ঢাকা , সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রতিনিধি নিয়োগ
দৈনিক সময়ের প্রত্যাশা পত্রিকার জন্য সারা দেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আপনি আপনার এলাকায় সাংবাদিকতা পেশায় আগ্রহী হলে যোগাযোগ করুন। Hotline- +880 9617 179084

লালপুরে উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র: আশার আলো থেকে হতাশার ঘেরাটোপ

রাশিদুল ইসলাম রাশেদ:

 

বিলমাড়িয়া হাউজপাড়া গ্রামের পথ ধরে হাঁটলে দূর থেকে চোখে পড়ে লাল ইটের একটি দোতলা ভবন। চারদিকে উঁচু দেয়ালে ঘেরা, যেন কোনো দুর্গ। কিন্তু কাছে যেতেই ভেসে আসে পচা আবর্জনার গন্ধ, চোখে পড়ে কাদা-পানিতে ভরা আঙিনা। এটি কোনো ভগ্নপ্রায় গুদামঘর নয়—এটি নাটোরের লালপুর উপজেলার বিলমাড়িয়া ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র।

 

যেখানে মানুষের প্রাণ বাঁচানোর কথা, সেখানে এখন গরু বেঁধে রাখা হয়। হাসপাতালের মূল ফটকে ঝুলছে জামাকাপড়, ভেতরে ঢোকার পথ পানিতে তলিয়ে গেছে। হাসপাতালের দরজার সামনে দেখা মেলে মো. ইনারুল ইসলাম (৩৫) নামের স্থানীয় এক যুবকের—তিনি জাল পেতে মাছ ধরছেন!

 

প্রতিদিন এই হাসপাতালের দিকে আশা নিয়ে তাকান প্রায় ১৮ হাজার মানুষ। অথচ তালাবদ্ধ দরজা, খালি কক্ষ আর জনবল সংকট তাদের আশাকে পরিণত করেছে হতাশায়।

 

মোহরকয়া গ্রামের গৃহবধূ আয়েশা সিদ্দিকা (২৮) ক্ষোভ মিশ্রিত কণ্ঠে বলেন, “চিকিৎসার জন্য আসি, কিন্তু হাসপাতালই তো ডুবে থাকে পানিতে। ডাক্তার নেই, ওষুধ নেই। তাই চিকিৎসা নয়, হতাশা নিয়েই ফিরে যেতে হচ্ছে।”

 

স্থানীয় লুতফর রহমান লিটনের (৪৩) অভিজ্ঞতাও ভিন্ন নয়। তার বাড়ির সামনেই হাসপাতাল, অথচ তিনি সেবাবঞ্চিত। তিনি বলেন, “অধিকাংশ সময় দরজা বন্ধ থাকে। ডাক্তার থাকেন না। ওষুধও মেলে না। হাসপাতাল না হয়ে এটা এখন জ্বালানি রাখার জায়গা। কখনো আবার গরু-ছাগলও বেঁধে রাখা হয়।”

 

স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কর্মরত পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক (এফপিআই) মো. রুবেল আলীও অসহায়। তিনি জানান, বিশুদ্ধ পানি নেই, চারপাশে জমে থাকা পানিতে মশা-মাছির উৎপাত। এমন পরিবেশে চিকিৎসা দেওয়া প্রায় অসম্ভব।

 

পরিচ্ছন্নতাকর্মী মাবিয়া বেগমের (৪৫) কণ্ঠে ভেসে আসে জীবনের সংগ্রামের গল্প। সরকারিভাবে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। তবু তিনি প্রতিদিন ঝাড়ু দেন, পানি আনেন, চিকিৎসকদের নির্দেশ পালন করেন। বিনিময়ে যা পান, তাই নিয়েই খুশি থাকেন। কিন্তু বৃষ্টির দিনে হাসপাতালে প্রবেশের একমাত্র রাস্তাও যখন পানিতে ডুবে যায়, তখন তার কাজ থেমে যায়।

 

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মুনজুর রহমান বলেন, জনবল সংকট মারাত্মক। স্যাকমো ও অফিস সহায়কের পদ শূন্য, ফার্মাসিস্ট প্রেষণে ২০১৬ সাল থেকে নাটোর সদর হাসপাতালে। জনবল সংকট থাকায় মেডিকেল অফিসার ও মিডওয়াইফকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যুক্ত করতে হয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তিনি আশা দেন, বরাদ্দ এলে জলাবদ্ধতা ও অবকাঠামোগত সমস্যা দ্রুত সমাধান করা হবে। একই সুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসানও আশ্বাস দেন দ্রুত সমাধানের।

 

কিন্তু আশ্বাসে কি ভরসা চলে?
যেখানে মানুষ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে এসে সেবা না পেয়ে ফিরে যায়, সেখানে প্রতিদিন জমে হতাশা আর ক্ষোভ। বিলমাড়িয়ার স্বাস্থ্যকেন্দ্র এখন মানুষের কাছে আশার আলো নয়, বরং অবহেলা আর অযত্নের প্রতীক।

 

বিলমাড়িয়া গ্রামের বৃদ্ধ দুলাল মোল্লা (৭৫) দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, “এই হাসপাতাল যদি ঠিকমতো চালু থাকতো, তাহলে কত মানুষ উপকার পেত। এখন শুধু ভবন আছে, কিন্তু চিকিৎসা নেই।”

 

চিকিৎসার অধিকার আজ যেন বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে বিলমাড়িয়ার মানুষের কাছে। হাসপাতালটি সংস্কার ও জনবল নিয়োগ ছাড়া এই হতাশার ঘেরাটোপ ভাঙার কোনো উপায় নেই।

Tag :
এই অথরের আরো সংবাদ দেখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

চরভদ্রাসনে ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন-২০২৬-এর উদ্বোধন

error: Content is protected !!

লালপুরে উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র: আশার আলো থেকে হতাশার ঘেরাটোপ

আপডেট টাইম : ০৩:০৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২২ অগাস্ট ২০২৫
রাশিদুল ইসলাম রাশেদ, লালপুর (নাটোর) প্রতিনিধি :

রাশিদুল ইসলাম রাশেদ:

 

বিলমাড়িয়া হাউজপাড়া গ্রামের পথ ধরে হাঁটলে দূর থেকে চোখে পড়ে লাল ইটের একটি দোতলা ভবন। চারদিকে উঁচু দেয়ালে ঘেরা, যেন কোনো দুর্গ। কিন্তু কাছে যেতেই ভেসে আসে পচা আবর্জনার গন্ধ, চোখে পড়ে কাদা-পানিতে ভরা আঙিনা। এটি কোনো ভগ্নপ্রায় গুদামঘর নয়—এটি নাটোরের লালপুর উপজেলার বিলমাড়িয়া ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র।

 

যেখানে মানুষের প্রাণ বাঁচানোর কথা, সেখানে এখন গরু বেঁধে রাখা হয়। হাসপাতালের মূল ফটকে ঝুলছে জামাকাপড়, ভেতরে ঢোকার পথ পানিতে তলিয়ে গেছে। হাসপাতালের দরজার সামনে দেখা মেলে মো. ইনারুল ইসলাম (৩৫) নামের স্থানীয় এক যুবকের—তিনি জাল পেতে মাছ ধরছেন!

 

প্রতিদিন এই হাসপাতালের দিকে আশা নিয়ে তাকান প্রায় ১৮ হাজার মানুষ। অথচ তালাবদ্ধ দরজা, খালি কক্ষ আর জনবল সংকট তাদের আশাকে পরিণত করেছে হতাশায়।

 

মোহরকয়া গ্রামের গৃহবধূ আয়েশা সিদ্দিকা (২৮) ক্ষোভ মিশ্রিত কণ্ঠে বলেন, “চিকিৎসার জন্য আসি, কিন্তু হাসপাতালই তো ডুবে থাকে পানিতে। ডাক্তার নেই, ওষুধ নেই। তাই চিকিৎসা নয়, হতাশা নিয়েই ফিরে যেতে হচ্ছে।”

 

স্থানীয় লুতফর রহমান লিটনের (৪৩) অভিজ্ঞতাও ভিন্ন নয়। তার বাড়ির সামনেই হাসপাতাল, অথচ তিনি সেবাবঞ্চিত। তিনি বলেন, “অধিকাংশ সময় দরজা বন্ধ থাকে। ডাক্তার থাকেন না। ওষুধও মেলে না। হাসপাতাল না হয়ে এটা এখন জ্বালানি রাখার জায়গা। কখনো আবার গরু-ছাগলও বেঁধে রাখা হয়।”

 

স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কর্মরত পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক (এফপিআই) মো. রুবেল আলীও অসহায়। তিনি জানান, বিশুদ্ধ পানি নেই, চারপাশে জমে থাকা পানিতে মশা-মাছির উৎপাত। এমন পরিবেশে চিকিৎসা দেওয়া প্রায় অসম্ভব।

 

পরিচ্ছন্নতাকর্মী মাবিয়া বেগমের (৪৫) কণ্ঠে ভেসে আসে জীবনের সংগ্রামের গল্প। সরকারিভাবে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। তবু তিনি প্রতিদিন ঝাড়ু দেন, পানি আনেন, চিকিৎসকদের নির্দেশ পালন করেন। বিনিময়ে যা পান, তাই নিয়েই খুশি থাকেন। কিন্তু বৃষ্টির দিনে হাসপাতালে প্রবেশের একমাত্র রাস্তাও যখন পানিতে ডুবে যায়, তখন তার কাজ থেমে যায়।

 

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মুনজুর রহমান বলেন, জনবল সংকট মারাত্মক। স্যাকমো ও অফিস সহায়কের পদ শূন্য, ফার্মাসিস্ট প্রেষণে ২০১৬ সাল থেকে নাটোর সদর হাসপাতালে। জনবল সংকট থাকায় মেডিকেল অফিসার ও মিডওয়াইফকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যুক্ত করতে হয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তিনি আশা দেন, বরাদ্দ এলে জলাবদ্ধতা ও অবকাঠামোগত সমস্যা দ্রুত সমাধান করা হবে। একই সুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসানও আশ্বাস দেন দ্রুত সমাধানের।

 

কিন্তু আশ্বাসে কি ভরসা চলে?
যেখানে মানুষ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে এসে সেবা না পেয়ে ফিরে যায়, সেখানে প্রতিদিন জমে হতাশা আর ক্ষোভ। বিলমাড়িয়ার স্বাস্থ্যকেন্দ্র এখন মানুষের কাছে আশার আলো নয়, বরং অবহেলা আর অযত্নের প্রতীক।

 

বিলমাড়িয়া গ্রামের বৃদ্ধ দুলাল মোল্লা (৭৫) দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, “এই হাসপাতাল যদি ঠিকমতো চালু থাকতো, তাহলে কত মানুষ উপকার পেত। এখন শুধু ভবন আছে, কিন্তু চিকিৎসা নেই।”

 

চিকিৎসার অধিকার আজ যেন বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে বিলমাড়িয়ার মানুষের কাছে। হাসপাতালটি সংস্কার ও জনবল নিয়োগ ছাড়া এই হতাশার ঘেরাটোপ ভাঙার কোনো উপায় নেই।