ঢাকা , মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬, ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রতিনিধি নিয়োগ
দৈনিক সময়ের প্রত্যাশা পত্রিকার জন্য সারা দেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আপনি আপনার এলাকায় সাংবাদিকতা পেশায় আগ্রহী হলে যোগাযোগ করুন। Hotline- +880 9617 179084

পল্লীর শিশুদের জন্য আশীর্বাদ ডা. আব্দুর রহিমের শিফা মেডিকেল সেন্টার

রাশিদুল ইসলাম রাশেদ:

 

নাটোরের লালপুর ও রাজশাহীর বাঘা উপজেলার সীমান্তঘেঁষা চন্ডিপুর বাজার। ছোট্ট একটি জনপদ। কিন্তু দুপুর গড়াতেই চন্ডিপুর বাজারে প্রতিদিন ভিড় করেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা অসংখ্য অভিভাবক। কারও কোলে জ্বরে কাঁপতে থাকা শিশু, কেউ আবার শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া, হাম কিংবা অপুষ্টিতে ভোগা সন্তানকে নিয়ে অপেক্ষা করছেন একজন চিকিৎসকের জন্য। সেই চিকিৎসক হলেন শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. আব্দুর রহিম।

 

প্রত্যন্ত গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে তিনি শুধু একজন চিকিৎসক নন, বরং নির্ভরতা ও ভালোবাসার আরেক নাম। দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে গ্রামীণ শিশুদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন লালপুর, বাগাতিপাড়া, বাঘা, পুঠিয়া ও ঈশ্বরদীসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের ভরসাস্থল।

 

তার গড়া শিফা মেডিকেল সেন্টার এখন যেন গ্রামের অসহায় শিশুদের ছোট্ট আশ্রয়স্থল। শহরের ব্যয়বহুল চিকিৎসাসেবার বিকল্প হিসেবে সুলভ খরচে মানসম্মত চিকিৎসা দিতে গড়ে তুলেছেন এই সেবাকেন্দ্র। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০ জন শিশু এখানে চিকিৎসাসেবা নেয়। দূর-দূরান্ত থেকে অভিভাবকেরা ছুটে আসেন তাদের সন্তানদের নিয়ে।

 

সরেজমিনে গিয়ে কথা হয় কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে। বাগাতিপাড়া উপজেলার জামনগর থেকে আসা এক অভিভাবক বলেন, “শহরে গিয়ে অনেক টাকা খরচ করেও সবসময় ভালো সেবা পাওয়া যায় না। কিন্তু ডা. রহিম খুব আন্তরিকভাবে কম খরচে চিকিৎসা দেন। তিনি আমাদের জন্য যেন আশীর্বাদস্বরূপ।”

 

লালপুর উপজেলার রহিমপুর গ্রামের টুলু খাতুন বলেন, “গ্রামের মধ্যে এত ভালো শিশু ডাক্তার পাওয়া সত্যিই সৌভাগ্যের বিষয়। ধনী-গরিব মানুষ সবাই এখানে নিশ্চিন্তে চিকিৎসা করাতে পারে।”

 

বাঘা উপজেলার বানিয়াপাড়া গ্রামের জহুরুল ইসলাম জানান, প্রায় ২০ বছর ধরে তাদের গ্রামের শিশুদের চিকিৎসা দিয়ে আসছেন ডা. আব্দুর রহিম। তিনি বলেন, “তার চিকিৎসা ও ব্যবহার—দুটিই অসাধারণ। এখন আমাদের আত্মীয়-স্বজনরাও দূর থেকে এখানে আসে।”

 

শিফা মেডিকেল সেন্টারের অফিস সহকারী মো. রুহুল আমিন জানান, শনিবার ও মঙ্গলবার ছাড়া সপ্তাহে পাঁচ দিন রোগী দেখেন ডা. আব্দুর রহিম। বাকি দুই দিন তিনি রাজশাহীতে চিকিৎসাসেবা প্রদান করেন।

 

ডা. আব্দুর রহিমের জীবনগল্পও অনেকটা ব্যতিক্রমী। পড়াশোনা শেষ করে ২০০৪ সালে কুমিল্লায় একটি জাপানি সংস্থার অধীনে পরিচালিত শিশু হাসপাতালে চাকরি শুরু করেন। পরে তিনি ঢাকা শিশু হাসপাতাল-এ বিশেষ প্রশিক্ষণ নেন। তার সামনে ছিল বড় শহরে প্রতিষ্ঠিত ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ। কিন্তু বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সেবা এবং গ্রামের মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদ তাকে ফিরিয়ে আনে নিজের গ্রামে।

 

তিনি বলেন, “শহরে থেকে ভালো ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব ছিল। পরিবারের সবাই চাচ্ছিলেন আমি ঢাকা শহরেই থাকি। কিন্তু গ্রামের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই ফিরে আসি। আমি চেয়েছি, গ্রামের শিশুরাও যেন উন্নত চিকিৎসাসেবা পায়।”

 

গ্রামে ফিরে এসে বড় ভাই মেজর জেনারেল আ. রাজ্জাক-এর সহযোগিতায় তিন কক্ষবিশিষ্ট শিফা মেডিকেল সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। প্রথমে অসম্মতি থাকলেও পরবর্তীতে পরিবারের সবাই তাকে সমর্থন করেন। সময়ের পরিক্রমায় এই প্রতিষ্ঠানটি এখন বিস্তীর্ণ অঞ্চলের শিশু চিকিৎসার অন্যতম নির্ভরতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

 

বর্তমানে ডা. আব্দুর রহিম বারিন্দ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এর শিশু বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। তবে হাসপাতালের দায়িত্ব শেষ করেই তিনি ছুটে আসেন গ্রামের শিশুদের কাছে।

 

চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি নানা মানবিক কর্মকাণ্ডেও নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন তিনি। অসহায় শিশুদের জন্য গঠন করেছেন দরিদ্র তহবিল। জরুরি রোগীদের জন্য রয়েছে বিশেষ কক্ষ, যেখানে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়।

 

শুধু স্বাস্থ্যসেবাই নয়, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়েও সমাজসেবার নজির স্থাপন করেছেন এই চিকিৎসক। মা মাছুরা খাতুনের স্বপ্ন পূরণে অন্যান্য ভাইবোনদের সহযোগিতায় নিজস্ব পৈত্রিক জমিতে মাদ্রাসা ও মসজিদ কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা করেছেন। সেখানে এতিম ও অসহায় শিশুদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা, আবাসন ও চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে সেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা পৌঁছেছে প্রায় ৩০০ জনে।

 

ডা. আব্দুর রহিম জানান, বড় পরিসরে বাণিজ্যিক হাসপাতাল গড়ার একাধিক প্রস্তাব পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সাধারণ মানুষের সুলভ চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় সেসব প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন।

 

গ্রামের মানুষের প্রতি নিজের অনুভূতির কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “এ এলাকার মানুষের সঙ্গে আমার আত্মার সম্পর্ক। তাদের ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। যতদিন সুস্থ থাকব, গ্রামের শিশুদের সেবা দিয়ে যেতে চাই।”

Tag :
এই অথরের আরো সংবাদ দেখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

পল্লীর শিশুদের জন্য আশীর্বাদ ডা. আব্দুর রহিমের শিফা মেডিকেল সেন্টার

error: Content is protected !!

পল্লীর শিশুদের জন্য আশীর্বাদ ডা. আব্দুর রহিমের শিফা মেডিকেল সেন্টার

আপডেট টাইম : ৩ ঘন্টা আগে
রাশিদুল ইসলাম রাশেদ, লালপুর (নাটোর) প্রতিনিধি :

রাশিদুল ইসলাম রাশেদ:

 

নাটোরের লালপুর ও রাজশাহীর বাঘা উপজেলার সীমান্তঘেঁষা চন্ডিপুর বাজার। ছোট্ট একটি জনপদ। কিন্তু দুপুর গড়াতেই চন্ডিপুর বাজারে প্রতিদিন ভিড় করেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা অসংখ্য অভিভাবক। কারও কোলে জ্বরে কাঁপতে থাকা শিশু, কেউ আবার শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়া, হাম কিংবা অপুষ্টিতে ভোগা সন্তানকে নিয়ে অপেক্ষা করছেন একজন চিকিৎসকের জন্য। সেই চিকিৎসক হলেন শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. আব্দুর রহিম।

 

প্রত্যন্ত গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে তিনি শুধু একজন চিকিৎসক নন, বরং নির্ভরতা ও ভালোবাসার আরেক নাম। দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে গ্রামীণ শিশুদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন লালপুর, বাগাতিপাড়া, বাঘা, পুঠিয়া ও ঈশ্বরদীসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের ভরসাস্থল।

 

তার গড়া শিফা মেডিকেল সেন্টার এখন যেন গ্রামের অসহায় শিশুদের ছোট্ট আশ্রয়স্থল। শহরের ব্যয়বহুল চিকিৎসাসেবার বিকল্প হিসেবে সুলভ খরচে মানসম্মত চিকিৎসা দিতে গড়ে তুলেছেন এই সেবাকেন্দ্র। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০ জন শিশু এখানে চিকিৎসাসেবা নেয়। দূর-দূরান্ত থেকে অভিভাবকেরা ছুটে আসেন তাদের সন্তানদের নিয়ে।

 

সরেজমিনে গিয়ে কথা হয় কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে। বাগাতিপাড়া উপজেলার জামনগর থেকে আসা এক অভিভাবক বলেন, “শহরে গিয়ে অনেক টাকা খরচ করেও সবসময় ভালো সেবা পাওয়া যায় না। কিন্তু ডা. রহিম খুব আন্তরিকভাবে কম খরচে চিকিৎসা দেন। তিনি আমাদের জন্য যেন আশীর্বাদস্বরূপ।”

 

লালপুর উপজেলার রহিমপুর গ্রামের টুলু খাতুন বলেন, “গ্রামের মধ্যে এত ভালো শিশু ডাক্তার পাওয়া সত্যিই সৌভাগ্যের বিষয়। ধনী-গরিব মানুষ সবাই এখানে নিশ্চিন্তে চিকিৎসা করাতে পারে।”

 

বাঘা উপজেলার বানিয়াপাড়া গ্রামের জহুরুল ইসলাম জানান, প্রায় ২০ বছর ধরে তাদের গ্রামের শিশুদের চিকিৎসা দিয়ে আসছেন ডা. আব্দুর রহিম। তিনি বলেন, “তার চিকিৎসা ও ব্যবহার—দুটিই অসাধারণ। এখন আমাদের আত্মীয়-স্বজনরাও দূর থেকে এখানে আসে।”

 

শিফা মেডিকেল সেন্টারের অফিস সহকারী মো. রুহুল আমিন জানান, শনিবার ও মঙ্গলবার ছাড়া সপ্তাহে পাঁচ দিন রোগী দেখেন ডা. আব্দুর রহিম। বাকি দুই দিন তিনি রাজশাহীতে চিকিৎসাসেবা প্রদান করেন।

 

ডা. আব্দুর রহিমের জীবনগল্পও অনেকটা ব্যতিক্রমী। পড়াশোনা শেষ করে ২০০৪ সালে কুমিল্লায় একটি জাপানি সংস্থার অধীনে পরিচালিত শিশু হাসপাতালে চাকরি শুরু করেন। পরে তিনি ঢাকা শিশু হাসপাতাল-এ বিশেষ প্রশিক্ষণ নেন। তার সামনে ছিল বড় শহরে প্রতিষ্ঠিত ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ। কিন্তু বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সেবা এবং গ্রামের মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদ তাকে ফিরিয়ে আনে নিজের গ্রামে।

 

তিনি বলেন, “শহরে থেকে ভালো ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব ছিল। পরিবারের সবাই চাচ্ছিলেন আমি ঢাকা শহরেই থাকি। কিন্তু গ্রামের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই ফিরে আসি। আমি চেয়েছি, গ্রামের শিশুরাও যেন উন্নত চিকিৎসাসেবা পায়।”

 

গ্রামে ফিরে এসে বড় ভাই মেজর জেনারেল আ. রাজ্জাক-এর সহযোগিতায় তিন কক্ষবিশিষ্ট শিফা মেডিকেল সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। প্রথমে অসম্মতি থাকলেও পরবর্তীতে পরিবারের সবাই তাকে সমর্থন করেন। সময়ের পরিক্রমায় এই প্রতিষ্ঠানটি এখন বিস্তীর্ণ অঞ্চলের শিশু চিকিৎসার অন্যতম নির্ভরতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

 

বর্তমানে ডা. আব্দুর রহিম বারিন্দ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এর শিশু বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। তবে হাসপাতালের দায়িত্ব শেষ করেই তিনি ছুটে আসেন গ্রামের শিশুদের কাছে।

 

চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি নানা মানবিক কর্মকাণ্ডেও নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন তিনি। অসহায় শিশুদের জন্য গঠন করেছেন দরিদ্র তহবিল। জরুরি রোগীদের জন্য রয়েছে বিশেষ কক্ষ, যেখানে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়।

 

শুধু স্বাস্থ্যসেবাই নয়, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়েও সমাজসেবার নজির স্থাপন করেছেন এই চিকিৎসক। মা মাছুরা খাতুনের স্বপ্ন পূরণে অন্যান্য ভাইবোনদের সহযোগিতায় নিজস্ব পৈত্রিক জমিতে মাদ্রাসা ও মসজিদ কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা করেছেন। সেখানে এতিম ও অসহায় শিশুদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা, আবাসন ও চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে সেখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা পৌঁছেছে প্রায় ৩০০ জনে।

 

ডা. আব্দুর রহিম জানান, বড় পরিসরে বাণিজ্যিক হাসপাতাল গড়ার একাধিক প্রস্তাব পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সাধারণ মানুষের সুলভ চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় সেসব প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন।

 

গ্রামের মানুষের প্রতি নিজের অনুভূতির কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “এ এলাকার মানুষের সঙ্গে আমার আত্মার সম্পর্ক। তাদের ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। যতদিন সুস্থ থাকব, গ্রামের শিশুদের সেবা দিয়ে যেতে চাই।”