ঢাকা , সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo কুষ্টিয়া সীমান্তে বিএসএফের পুশইন চেষ্টা, বিজিবির বাধায় ফিরে গেল ৪ জন Logo ঠাকুরগাঁওয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ও জেলা শিক্ষা অফিসের যৌথ পরিচ্ছন্নতা অভিযান Logo ১৫ বছর পর ভাঙ্গার কুমার নদে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচঃ লাখো মানুষের ঢল। Logo আলফাডাঙ্গা প্রেসক্লাবে লাইব্রেরি উদ্বোধন Logo রায়ের পর বদলে গেল গোগ্রামের পাঁচ বছরের নির্বাচনী হিসাব Logo শতবর্ষী সরকারি খাল দখলমুক্তে অভিযান, মালামাল স্পট নিলামে Logo মধুখালী থানার এএসআই শরীফুলের সাফল্য, ৬২ হারানো মোবাইল উদ্ধার Logo বিদ্যুৎ সংকটে গঙ্গাচড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সোলার-আইপিএস দিলেন জিওন Logo নরসিংদীর চরাঞ্চলে যৌথ অভিযান, অস্ত্র-গুলাবারুদ ও ১৩৬ ককটেলসহ গ্রেপ্তার ৩ Logo সারাদেশে জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস-২০২৬ পালিত
প্রতিনিধি নিয়োগ
সারা দেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আপনি আপনার এলাকায় সাংবাদিকতা পেশায় আগ্রহী হলে যোগাযোগ করুন। Hotline- +880 1728311111

সরকারি নগরকান্দা কলেজে প্রশাসন-শিক্ষকদের অব্যবস্থাপনায় ধ্বংসের মুখে শিক্ষাব্যবস্থা

নুরুল ইসলামঃ

ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী সরকারি নগরকান্দা কলেজে শিক্ষাব্যবস্থার চিত্র এখন উদ্বেগজনক। প্রশাসন ও শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের অবহেলা ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীশূন্য হয়ে পড়ছে- এমন অভিযোগ উঠেছে স্থানীয়দের কাছ থেকে।

 

১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত এ কলেজটি ২০১৩ সালে জাতীয়করণের মাধ্যমে সরকারি মর্যাদা লাভ করে। জাতীয়করণের পর শিক্ষকদের জীবনমানের দৃশ্যমান পরিবর্তন এলেও শিক্ষার মানে সেই অনুপাতে কোনো উন্নয়ন ঘটেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। বরং জাতীয়করণের পরপরই শুরু হয় বিভিন্ন নামকরা কলেজে বদলির প্রতিযোগিতা, যার ফলে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক সংকটে ভুগতে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। গুরুত্বপূর্ণ বহু পদ শূন্য থাকায় নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম ভেঙে পড়ে, আর সেই সুযোগে জবাবদিহিতাহীনতার সংস্কৃতি শেকড় গেড়ে বসে।

 

পরবর্তীতে ধীরে ধীরে শিক্ষক সংকট কাটলেও শিক্ষা কার্যক্রমে গতি ফেরেনি। সাম্প্রতিক সময়ে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বেশ কিছু শিক্ষক এই কলেজে যোগদান করলেও বাস্তবতা হলো—শিক্ষক থাকলেও শিক্ষার্থী নেই। দীর্ঘদিনের অনিয়মিত ক্লাস ও শিক্ষার পরিবেশ ভেঙে পড়ার কারণে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।

 

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নিয়মিত ও মানসম্মত ক্লাস না হওয়ায় তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। অনেকেই বিকল্প প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকছে। অন্যদিকে উপস্থিতি কম থাকায় অনেক ক্ষেত্রে ক্লাসই নেওয়া হচ্ছে না—এমন অভিযোগও রয়েছে। এতে করে শিক্ষকদের মধ্যে দায়িত্ববোধের ঘাটতি আরও প্রকট হয়ে উঠছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ধারাবাহিকভাবে কমে গেলেও কলেজ প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে দ্রুত উদ্যোগ না নিলে প্রতিষ্ঠানটির ঐতিহ্য ও অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়তে পারে।

 

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়—শিক্ষার মান উন্নয়ন, নিয়মিত ক্লাস নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। অন্যথায় “সরকারি” তকমা থাকলেও শিক্ষার আলো নিভে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

 

কলেজ প্রশাসন ও শিক্ষকদের দায়িত্বে অবহেলার প্রভাব গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। গত বছর সকল বিভাগ মিলিয়ে মোট ৪২০ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে মাত্র ১৫৪ জন উত্তীর্ণ হয়, আর ২৬৬ জন অনুত্তীর্ণ হয়। ফলে সামগ্রিক পাশের হার নেমে আসে মাত্র ৩৭.৬ শতাংশে, যা প্রতিষ্ঠানটির জন্য এক গভীর উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে।

 

এবিষয়ে নগরকান্দা কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি আলী আকবার শরীফ আরমান বলেন, নগরকান্দার একমাত্র সরকারি কলেজ আজ অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও উদাসীনতার চাপে ধুঁকছে। নেই উন্নয়ন, নেই কার্যকর পরিকল্পনা—ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। শিক্ষক থাকলেও ক্লাস নেই, প্রশাসনেরও নেই কোনো জবাবদিহিতা। রয়েছে শিক্ষা সফরের নামে টাকা আদায় করে তা আত্মসাতের অভিযোগ, জাতীয় দিবস ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে চরম অবহেলা—সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে। এখনই উদ্যোগ না নিলে ঐতিহ্যবাহী এই কলেজ হারিয়ে যেতে পারে।

 

এদিকে সরকারি নগরকান্দা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর জাহিদুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত না থাকলে শিক্ষকদের পক্ষে পাঠদান কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বৃদ্ধি করতে ইতোমধ্যে নোটিশ জারি করা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ন্যূনতম ৭০% উপস্থিতি না থাকলে একাদশ শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণিতে উত্তীর্ণ করা হবে না এবং নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগও দেওয়া হবে না। তবে এ পদক্ষেপের পরও কাঙ্ক্ষিত হারে উপস্থিতি বাড়েনি।

তিনি আরও জানান, খুব শিগগিরই অভিভাবক সমাবেশের আয়োজন করে এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। পাশাপাশি শিক্ষকদের শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Tag :
এই অথরের আরো সংবাদ দেখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

আদালতের নির্দেশের পরও বিরোধপূর্ণ বাড়িতে বসবাস

error: Content is protected !!

সরকারি নগরকান্দা কলেজে প্রশাসন-শিক্ষকদের অব্যবস্থাপনায় ধ্বংসের মুখে শিক্ষাব্যবস্থা

আপডেট টাইম : ০৬:৩১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
নুরুল ইসলাম, স্টাফ রিপোর্টার :

নুরুল ইসলামঃ

ফরিদপুরের ঐতিহ্যবাহী সরকারি নগরকান্দা কলেজে শিক্ষাব্যবস্থার চিত্র এখন উদ্বেগজনক। প্রশাসন ও শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের অবহেলা ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীশূন্য হয়ে পড়ছে- এমন অভিযোগ উঠেছে স্থানীয়দের কাছ থেকে।

 

১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত এ কলেজটি ২০১৩ সালে জাতীয়করণের মাধ্যমে সরকারি মর্যাদা লাভ করে। জাতীয়করণের পর শিক্ষকদের জীবনমানের দৃশ্যমান পরিবর্তন এলেও শিক্ষার মানে সেই অনুপাতে কোনো উন্নয়ন ঘটেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। বরং জাতীয়করণের পরপরই শুরু হয় বিভিন্ন নামকরা কলেজে বদলির প্রতিযোগিতা, যার ফলে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক সংকটে ভুগতে থাকে প্রতিষ্ঠানটি। গুরুত্বপূর্ণ বহু পদ শূন্য থাকায় নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম ভেঙে পড়ে, আর সেই সুযোগে জবাবদিহিতাহীনতার সংস্কৃতি শেকড় গেড়ে বসে।

 

পরবর্তীতে ধীরে ধীরে শিক্ষক সংকট কাটলেও শিক্ষা কার্যক্রমে গতি ফেরেনি। সাম্প্রতিক সময়ে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বেশ কিছু শিক্ষক এই কলেজে যোগদান করলেও বাস্তবতা হলো—শিক্ষক থাকলেও শিক্ষার্থী নেই। দীর্ঘদিনের অনিয়মিত ক্লাস ও শিক্ষার পরিবেশ ভেঙে পড়ার কারণে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।

 

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নিয়মিত ও মানসম্মত ক্লাস না হওয়ায় তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। অনেকেই বিকল্প প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকছে। অন্যদিকে উপস্থিতি কম থাকায় অনেক ক্ষেত্রে ক্লাসই নেওয়া হচ্ছে না—এমন অভিযোগও রয়েছে। এতে করে শিক্ষকদের মধ্যে দায়িত্ববোধের ঘাটতি আরও প্রকট হয়ে উঠছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ধারাবাহিকভাবে কমে গেলেও কলেজ প্রশাসনের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে দ্রুত উদ্যোগ না নিলে প্রতিষ্ঠানটির ঐতিহ্য ও অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়তে পারে।

 

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়—শিক্ষার মান উন্নয়ন, নিয়মিত ক্লাস নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। অন্যথায় “সরকারি” তকমা থাকলেও শিক্ষার আলো নিভে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

 

কলেজ প্রশাসন ও শিক্ষকদের দায়িত্বে অবহেলার প্রভাব গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। গত বছর সকল বিভাগ মিলিয়ে মোট ৪২০ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে মাত্র ১৫৪ জন উত্তীর্ণ হয়, আর ২৬৬ জন অনুত্তীর্ণ হয়। ফলে সামগ্রিক পাশের হার নেমে আসে মাত্র ৩৭.৬ শতাংশে, যা প্রতিষ্ঠানটির জন্য এক গভীর উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে।

 

এবিষয়ে নগরকান্দা কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি আলী আকবার শরীফ আরমান বলেন, নগরকান্দার একমাত্র সরকারি কলেজ আজ অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও উদাসীনতার চাপে ধুঁকছে। নেই উন্নয়ন, নেই কার্যকর পরিকল্পনা—ফলে মেধাবী শিক্ষার্থীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। শিক্ষক থাকলেও ক্লাস নেই, প্রশাসনেরও নেই কোনো জবাবদিহিতা। রয়েছে শিক্ষা সফরের নামে টাকা আদায় করে তা আত্মসাতের অভিযোগ, জাতীয় দিবস ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে চরম অবহেলা—সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে। এখনই উদ্যোগ না নিলে ঐতিহ্যবাহী এই কলেজ হারিয়ে যেতে পারে।

 

এদিকে সরকারি নগরকান্দা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর জাহিদুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত না থাকলে শিক্ষকদের পক্ষে পাঠদান কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বৃদ্ধি করতে ইতোমধ্যে নোটিশ জারি করা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ন্যূনতম ৭০% উপস্থিতি না থাকলে একাদশ শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণিতে উত্তীর্ণ করা হবে না এবং নির্বাচনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগও দেওয়া হবে না। তবে এ পদক্ষেপের পরও কাঙ্ক্ষিত হারে উপস্থিতি বাড়েনি।

তিনি আরও জানান, খুব শিগগিরই অভিভাবক সমাবেশের আয়োজন করে এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। পাশাপাশি শিক্ষকদের শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।