-শামীম আহমেদ
অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট আকিদুল ইসলাম। তিনি প্রায় তিন দশক ধরে প্রবাসে স্থায়ীভাবে বাস করলেও তার হৃদয়ে সবসময় থাকে দেশের মাটির প্রতি গভীর টান, ভালোবাসা। তার লেখায় আমরা যেমন খুঁজে পাই দেড় কোটি প্রবাসী বাংলাদেশির জীবন সংগ্রামের গল্প তেমনি তিনি দূরদেশ থেকে নৈর্ব্যক্তিক চোখে বিশ্লেষণ করেন ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই জনপদের মানুষের যাপিত জীবন। তিনি দ্য ডেইলি স্টার, প্রথম আলো, ভোরের কাগজ, আমাদের সময়সহ দেশের প্রায় সবগুলো শীর্ষস্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় নিয়মিত কলাম, নিবন্ধ, রাজনৈতিক ভাষ্য লিখছেন।
সমাজ, সংস্কৃতি, প্রবাসজীবন, মানবিক মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা-সবই তাঁর কলামের বিষয়। তাঁর লেখায় পাওয়া যায় প্রবাস জীবনের নিঃসঙ্গতা, মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা, আর সময়ের অন্তর্দহন। ভাষা সরল অথচ ভাব গভীর- যা পাঠকের মনে অনায়াসে ছুঁয়ে যায়। প্রবাসে থেকেও তিনি যেভাবে বাংলাদেশের ভাবনা ও অভিজ্ঞতাকে কলমে তুলে ধরছেন, তা প্রমাণ করে- দূরত্ব মানুষকে আলাদা করে না, যদি তার হৃদয়ে স্বদেশ জেগে থাকে।
আকিদুল ইসলাম ১৯৬৩ সালের ১৩ অক্টোবর রাজবাড়ীর পাংশায় জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই সাহিত্য ও সাংবাদিকতার প্রতি তাঁর প্রবল অনুরাগ ছিল। ঢাকা বিশবিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই তিনি দেশের বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় পত্রিকায় সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ করেছেন। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ‘তারকালোক’ ও ‘নিপূন।’

অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রকাশিত সর্বপ্রথম বাংলা অনলাইন পত্রিকা ‘বাসভূমি’র সম্পাদক তিনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক (২০০৪) আসার আগে ২০০০ সালে প্রকাশিত বাসভুমি প্রবাসী দেড় কোটি বাংলাদেশির মুখপত্র হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
প্রবাসী সাংবাদিক সমাজে তাঁর অবস্থান দৃঢ় ও সম্মানজনক। অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশ প্রেস অ্যান্ড মিডিয়া কাউন্সিলের নানা উদ্যোগেও তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। তিনি ওই সংগঠনের অন্যতম নেতা। আকিদুল ইসলাম নিজ উদ্যোগে অস্ট্রেলিয়াতে ‘বাসভূমি’ নামে ২০০৪ সালে গড়ে তুলেছেন একটি সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন। দেশের মেধাবী ছাত্র ছাত্রীদের বৃত্তি প্রধান, অসহায় মুক্তিযোদ্ধাদের অনুদান, নতুন লেখকদের বই প্রকাশ এবং নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপদগ্রস্ত মানুষদের সাহায্য করা বাসভূমির উল্লেখযোগ্য কাজ। অস্ট্রেলিয়ার প্রধান আইকন ও পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের একটি ‘সিডনি অপেরা হাউজ’ বাংলাদেশিদের প্রথম অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন আকিদুল ইসলাম। প্রবাসীদের ইতিহাসে এটি একটি আলোকিত ও প্রশংসিত ঘটনা।
তাঁর জীবনের আরেকটি পরিচয়- তিনি একজন গল্পকার ও প্রবন্ধকার। একুশে বইমেলায় নিয়মিত প্রকাশিত হয় তাঁর বই। এখন পর্যন্ত তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১৭টি। যেগুলোর ভাষা ও চিন্তা পাঠকের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো হলো- প্রিয় অস্ট্রেলিয়া, যেখানেই পা রাখি বধ্যভূমি, দোযখে নর্তকী রাত, আমি এখন কোথাও নেই, গল্পগুলো ব্যক্তিগত নয়, আমার একজন প্রেমিকা ছিল, তাহার নাম শকুন্তলা, বঙ্গভবনে কয়েক সন্ধ্যা, তিন রমনীর চারিত্রিক সনদ, করতলে পোড়া মাটির ঘ্রাণ।
এই বইগুলোতে তিনি কখনও গল্পকার, কখনও চিন্তাশীল পর্যবেক্ষক, আবার কখনও মানবজীবনের গভীর বিশ্লেষক হিসেবে হাজির হন।
প্রবাসে থেকেও স্বদেশচেতনা দেশ থেকে দূরে থাকলেও আকিদুল ইসলামের মন পড়ে থাকে বাংলার মাটিতে। তাঁর লেখায় প্রবাসের নিঃসঙ্গতা ও স্বদেশচেতনা একাকার হয়ে যায়। তিনি যেন প্রমাণ করেছেন-দেশ মানে শুধু ভৌগোলিক সীমানা নয়; দেশ মানে স্মৃতি, ভালোবাসা ও হৃদয়ের টান।
একজন নাট্যকার হিসেবেও তিনি বাংলাদেশে সমান জনপ্রিয়। এনটিভি, বাংলাভিশন, আরটিভি, একুশে টিভি, মাছরাঙাসহ দেশের প্রায় সবগুলো চ্যানেলেই প্রচারিত হয়েছে তার খন্ড নাটক, টেলিফিল্ম, দীর্ঘ ধারাবাহিক ও ট্রাভেল শো। আকিদুল ইসলামের উল্লেখযোগ্য নাটক হচ্ছে-দূরের বাড়ি কাছের মানুষ, মনভালো নেই, কেউ একা, মন দরোজা, গল্পটি আংশিক সত্য, রূপকথার বেহালা, একটি খুনের গল্প, তোমার জন্য একটি দুপুর।
আকিদুল ইসলাম কেবল একজন প্রবাসী সাংবাদিক নন; তিনি একাধারে সাহিত্যিক, নাট্যকার, সংগঠক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মানবিক চিন্তার ধারক। তিনি দূরে থাকলেও দূরত্বে নেই। তিনি যেন এক দূরবর্তী ধ্রুবতারা। যে তারাটি দূরে থেকেও উদ্দীপিত আলোয় উদ্ভাসিত করছে চারপাশ।
-শামীম আহমেদ
কবি, লেখক ও সাহিত্যিক।

সাতক্ষীরার শ্যামনগরে দুই সংখ্যালঘু পরিবারকে দেশছাড়ার হুমকি 
শামীম আহমেদ, কবি, লেখক ও সাহিত্যিক 





















