তরিকুল ইসলাম মোস্তফাঃ
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার মদনপুরা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে ৬ একর ২৬ শতাংশ জমির ওপর গড়ে উঠেছে জাকির হোসেন মৃধার বহুমুখী খামার। দুগ্ধ খামার, গরু মোটাতাজাকরণ, মৎস্য চাষ, ফলজ বাগান, ঔষধি গাছ ও বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ—সব মিলিয়ে সমন্বিত কৃষি উদ্যোগের মাধ্যমে নিজের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছেন তিনি।
সরেজমিনে খামারবাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, চারপাশে সবুজের সমারোহ। পুকুরগুলোতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষের পাশাপাশি পুকুরপাড় ও খালি জায়গায় লাউ, ঝিঙে, মিষ্টি কুমড়া, চাল কুমড়া, ডাঁটাসহ বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি চাষ করা হচ্ছে। রয়েছে নারিকেল, আম, কাঁঠালসহ বিভিন্ন ফলদ গাছও।
খামার তৈরির পেছনের অনুপ্রেরণার কথা জানাতে গিয়ে জাকির হোসেন মৃধা বলেন, ছাত্রজীবনে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের একটি ভাষণ তাকে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করে। খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো এবং রাস্তার দুপাশে ফলদ ও সবজি গাছ লাগানোর আহ্বান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি কৃষি ও মৎস্যভিত্তিক এ উদ্যোগ গড়ে তোলেন।
খামারে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও গবাদিপশু জাকির হোসেনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তার খামারের মোট আয়তন ৬ একর ২৬ শতাংশ। বিভিন্ন পুকুরে পাঙ্গাস, তেলাপিয়া, রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্প, মিরর কার্প ও গ্লাস কার্পসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ করা হচ্ছে। এ ছাড়া ১ একর ৪০ শতাংশ জমিতে কৈ মাছ, ৩৫ শতাংশে শিং মাছ, ১১০ শতাংশে তেলাপিয়া এবং ১ একর ২০ শতাংশ জমিতে গলদা চিংড়ির চাষ করা হচ্ছে। খামারের অন্যান্য অংশে গবাদিপশু পালন ও বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করা হয়।
দুগ্ধ খামার ও গরু মোটাতাজাকরণ প্রকল্পের মাধ্যমে দুধ ও মাংস উৎপাদনের পাশাপাশি কোরবানির ঈদে ষাঁড় গরু বিক্রি করেন তিনি। খামারের ফলজ বাগান থেকেও প্রতিবছর আয় হচ্ছে বলে জানান জাকির হোসেন।
প্রায় ২০ মানুষের কর্মসংস্থান সরকারি চাকরির নিরাপদ পথ ছেড়ে কেন কৃষি ও খামারমুখী হয়েছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে জাকির হোসেন মৃধা বলেন, শুধু সরকারি চাকরির ওপর নির্ভর না করে উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, তার খামারে বর্তমানে প্রায় ২০ জন মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। তারা নিজেদের পরিবার পরিচালনার পাশাপাশি স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। নিজেদের জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে কৃষি ও খামার গড়ে তুললে বেকারত্ব কমার পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখা সম্ভব।
১০ লাখ টাকার গলদা চিংড়ি চুরির অভিযোগ
তবে সফলতার পাশাপাশি সম্প্রতি ক্ষতির মুখেও পড়েছেন এই খামারি। জাকির হোসেনের অভিযোগ, রাতের আঁধারে দুর্বৃত্তরা খামারের পুকুরে ওষুধ প্রয়োগ করে প্রায় ১০ লাখ টাকা মূল্যের গলদা চিংড়ি ধরে নিয়ে গেছে।
তবে এ ঘটনায় কারা জড়িত, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি তিনি। বিষয়টি তিনি বাউফল উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাকে জানিয়েছেন বলে জানান।
এ বিষয়ে বাউফল উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা এম এম পারভেজ বলেন, “গলদা চিংড়ির বিষয়টি আমাকে ফোন করে জানিয়েছেন। কিন্তু ওষুধ প্রয়োগ করে মাছ চুরি করে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি আমার জানা ছিল না এবং তিনি আমাকে বলেননি। যার ফলে আমি সরেজমিনে পরিদর্শনে যাইনি।”
তিনি আরও বলেন, “মৎস্য অধিদপ্তর থেকে আমরা পরিদর্শন ও পরামর্শ দিয়ে থাকি। রোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকারের বিষয়েও পরামর্শ দেওয়া হয়। কোনো খামারি আমাদের জানালে আমরা সরাসরি সেখানে গিয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে থাকি।”
সরকারি সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ, কর্মকর্তার ভিন্ন বক্তব্য
জাকির হোসেনের অভিযোগ, তার খামারে বাউফল উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের কোনো কর্মকর্তা কখনো পরিদর্শনে আসেননি। গবাদিপশুর চিকিৎসা ও কৃত্রিম প্রজননের ক্ষেত্রেও তিনি স্থানীয়ভাবে প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা পাচ্ছেন না বলে দাবি করেন।
অন্যদিকে, বাউফল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মিলন বলেন, “জনাব জাকির হোসেন মৃধার খামারটি আমি পরিদর্শন করেছি। তাঁর খামারটি যিনি পরিচালনা করেন, তাঁর সঙ্গে আমাদের ফিল্ড অফিসারের নিয়মিত যোগাযোগ আছে। এ ছাড়া যেকোনো ধরনের রোগবালাই বা পরামর্শের প্রয়োজন হলে বাউফল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার অফিসে যোগাযোগ করলে লোক পাঠিয়ে সঙ্গে সঙ্গে সমাধান করা হবে।”
প্রাণিসম্পদ দপ্তরের বাউফল উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আশঙ্কা
খামারে মাছ চুরির ঘটনাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সঙ্গে যুক্ত করে জাকির হোসেন মৃধা বলেন, রাজনৈতিক কারণে তাকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে এ ঘটনা ঘটানো হয়ে থাকতে পারে বলে তিনি ধারণা করছেন। তবে এ দাবির পক্ষে তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণের কথা জানাননি।
জাকির হোসেন মৃধা মদনপুরা ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি এবং বর্তমানে বাউফল উপজেলা বিএনপির সদস্য। তিনি আসন্ন মদনপুরা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী বলেও জানান।
কৃষি, মৎস্য ও পশুপালনকে সমন্বিত করে গড়ে তোলা এই খামার এখন স্থানীয়ভাবে একটি উল্লেখযোগ্য কৃষি উদ্যোগ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। সরকারি চাকরির বাইরে উদ্যোক্তা হয়ে কর্মসংস্থান তৈরির এমন উদ্যোগ অন্যদেরও কৃষি ও খামারভিত্তিক কাজে উৎসাহিত করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রায়ের পর বদলে গেল গোগ্রামের পাঁচ বছরের নির্বাচনী হিসাব 
তরিকুল ইসলাম মোস্তফা, বাউফল (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি 





















