ঢাকা , সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬, ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রতিনিধি নিয়োগ
দৈনিক সময়ের প্রত্যাশা পত্রিকার জন্য সারা দেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আপনি আপনার এলাকায় সাংবাদিকতা পেশায় আগ্রহী হলে যোগাযোগ করুন। Hotline- +880 9617 179084

বকের জন্য মায়া, সেই মায়াতেই প্রাণ গেল বাধনের

রাশিদুল ইসলাম রাশেদ:

 

একটি ছোট্ট বক পাখিকে ঘিরে ১১ বছরের শিশু বাধন আলীর কত স্বপ্ন, কত মায়া! নাটোর রাজবাড়িতে অসহায় অবস্থায় পড়ে থাকা পাখিটিকে দেখে তার মায়া হয়। বাড়িতে এনে পাখিটিকে কী খাওয়াবে, কীভাবে বাঁচিয়ে রাখবে—সেই চিন্তায় বিভোর ছিল সে। ফুফাতো ভাইয়ের কাছে জানতে পারে, বকের প্রিয় খাবার মাছ। সেই মাছ ধরতে গিয়ে শনিবার (৮ আগস্ট) প্রাণ হারায় শিশুটি।

 

বাধন আলী নাটোরের লালপুর উপজেলার বড়বড়িয়া গ্রামের খামারি রিপন আহমেদ বাবু ও রিনি বেগম দম্পতির একমাত্র ছেলে। সে বড়বড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

 

পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার ফুফুর বাড়ি নাটোরের দত্তপাড়া গ্রামে বেড়াতে যায় বাধন। পরদিন শুক্রবার ফুফাতো ভাইদের সঙ্গে নাটোর রাজবাড়িতে ঘুরতে গিয়ে একটি ছোট্ট বক পাখিকে অসহায় অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে। পাখিটির প্রতি মায়া জন্মালে সেটিকে বাড়িতে নিয়ে আসে সে।

 

বকটি কী খাবে জানতে চাইলে ফুফাতো ভাই প্রান্ত সরকার তাকে জানান, বকের প্রিয় খাবার মাছ। এরপর বাধন পণ্য পরিবহনের নেটের জালি পাটকাঠির সঙ্গে বেঁধে মাছ ধরার জাল তৈরি করে। শনিবার সেই জাল নিয়ে প্রতিবেশী বন্ধু রোহানকে সঙ্গে করে বাড়ি থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরের চন্দনা খালে মাছ ধরতে যায় সে।

 

মাছ ধরার একপর্যায়ে হঠাৎ পা পিছলে খালের পানিতে পড়ে যায় বাধন। তাকে উদ্ধারের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে বন্ধু রোহান। কিন্তু ছোট্ট হাতে বন্ধুকে টেনে তুলতে না পেরে সে বাড়িতে ছুটে গিয়ে স্বজনদের খবর দেয়।

 

পরে স্থানীয়রা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে খালের তলদেশ থেকে বাধনকে উদ্ধার করেন। তাকে লালপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

 

বাধনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে পরিবার ও এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। ছেলেকে হারিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন মা রিনি বেগম। বাড়ির উঠানে ক্যারেটে রাখা বক পাখিটির দিকে তাকিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন বাবা রিপন আহমেদ বাবু। বাধনের একমাত্র বোন বাবলি খাতুনও নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছে সেই পাখিটির দিকে।

 

ফুফাতো ভাই প্রান্ত সরকার বলেন, বকের প্রিয় খাবার মাছ জানতে পেরে বাধন নিজেই মাছ ধরতে খালে যায়। সেখানে পানিতে পড়ে গেলে রোহান তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করেও পারেনি।

 

বাধনের বাবা রিপন আহমেদ বাবুর স্বপ্ন ছিল ছেলে বড় হয়ে ডাক্তার হবে, মানুষের সেবা করবে। কিন্তু মাত্র ১১ বছর বয়সেই থেমে গেল সেই স্বপ্নযাত্রা।

 

বাধনের সঙ্গে মাছ ধরতে যাওয়া বন্ধু রোহানও এখনো স্বাভাবিক হতে পারেনি। চোখের সামনে বন্ধুকে পানিতে ডুবে যেতে দেখার দৃশ্য তাকে কাঁদিয়ে তুলছে বারবার। সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে আর বন্ধুকে খেলতে ডাকছে।

 

বাড়ির উঠানে রাখা সেই বক পাখিটি হয়তো জানে না—তার জন্য খাবার জোগাড় করতে যে শিশুটি ছুটে গিয়েছিল খালের পাড়ে, সে আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। বাধনের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ বড়বড়িয়া গ্রাম ও বড়বড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

Tag :
এই অথরের আরো সংবাদ দেখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়ানোর প্রয়োজন হবে না—এমন শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে -সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী

error: Content is protected !!

বকের জন্য মায়া, সেই মায়াতেই প্রাণ গেল বাধনের

আপডেট টাইম : ৫ ঘন্টা আগে
রাশিদুল ইসলাম রাশেদ, লালপুর (নাটোর) প্রতিনিধি :

রাশিদুল ইসলাম রাশেদ:

 

একটি ছোট্ট বক পাখিকে ঘিরে ১১ বছরের শিশু বাধন আলীর কত স্বপ্ন, কত মায়া! নাটোর রাজবাড়িতে অসহায় অবস্থায় পড়ে থাকা পাখিটিকে দেখে তার মায়া হয়। বাড়িতে এনে পাখিটিকে কী খাওয়াবে, কীভাবে বাঁচিয়ে রাখবে—সেই চিন্তায় বিভোর ছিল সে। ফুফাতো ভাইয়ের কাছে জানতে পারে, বকের প্রিয় খাবার মাছ। সেই মাছ ধরতে গিয়ে শনিবার (৮ আগস্ট) প্রাণ হারায় শিশুটি।

 

বাধন আলী নাটোরের লালপুর উপজেলার বড়বড়িয়া গ্রামের খামারি রিপন আহমেদ বাবু ও রিনি বেগম দম্পতির একমাত্র ছেলে। সে বড়বড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

 

পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার ফুফুর বাড়ি নাটোরের দত্তপাড়া গ্রামে বেড়াতে যায় বাধন। পরদিন শুক্রবার ফুফাতো ভাইদের সঙ্গে নাটোর রাজবাড়িতে ঘুরতে গিয়ে একটি ছোট্ট বক পাখিকে অসহায় অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে। পাখিটির প্রতি মায়া জন্মালে সেটিকে বাড়িতে নিয়ে আসে সে।

 

বকটি কী খাবে জানতে চাইলে ফুফাতো ভাই প্রান্ত সরকার তাকে জানান, বকের প্রিয় খাবার মাছ। এরপর বাধন পণ্য পরিবহনের নেটের জালি পাটকাঠির সঙ্গে বেঁধে মাছ ধরার জাল তৈরি করে। শনিবার সেই জাল নিয়ে প্রতিবেশী বন্ধু রোহানকে সঙ্গে করে বাড়ি থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরের চন্দনা খালে মাছ ধরতে যায় সে।

 

মাছ ধরার একপর্যায়ে হঠাৎ পা পিছলে খালের পানিতে পড়ে যায় বাধন। তাকে উদ্ধারের জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করে বন্ধু রোহান। কিন্তু ছোট্ট হাতে বন্ধুকে টেনে তুলতে না পেরে সে বাড়িতে ছুটে গিয়ে স্বজনদের খবর দেয়।

 

পরে স্থানীয়রা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে খালের তলদেশ থেকে বাধনকে উদ্ধার করেন। তাকে লালপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

 

বাধনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে পরিবার ও এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। ছেলেকে হারিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন মা রিনি বেগম। বাড়ির উঠানে ক্যারেটে রাখা বক পাখিটির দিকে তাকিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন বাবা রিপন আহমেদ বাবু। বাধনের একমাত্র বোন বাবলি খাতুনও নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছে সেই পাখিটির দিকে।

 

ফুফাতো ভাই প্রান্ত সরকার বলেন, বকের প্রিয় খাবার মাছ জানতে পেরে বাধন নিজেই মাছ ধরতে খালে যায়। সেখানে পানিতে পড়ে গেলে রোহান তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করেও পারেনি।

 

বাধনের বাবা রিপন আহমেদ বাবুর স্বপ্ন ছিল ছেলে বড় হয়ে ডাক্তার হবে, মানুষের সেবা করবে। কিন্তু মাত্র ১১ বছর বয়সেই থেমে গেল সেই স্বপ্নযাত্রা।

 

বাধনের সঙ্গে মাছ ধরতে যাওয়া বন্ধু রোহানও এখনো স্বাভাবিক হতে পারেনি। চোখের সামনে বন্ধুকে পানিতে ডুবে যেতে দেখার দৃশ্য তাকে কাঁদিয়ে তুলছে বারবার। সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে আর বন্ধুকে খেলতে ডাকছে।

 

বাড়ির উঠানে রাখা সেই বক পাখিটি হয়তো জানে না—তার জন্য খাবার জোগাড় করতে যে শিশুটি ছুটে গিয়েছিল খালের পাড়ে, সে আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। বাধনের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ বড়বড়িয়া গ্রাম ও বড়বড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।