাওয়া যেতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। দুর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কে তিনি জানান, “বিষয়টি আমাদের জানা নেই। অভিযোগ পাওয়া গেলে খতিয়ে দেখা হবে।”

 

অন্যদিকে, সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করা ঠিকাদার আহসানুল হক মুকুল সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে এবং কোনো ধরনের গাফিলতি নেই।

 

ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা

২০২৫ সালের নভেম্বরে শুরু হওয়া প্রকল্পটির কাজ ২০২৭ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। তবে প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়েই ওঠা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সচেতন মহলের দাবি, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে শ্যামাসুন্দরী খালের প্রকৃত পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।

Tag :
এই অথরের আরো সংবাদ দেখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

দেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা চলছে: ঠাকুরগাঁওয়ে মির্জা ফখরুল

error: Content is protected !!

রংপুরের প্রাণ শ্যামাসুন্দরী খাল: ১৫ কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ

আপডেট টাইম : ০৫:১৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২৬
মোঃ নাঈম ইসলাম, রংপুর (সদর) উপজেলা প্রতিনিধি :

মো. নাঈমুল ইসলাম:

 

রংপুর নগরীর ঐতিহ্যবাহী শ্যামাসুন্দরী খাল পুনরুজ্জীবনে ১৫ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবিদদের দাবি, আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার না করে দায়সারাভাবে খননকাজ পরিচালনা করা হচ্ছে, যা প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে।

 

বালতি দিয়ে খননের অভিযোগ

সরেজমিনে দেখা গেছে, খালের বিভিন্ন অংশে শ্রমিকরা বালতি দিয়ে মাটি উত্তোলন করছেন। উত্তোলিত মাটি খালের পাড়েই স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সামান্য বৃষ্টি বা বাতাসে এসব মাটি আবার খালে ফিরে যাচ্ছে। তাদের মতে, প্রকল্পের উদ্দেশ্য অনুযায়ী কার্যকর খননকাজের পরিবর্তে লোকদেখানো কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

 

দখল ও অবকাঠামোগত বাধা

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় খাল পুনঃখননের পাশাপাশি সাইড ওয়াল নির্মাণ, সিসি ব্লক স্থাপন এবং বনায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে খালের দুই পাড়ে চার শতাধিক অবৈধ স্থাপনা এবং খালের ওপর নির্মিত ৩৫টি কালভার্ট এখনো স্বাভাবিক পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে।

 

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় প্রায় ১৫০ ফুট প্রশস্ত শ্যামাসুন্দরী খাল বর্তমানে অনেক স্থানে সরু নালায় পরিণত হয়েছে। দখল উচ্ছেদ ছাড়াই সৌন্দর্যবর্ধনমূলক কার্যক্রম গ্রহণের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

 

বিশেষজ্ঞদের মতামত

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রিভারাইন পিপলের পরিচালক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, “ঘাঘট নদীর সঙ্গে খালের সংযোগ পুনঃস্থাপন এবং দখল উচ্ছেদ ছাড়া শ্যামাসুন্দরী খালকে টেকসইভাবে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়। কেবল সৌন্দর্যবর্ধনমূলক কাজ করে দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যাবে না।”

 

তিনি আরও বলেন, সঠিক খনন ও পানিপ্রবাহ নিশ্চিত না করা হলে প্রকল্পের অর্থ ব্যয় কাঙ্ক্ষিত ফল বয়ে আনবে না।

 

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

কাজের মান ও অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে পাউবো রংপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, প্রকল্পের মাধ্যমে কিছু তাৎক্ষণিক সুফল পাওয়া যেতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। দুর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কে তিনি জানান, “বিষয়টি আমাদের জানা নেই। অভিযোগ পাওয়া গেলে খতিয়ে দেখা হবে।”

 

অন্যদিকে, সাব-কন্ট্রাক্টে কাজ করা ঠিকাদার আহসানুল হক মুকুল সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে এবং কোনো ধরনের গাফিলতি নেই।

 

ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা

২০২৫ সালের নভেম্বরে শুরু হওয়া প্রকল্পটির কাজ ২০২৭ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। তবে প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়েই ওঠা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সচেতন মহলের দাবি, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে শ্যামাসুন্দরী খালের প্রকৃত পুনরুদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।