ঢাকা , সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ১৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রতিনিধি নিয়োগ
দৈনিক সময়ের প্রত্যাশা পত্রিকার জন্য সারা দেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আপনি আপনার এলাকায় সাংবাদিকতা পেশায় আগ্রহী হলে যোগাযোগ করুন। Hotline- +880 9617 179084

রাজশাহী অঞ্চলে মৃত্যু ডেকে আনছে ক্ষুদ্রঋণ

আলিফ হোসেনঃ

রাজশাহী অঞ্চলে ক্ষুদ্র ঋণের কবলে পড়ে আত্মহত্যা ও ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাবার মতো ঘটনা বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এনজিও ঋণের চাপে নিম্ন আয়ের দিনমজুর শ্রেণীর মানুষ রীতিমতো দিশেহারা। রাজশাহী অঞ্চলে এ এক ভয়ঙ্কর বাস্তবতা। এনজিও ও সুদের কারবারিদের উচ্চসুদের ঋণে বন্দি হয়ে পড়েছেন অসংখ্য দিনমজুর নিম্ন আয়ের মানুষ। কেউ মানসিক চাপে আত্মহত্যা করছেন, কেউ আবার পরিবার নিয়ে গ্রাম ছেড়ে পালাচ্ছেন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজশাহীর বামনশিকড় গ্রামের কৃষক মিনারুল ইসলাম। টিএমএসএস ও গাক নামের দুটি এনজিও থেকে তিনি নিয়েছিলেন সাড়ে তিন লাখ টাকা ঋণ। কাজকর্ম না থাকায় শোধ করতে পারছিলেন না। কিস্তির চাপ, সংসারের অচলাবস্থা, অভাব-সব মিলে একসময় দমবন্ধ হয়ে আসে তার। গত ১৫ আগস্ট গভীর রাতে তিনি একে একে স্ত্রী-সন্তানকে হত্যা করে নিজেও গলায় ফাঁস দেন।

পাশে পড়ে ছিল একটি চিরকুট- “ঋণের চাপে ও খাবারের অভাবে তার এই আত্মহত্যা। এই একটি ঘটনার ভেতর দিয়েই উঠে আসে রাজশাহী অঞ্চলের এক ভয়ঙ্কর বাস্তবতা। এনজিও ও সুদের কারবারিদের উচ্চসুদের ঋণে বন্দি হয়ে পড়েছেন অসংখ্য নিম্ন আয়ের মানুষ।
ঋণের ফাঁদে মৃত্যু যেনো কমছেই না।

শুধু গত কয়েক মাসেই রাজশাহী, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে আত্মহত্যা করেছেন প্রায় ১১ জন।

রাজশাহীর মোহনপুরে আকবর শাহর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার হয়। স্ত্রীর নামে ১১টি এনজিওর পাশ বই পাওয়া গেছে।কেশরহাটে সুদের কারবারির নির্যাতনে প্রাণ হারিয়েছেন রিকশাচালক ফজলুর রহমান। রাজশাহীর পবা উপজেলার শামসুদ্দিন ঋণের বোঝা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন ছাত্রাবাসে। রাজশাহীর দুর্গাপুরের কৃষক রেন্টু পাইক কিস্তির দিন টাকা জোগাড় করতে না পেরে নিজের জীবন শেষ করেছেন।

নাটোর জেলার লালপুরের রউফুল ইসলাম ও তার স্ত্রী ফাতেমা খাতুন একই সঙ্গে আত্মহত্যা করেছেন। প্রতিটি ঘটনার পেছনে একই গল্প-“কিস্তি দিতে না পারা।

রাজশাহীর তানোর, চারঘাট ও বাঘার গ্রামগুলোতে দেখা যাচ্ছে অন্য চিত্র। এলাকার প্রায় ২০টি পরিবার ঋণের দায়ে বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে। ঋণদাতা ও এনজিও কর্মীদের চাপ, কিস্তি না শোধ করার অপমান—সব মিলিয়ে তারা আর এলাকায় টিকে থাকতে পারছেন না।
এদিকে কাগজে কম, বাস্তবে বেশি সুদ।

এলাকার মানবাধিকার সংগঠন “বরেন্দ্র উন্নয়ন প্রচেষ্টা”র পরিচালক ফয়েজুল্লাহ জানান, কাগজে সুদের হার ১৪ শতাংশ হলেও বাস্তবে তা প্রায় ৩০ শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়। আয়ের আগেই সাপ্তাহিক কিস্তি শোধ করতে হয়। ফলে দরিদ্ররা ঋণের জালে আটকা পড়ে আর কখনো মুক্তি মেলে না।

 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ফরিদ খান মনে করেন, এনজিও কর্মীরা নির্দিষ্ট টার্গেট পূরণের জন্য যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঋণ দিচ্ছেন। ঋণগ্রহীতারা সুনির্দিষ্ট খাতে বিনিয়োগ না করে খরচ করছেন সংসারেই। এরপর সাপ্তাহিক কিস্তি পরিশোধের চাপ তাদের দিশেহারা করে দিচ্ছে।

অন্যদিকে তদারকির অভাবের অভিযোগ রয়েছে বিস্তর। ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম চালাতে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) অনুমোদন প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে তা মানছে না অনেক প্রতিষ্ঠান। রাজশাহীতে নিবন্ধিত এনজিও আছে এক হাজারের বেশি, তবে কোনগুলো ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম চালাচ্ছে তার পূর্ণ তথ্য নেই।
এমআরএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ ইয়াকুব হোসেন অবশ্য দাবি করেন-“যদি ঋণের টাকা সঠিকভাবে কাজে লাগানো হয়, তাহলে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।”

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষুদ্রঋণ একসময় স্বপ্ন দেখিয়েছিল দারিদ্র্য দূর করার। কিন্তু রাজশাহীতে সেটি আজ অনেকের কাছে দুঃস্বপ্নের নাম। ঋণ শোধের চাপে প্রতিদিন নতুন নতুন পরিবার হারাচ্ছে স্বপ্ন, হারাচ্ছে জীবন। আত্মহননের মিছিল থামছে না। যতদিন না এনজিও কার্যক্রমের উপর কঠোর নজরদারি, বাস্তবভিত্তিক নীতি এবং দরিদ্রদের জন্য টেকসই আয়ের পথ তৈরি করা না হবে, ততদিন এই ঋণের নাগপাশ থেকে মুক্তি মেলা কঠিন-রাজশাহীর মাঠঘাটে হয়তো আরও অজস্র মিনারুল, আকবর কিংবা রেন্টু পাইকের গল্প লেখা হতে থাকবে।

Tag :
এই অথরের আরো সংবাদ দেখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

চরভদ্রাসনে ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন-২০২৬-এর উদ্বোধন

error: Content is protected !!

রাজশাহী অঞ্চলে মৃত্যু ডেকে আনছে ক্ষুদ্রঋণ

আপডেট টাইম : ০৮:১৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ২০ অগাস্ট ২০২৫
আলিফ হোসেন, তানোর (রাজশাহী) প্রতিনিধি :

আলিফ হোসেনঃ

রাজশাহী অঞ্চলে ক্ষুদ্র ঋণের কবলে পড়ে আত্মহত্যা ও ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাবার মতো ঘটনা বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এনজিও ঋণের চাপে নিম্ন আয়ের দিনমজুর শ্রেণীর মানুষ রীতিমতো দিশেহারা। রাজশাহী অঞ্চলে এ এক ভয়ঙ্কর বাস্তবতা। এনজিও ও সুদের কারবারিদের উচ্চসুদের ঋণে বন্দি হয়ে পড়েছেন অসংখ্য দিনমজুর নিম্ন আয়ের মানুষ। কেউ মানসিক চাপে আত্মহত্যা করছেন, কেউ আবার পরিবার নিয়ে গ্রাম ছেড়ে পালাচ্ছেন।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজশাহীর বামনশিকড় গ্রামের কৃষক মিনারুল ইসলাম। টিএমএসএস ও গাক নামের দুটি এনজিও থেকে তিনি নিয়েছিলেন সাড়ে তিন লাখ টাকা ঋণ। কাজকর্ম না থাকায় শোধ করতে পারছিলেন না। কিস্তির চাপ, সংসারের অচলাবস্থা, অভাব-সব মিলে একসময় দমবন্ধ হয়ে আসে তার। গত ১৫ আগস্ট গভীর রাতে তিনি একে একে স্ত্রী-সন্তানকে হত্যা করে নিজেও গলায় ফাঁস দেন।

পাশে পড়ে ছিল একটি চিরকুট- “ঋণের চাপে ও খাবারের অভাবে তার এই আত্মহত্যা। এই একটি ঘটনার ভেতর দিয়েই উঠে আসে রাজশাহী অঞ্চলের এক ভয়ঙ্কর বাস্তবতা। এনজিও ও সুদের কারবারিদের উচ্চসুদের ঋণে বন্দি হয়ে পড়েছেন অসংখ্য নিম্ন আয়ের মানুষ।
ঋণের ফাঁদে মৃত্যু যেনো কমছেই না।

শুধু গত কয়েক মাসেই রাজশাহী, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে আত্মহত্যা করেছেন প্রায় ১১ জন।

রাজশাহীর মোহনপুরে আকবর শাহর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার হয়। স্ত্রীর নামে ১১টি এনজিওর পাশ বই পাওয়া গেছে।কেশরহাটে সুদের কারবারির নির্যাতনে প্রাণ হারিয়েছেন রিকশাচালক ফজলুর রহমান। রাজশাহীর পবা উপজেলার শামসুদ্দিন ঋণের বোঝা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন ছাত্রাবাসে। রাজশাহীর দুর্গাপুরের কৃষক রেন্টু পাইক কিস্তির দিন টাকা জোগাড় করতে না পেরে নিজের জীবন শেষ করেছেন।

নাটোর জেলার লালপুরের রউফুল ইসলাম ও তার স্ত্রী ফাতেমা খাতুন একই সঙ্গে আত্মহত্যা করেছেন। প্রতিটি ঘটনার পেছনে একই গল্প-“কিস্তি দিতে না পারা।

রাজশাহীর তানোর, চারঘাট ও বাঘার গ্রামগুলোতে দেখা যাচ্ছে অন্য চিত্র। এলাকার প্রায় ২০টি পরিবার ঋণের দায়ে বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে। ঋণদাতা ও এনজিও কর্মীদের চাপ, কিস্তি না শোধ করার অপমান—সব মিলিয়ে তারা আর এলাকায় টিকে থাকতে পারছেন না।
এদিকে কাগজে কম, বাস্তবে বেশি সুদ।

এলাকার মানবাধিকার সংগঠন “বরেন্দ্র উন্নয়ন প্রচেষ্টা”র পরিচালক ফয়েজুল্লাহ জানান, কাগজে সুদের হার ১৪ শতাংশ হলেও বাস্তবে তা প্রায় ৩০ শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়। আয়ের আগেই সাপ্তাহিক কিস্তি শোধ করতে হয়। ফলে দরিদ্ররা ঋণের জালে আটকা পড়ে আর কখনো মুক্তি মেলে না।

 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ফরিদ খান মনে করেন, এনজিও কর্মীরা নির্দিষ্ট টার্গেট পূরণের জন্য যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঋণ দিচ্ছেন। ঋণগ্রহীতারা সুনির্দিষ্ট খাতে বিনিয়োগ না করে খরচ করছেন সংসারেই। এরপর সাপ্তাহিক কিস্তি পরিশোধের চাপ তাদের দিশেহারা করে দিচ্ছে।

অন্যদিকে তদারকির অভাবের অভিযোগ রয়েছে বিস্তর। ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম চালাতে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) অনুমোদন প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে তা মানছে না অনেক প্রতিষ্ঠান। রাজশাহীতে নিবন্ধিত এনজিও আছে এক হাজারের বেশি, তবে কোনগুলো ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম চালাচ্ছে তার পূর্ণ তথ্য নেই।
এমআরএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ ইয়াকুব হোসেন অবশ্য দাবি করেন-“যদি ঋণের টাকা সঠিকভাবে কাজে লাগানো হয়, তাহলে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।”

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষুদ্রঋণ একসময় স্বপ্ন দেখিয়েছিল দারিদ্র্য দূর করার। কিন্তু রাজশাহীতে সেটি আজ অনেকের কাছে দুঃস্বপ্নের নাম। ঋণ শোধের চাপে প্রতিদিন নতুন নতুন পরিবার হারাচ্ছে স্বপ্ন, হারাচ্ছে জীবন। আত্মহননের মিছিল থামছে না। যতদিন না এনজিও কার্যক্রমের উপর কঠোর নজরদারি, বাস্তবভিত্তিক নীতি এবং দরিদ্রদের জন্য টেকসই আয়ের পথ তৈরি করা না হবে, ততদিন এই ঋণের নাগপাশ থেকে মুক্তি মেলা কঠিন-রাজশাহীর মাঠঘাটে হয়তো আরও অজস্র মিনারুল, আকবর কিংবা রেন্টু পাইকের গল্প লেখা হতে থাকবে।