ইসমাইল হোসেন বাবু:
চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলায় বিদেশি ফল উৎপাদন পাল্টে দিয়েছে অনেক কৃষকের ভাগ্য। বদলে দিয়েছে গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র। একসময় শুধু ইরি-বোরো ও আমন চাষের পাশাপাশি প্রচলিত কিছু শাক-সবজি চাষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল তাদের কৃষিকাজ। কিন্তু এখন আধুনিক পদ্ধতিতে নানা জাতের বিদেশি ফলের আবাদ করে কৃষকরা লাখ লাখ টাকা আয় করছেন। ধানের জমিতে আধুনিক পদ্ধতিতে বিদেশি বিভিন্ন জাতের ফল উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্য এখানকার কৃষকদের মুখে হাসি এনে দিয়েছে। কৃষকদের কাছে বিদেশি ফল উৎপাদন ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলায় বিদেশি ফল চাষে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। উপজেলার কৃষকরা এখন চাষ করছেন অ্যাভোকাডো, রাম্বুটান, লংগান, মাল্টা, আনারকলি ও আঙুরের মতো ভিনদেশি ফল।
১৫ বছর আগে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করা এই আবাদ এখন বাণিজ্যিক রূপ নিয়েছে। একসময় মনে করা হতো, বাংলাদেশের মাটিতে আঙুর চাষ প্রায় অসম্ভব। কারণ আঙুর মানেই ছিল বিদেশি ফল, যা আমাদের দেশে শুধু আমদানি করেই পাওয়া যায়। কিন্তু সময় বদলেছে। উন্নত জাত, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি এবং কৃষকদের আগ্রহের কারণে এখন জীবননগর উপজেলায় সফলভাবে আঙুরসহ বিদেশি ফলের চাষ হচ্ছে।
স্থানীয় কৃষকদের মতে, উর্বর পলিমাটিতে এসব ফলের চাষে খরচ কম, আবার ফলনও ভালো। ফলে চাহিদা বাড়ছে এবং বাজারেও মিলছে ভালো দাম। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় শহরের ফলের দোকানগুলোতে সরবরাহ হচ্ছে জীবননগরে উৎপাদিত ফল।
জীবননগরে পরীক্ষামূলকভাবে আনারকলি চাষ করে সফলতা পেয়েছেন অনন্তপুর গ্রামের আকশেদ আলী। গাছে গাছে ঝুলছে ফুল ও কাঁচা-পাকা সবুজ ফল। অল্প খরচে লাভজনক হওয়ায় এ চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন অন্য কৃষকরাও।
আকশেদ আলী জানান, দীর্ঘ ১০ বছর ধরে তিনি ড্রাগন ও মাল্টার চাষ করেছেন। এরপর ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ইউটিউবে ভিডিও দেখে দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল ও প্যারাগুয়ের আদি ফল আনারকলির চারা সিরাজগঞ্জ থেকে সংগ্রহ করেন। জমি প্রস্তুত করে চারাগুলো রোপণ করেন। এরপর জমিতে সেচ, সার, কীটনাশকসহ নিয়মিত পরিচর্যা করতে থাকেন। মাত্র ছয় মাসের মাথায় থোকায় থোকায় ফুল আসতে শুরু করে। ফলগুলোকে সঠিকভাবে ধরে রাখতে এবং পচন থেকে রক্ষা করতে বাঁশের খুঁটি ও তার দিয়ে মাচা তৈরি করে দেওয়া হয়। বর্তমানে মাচায় মাচায় ঝুলছে কাঁচা ও পাকা আনারকলি ফল। আগস্টের শুরু থেকে পাকা ফল তোলা শুরু হয়েছে। এসব ফল ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বাজারজাত করা হচ্ছে।
জীবননগর উপজেলার রাজাপুর গ্রামের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা সজল আহমেদ ২০১৪ সালে মাত্র ৯ বিঘা পেয়ারা বাগান থেকে শুরু করে বর্তমানে প্রায় ১৪০ বিঘা জমিতে দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির ফলের বাগান গড়ে তুলেছেন। তার বাগানে বর্তমানে মরোক্কো, পাকিস্তান, আফ্রিকা ও ভিয়েতনাম জাতের মাল্টা ৪০ বিঘা, বিভিন্ন প্রজাতির আম ৩৫ বিঘা। এছাড়া ড্রাগন, কমলা, আঙুর, অ্যাভোকাডোসহ ২০ রকমের বিদেশি ফল রয়েছে।
সজল আহমেদ বলেন, পেয়ারা চাষে কাঙ্ক্ষিত লাভ না পেয়ে তিনি ২০১৪ সালে মাল্টা চাষে মনোনিবেশ করেন। শুরুতে কিছুটা চ্যালেঞ্জ থাকলেও ধীরে ধীরে তার বাগানের পরিধি ও ফলন বাড়তে থাকে।
বর্তমানে সাধারণ সবুজ মাল্টার পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত ‘ইয়েলো কিং’সহ (হলুদ জাতের মাল্টা) প্রায় ১০ প্রজাতির দেশি-বিদেশি মাল্টা চাষ করে তিনি সফলতা পেয়েছেন। তার এই বিশাল কর্মযজ্ঞে ‘বিসমিল্লাহ নার্সারি ও ফলের বাগান’ নামের একটি কৃষি প্রকল্প গড়ে উঠেছে। সজলের এই বাগান দেখতে এবং চাষ পদ্ধতি শিখতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থী ও নতুন উদ্যোক্তারা ভিড় করেন।
উপজেলার উথলী গ্রামের আশরাফুজ্জামান মিলু ২০১০ সাল থেকে ড্রাগন ও মাল্টা চাষ শুরু করেন। বর্তমানে তার ২২ বিঘা জমিতে ড্রাগন, ৬ বিঘা জমিতে মাল্টা এবং ১০ বিঘা জমিতে পেয়ারা চাষ রয়েছে।
তিনি বলেন, “আমরা প্রাকৃতিকভাবে ফল চাষ করছি। এসব বাগানে ফল বড় করতে কোনো মেডিসিন ব্যবহার করি না। এতে ফলের আকার ছোট হচ্ছে, দামও কম পাচ্ছি।”
তিনি বলেন, এক বিঘা জমিতে থাই পেয়ারা চাষ করলে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা যায়।
উপজেলার হাসাদাহ গ্রামে বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষ করে দারুণ সাফল্য পেয়েছেন তরুণ উদ্যোক্তা দুই ভাই আশরাফুল ইসলাম ও তরিকুল ইসলাম। তারা সাড়ে ৩ বিঘা জমিতে প্রায় ৭৫০টি পার্পেল ও বাইকুনুর জাতের আঙুরগাছ লাগিয়েছেন। বাগান থেকে অর্থনৈতিকভাবে লাভের মুখ দেখছেন তারা।
জীবননগর উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জীবননগরে ড্রাগন ৬৮৮ হেক্টর, মাল্টা ৩১২ হেক্টর, কমলা ১২০ হেক্টর, শরিফা ১ হেক্টর, আঙুর ৯ হেক্টর, রকমেলন ৬ হেক্টর, আনারকলি ২ হেক্টর, অ্যাভোকাডো ৪ হেক্টর, রাম্বুটান শূন্য দশমিক ১৩ হেক্টর, পেয়ারা ৭৪৮ হেক্টর, আনার শূন্য দশমিক ৫০ হেক্টর ও বারোমাসি কাঁঠাল শূন্য দশমিক ৫০ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে।

রায়ের পর বদলে গেল গোগ্রামের পাঁচ বছরের নির্বাচনী হিসাব 
ইসমাইল হোসেন বাবু, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার 



















