আলিফ হোসেন:
রাজশাহীর সীমান্তবর্তী মোহনপুর উপজেলার আমরাইল উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকসহ ১৪ জন শিক্ষক কর্মরত থাকলেও চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১৩ শিক্ষার্থীর কেউই পাস করতে পারেনি। ফলে বিদ্যালয়টির পাসের হার দাঁড়িয়েছে শূন্য শতাংশে।
সোমবার (১০ আগস্ট) এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর মোহনপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। এ ফলাফল বিদ্যালয়ের পাঠদান, একাডেমিক কার্যক্রম এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
অভিজ্ঞ মহলের অভিযোগ, একটি বিদ্যালয়ে এত সংখ্যক শিক্ষক থাকার পরও ১৩ জন পরীক্ষার্থীর সবাই অকৃতকার্য হওয়ার বিষয়টি শুধু শিক্ষার্থীদের ফলাফল দিয়ে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষকদের উপস্থিতি, শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তা দেওয়া হয়েছে কি না, সেসব বিষয়েও নজর দেওয়া প্রয়োজন ছিল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আমরাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মঞ্জুর রহমান মঞ্জু নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকেন না। কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধেও পাঠদানে অনাগ্রহের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয় কয়েকজন প্রধান শিক্ষক ও একজন সহকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে মাদক সেবনের অভিযোগ করেছেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক অভিভাবক বলেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের ডোপ টেস্টসহ প্রয়োজনীয় তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
এ বিষয়ে আমরাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মঞ্জুর রহমান মঞ্জু বলেন, ‘বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। আমি সব শিক্ষককে নিয়ে জরুরি সভা করব। স্কুলের ফলাফল এমন হলো কেন, তা বুঝে উঠতে পারছি না।’
মোহনপুর উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার আব্দুল মতিন বলেন, ‘প্রধান শিক্ষক ও একজন সহকারী শিক্ষক নিয়মিত মাদক সেবন করেন—এমন বিষয় জানার পরও তারা বিগত সরকারের লোক হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। এখন থেকে প্রতিটি বিদ্যালয়ে নিয়মিত মনিটরিং করা হবে।’
একাডেমিক সুপারভাইজারের এমন বক্তব্যের পর প্রশ্ন উঠেছে, অভিযোগের বিষয়টি শিক্ষা অফিসের জানা থাকার পরও এতদিন সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন। নিয়মিত মনিটরিং হয়ে থাকলে বিদ্যালয়টির একাডেমিক দুর্বলতা আগে শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলো না কেন—এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
ফলাফল বিপর্যয়ের বিষয়ে মোহনপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম মাহমুদল হাসান বলেন, ‘ওই বিদ্যালয়ের এমপিও বাতিলের জন্য আমি অবশ্যই লিখব।’
মোহনপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও আমরাইল উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ফাহিমা বিনতে আখতার বলেন, ‘আমরাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ জানতে প্রধান শিক্ষককে তলব করা হয়েছে। কী কারণে বিদ্যালয়ের সব পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। শিক্ষকদের পাঠদানে অবহেলা বা দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের গাফিলতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
চলতি বছর মোহনপুর উপজেলায় পাঁচটি কেন্দ্রে এসএসসি, দাখিল ও সমমান পরীক্ষায় মোট ২ হাজার ৪২ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে মোহনপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে আটটি প্রতিষ্ঠানের ৪০৪ জন, মোহনপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে নয়টি প্রতিষ্ঠানের ৩৬৭ জন, কেশরহাট উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ১৩টি প্রতিষ্ঠানের ৫১৯ জন, কেশরহাট কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে ৩২৭ জন এবং সাঁকোয়া-বাকশৈল কামিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে ১৮টি প্রতিষ্ঠানের ৪২৫ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়।
একটি বিদ্যালয়ের ১৩ পরীক্ষার্থীর সবাই ফেল করার ঘটনায় বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান, শিক্ষকদের দায়িত্বশীলতা এবং শিক্ষা অফিসের মনিটরিং ব্যবস্থা নিয়ে তদন্তের দাবি উঠেছে। বিশেষ করে একাডেমিক সুপারভাইজার যদি আগে থেকেই শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে অবগত থেকে থাকেন, তাহলে তিনি কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি বিদ্যালয়ের শতভাগ পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়া গুরুতর একাডেমিক সংকেত। এ ধরনের ফলাফলের কারণ অনুসন্ধানে শুধু শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নয়, বিদ্যালয় পরিচালনা এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তাদের তদারকির বিষয়টিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

সারাদেশে জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস-২০২৬ পালিত 
আলিফ হোসেন, তানোর (রাজশাহী) প্রতিনিধি 




















