ঢাকা , বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রতিনিধি নিয়োগ
দৈনিক সময়ের প্রত্যাশা পত্রিকার জন্য সারা দেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আপনি আপনার এলাকায় সাংবাদিকতা পেশায় আগ্রহী হলে যোগাযোগ করুন। Hotline- +880 9617 179084

বর্ষার ভরা মৌসুমেও পানি সংকট, বিপাকে বাগাতিপাড়ার কৃষকরা

আনিসুর রহমান:

 

দেশের বিভিন্ন অঞ্চল যখন ভরা বর্ষার বন্যায় প্লাবিত, কোথাও ফসলের মাঠ পানির নিচে, কোথাও মানুষ পানিবন্দি—ঠিক তার উল্টো চিত্র নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলায়। আষাঢ়-শ্রাবণের ভরা মৌসুমেও পর্যাপ্ত বৃষ্টির দেখা নেই। পানির অভাবে অনেক কৃষিজমি ফেটে চৌচির হয়ে পড়েছে।

 

যুগ যুগ ধরে বর্ষার জমে থাকা পানির ওপর নির্ভর করেই এ উপজেলার কৃষকেরা রোপা আমন ধানের চারা রোপণ থেকে শুরু করে ধান পাকা পর্যন্ত বিভিন্ন কৃষিকাজ পরিচালনা করে আসছেন। কিন্তু চলতি বর্ষা মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় সেই চিরচেনা চিত্র বদলে গেছে। মাঠে পানি না থাকায় রোপা আমন মৌসুমের প্রস্তুতি নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকেরা।

 

স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্ষা এ অঞ্চলের কৃষকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জমি তৈরি, চারার বেড তৈরি, চারা রোপণ এবং ধান পাকার আগ পর্যন্ত সেচের প্রয়োজন মেটাতে তাঁরা মূলত বর্ষার পানির ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু চলতি মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় কোনো জমিতেই প্রয়োজনীয় পানি জমেনি। এমনকি নিচু জমিগুলোও রয়েছে পানিশূন্য।

 

কৃষকদের দাবি, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় অনেক খাল-বিল ও জলাশয়ে প্রয়োজনীয় পানি জমেনি। ফলে বর্ষার পানির ওপর নির্ভরশীল আমন চাষিরা শুরুতেই অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। অনেক কৃষক সেচের পানি ব্যবহার করে রোপা আমনের চারা তৈরি করলেও বৃষ্টির অভাবে জমিতে পানি না থাকায় নির্ধারিত সময়ে চারা রোপণ করতে পারছেন না।

 

এতে অনেক চারাই রোপণের উপযুক্ত বয়স অতিক্রম করছে। আবার অনেকে সেচ দিয়ে চারা রোপণ করলেও জমিতে পানি ধরে রাখতে পারছেন না। একদিকে সেচের ওপর নির্ভরতা বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, অন্যদিকে অতিরিক্ত খরচের আশঙ্কায় অনেক কৃষক এখনো বৃষ্টির অপেক্ষায় জমি ফেলে রেখেছেন।

 

কৃষকদের ভাষ্য, দ্রুত বৃষ্টি না হলে সময়মতো চারা রোপণ ব্যাহত হবে। রোপণের পরও পর্যাপ্ত পানি না থাকলে জমিতে আগাছার প্রকোপ বাড়তে পারে, যা ফলনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। চলমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এ মৌসুমে রোপা আমনের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

 

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে বাগাতিপাড়া উপজেলায় ৬ হাজার ৩৭৩ হেক্টর জমিতে রোপা আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৩ হাজার ১৯ মেট্রিক টন। গত বছরও একই পরিমাণ জমিতে রোপা আমনের আবাদ হয়েছিল এবং মোট উৎপাদন হয়েছিল ২৩ হাজার ১৯ মেট্রিক টন।

 

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন কৃষি এলাকায় দেখা যায়, গত বছর কিংবা তার আগের বছরগুলোতে এ সময় যেসব জমিতে হাঁটুপানি জমে থাকত, সেসব জমিতে এখনো শুকনো মাটির ঢেলা পড়ে রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে যে মাঠগুলো সারি সারি সবুজ রোপা আমনের চারায় ভরে থাকার কথা, সেসব জমির অনেক জায়গায় এখনো পাট দাঁড়িয়ে আছে।

 

বৃষ্টির অভাবে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় কৃষকেরা পাট কাটতেও পারছেন না। তাঁদের আশা ছিল, পাট কাটার পরপরই ওই জমিতে রোপা আমনের চারা রোপণ করবেন। কিন্তু বৃষ্টির অভাব ও পানির সংকটে সেই পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।

 

উপজেলার জামনগর ইউনিয়নের কৃষক শহিদুল ইসলাম (৫০) বলেন, “আমাদের এলাকায় রোপা আমন চাষের প্রাণই হলো বর্ষার পানি। এই পানি থাকলে আলাদা করে বেশি সেচ দিতে হয় না। কিন্তু এবার মাঠে পানি নেই। এখন পর্যন্ত ভালো বৃষ্টি না হওয়ায় জমিতে বীজ থেকে চারা তৈরি করতে পারিনি। এখন যদি ভালো বৃষ্টি না হয়, তাহলে সময়মতো চারা লাগানো কঠিন হবে।”

 

পাকা ইউনিয়নের চিথলিয়া গ্রামের কৃষক মিন্টু আলী (৩৭) বলেন, “ভরা বর্ষায় মাঠে পানি নেই। এমন অবস্থা আগে খুব একটা দেখিনি। পানি না পেলে অনেক জমি হয়তো অনাবাদি থেকে যাবে। একদিকে সময় চলে যাচ্ছে, অন্যদিকে এখনো বৃষ্টির দেখা নেই।”

 

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ডা. ভবসিন্ধু রায় বলেন, “এ বছর প্রয়োজনের তুলনায় বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকার নিচু জমিতেও পর্যাপ্ত পানি জমেনি। এতে রোপা আমনের চারা রোপণে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। কৃষকদের জমির অবস্থা বিবেচনা করে সেচের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা নিশ্চিত করে সময়মতো চারা রোপণের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।”

 

তিনি আরও বলেন, “আমরা সার্বক্ষণিক মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি এবং উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কৃষকদের প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হলে পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি হবে বলে আমরা আশা করছি।”

Tag :
এই অথরের আরো সংবাদ দেখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

নরসিংদীর চরাঞ্চলে যৌথ অভিযান, অস্ত্র-গুলাবারুদ ও ১৩৬ ককটেলসহ গ্রেপ্তার ৩

error: Content is protected !!

বর্ষার ভরা মৌসুমেও পানি সংকট, বিপাকে বাগাতিপাড়ার কৃষকরা

আপডেট টাইম : ১৯ ঘন্টা আগে
আনিসুর রহমান, বাগাতিপাড়া (নাটোর) প্রতিনিধি :

আনিসুর রহমান:

 

দেশের বিভিন্ন অঞ্চল যখন ভরা বর্ষার বন্যায় প্লাবিত, কোথাও ফসলের মাঠ পানির নিচে, কোথাও মানুষ পানিবন্দি—ঠিক তার উল্টো চিত্র নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলায়। আষাঢ়-শ্রাবণের ভরা মৌসুমেও পর্যাপ্ত বৃষ্টির দেখা নেই। পানির অভাবে অনেক কৃষিজমি ফেটে চৌচির হয়ে পড়েছে।

 

যুগ যুগ ধরে বর্ষার জমে থাকা পানির ওপর নির্ভর করেই এ উপজেলার কৃষকেরা রোপা আমন ধানের চারা রোপণ থেকে শুরু করে ধান পাকা পর্যন্ত বিভিন্ন কৃষিকাজ পরিচালনা করে আসছেন। কিন্তু চলতি বর্ষা মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় সেই চিরচেনা চিত্র বদলে গেছে। মাঠে পানি না থাকায় রোপা আমন মৌসুমের প্রস্তুতি নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকেরা।

 

স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্ষা এ অঞ্চলের কৃষকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জমি তৈরি, চারার বেড তৈরি, চারা রোপণ এবং ধান পাকার আগ পর্যন্ত সেচের প্রয়োজন মেটাতে তাঁরা মূলত বর্ষার পানির ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু চলতি মৌসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় কোনো জমিতেই প্রয়োজনীয় পানি জমেনি। এমনকি নিচু জমিগুলোও রয়েছে পানিশূন্য।

 

কৃষকদের দাবি, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় অনেক খাল-বিল ও জলাশয়ে প্রয়োজনীয় পানি জমেনি। ফলে বর্ষার পানির ওপর নির্ভরশীল আমন চাষিরা শুরুতেই অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। অনেক কৃষক সেচের পানি ব্যবহার করে রোপা আমনের চারা তৈরি করলেও বৃষ্টির অভাবে জমিতে পানি না থাকায় নির্ধারিত সময়ে চারা রোপণ করতে পারছেন না।

 

এতে অনেক চারাই রোপণের উপযুক্ত বয়স অতিক্রম করছে। আবার অনেকে সেচ দিয়ে চারা রোপণ করলেও জমিতে পানি ধরে রাখতে পারছেন না। একদিকে সেচের ওপর নির্ভরতা বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, অন্যদিকে অতিরিক্ত খরচের আশঙ্কায় অনেক কৃষক এখনো বৃষ্টির অপেক্ষায় জমি ফেলে রেখেছেন।

 

কৃষকদের ভাষ্য, দ্রুত বৃষ্টি না হলে সময়মতো চারা রোপণ ব্যাহত হবে। রোপণের পরও পর্যাপ্ত পানি না থাকলে জমিতে আগাছার প্রকোপ বাড়তে পারে, যা ফলনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। চলমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এ মৌসুমে রোপা আমনের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

 

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে বাগাতিপাড়া উপজেলায় ৬ হাজার ৩৭৩ হেক্টর জমিতে রোপা আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৩ হাজার ১৯ মেট্রিক টন। গত বছরও একই পরিমাণ জমিতে রোপা আমনের আবাদ হয়েছিল এবং মোট উৎপাদন হয়েছিল ২৩ হাজার ১৯ মেট্রিক টন।

 

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন কৃষি এলাকায় দেখা যায়, গত বছর কিংবা তার আগের বছরগুলোতে এ সময় যেসব জমিতে হাঁটুপানি জমে থাকত, সেসব জমিতে এখনো শুকনো মাটির ঢেলা পড়ে রয়েছে। বর্ষা মৌসুমে যে মাঠগুলো সারি সারি সবুজ রোপা আমনের চারায় ভরে থাকার কথা, সেসব জমির অনেক জায়গায় এখনো পাট দাঁড়িয়ে আছে।

 

বৃষ্টির অভাবে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় কৃষকেরা পাট কাটতেও পারছেন না। তাঁদের আশা ছিল, পাট কাটার পরপরই ওই জমিতে রোপা আমনের চারা রোপণ করবেন। কিন্তু বৃষ্টির অভাব ও পানির সংকটে সেই পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।

 

উপজেলার জামনগর ইউনিয়নের কৃষক শহিদুল ইসলাম (৫০) বলেন, “আমাদের এলাকায় রোপা আমন চাষের প্রাণই হলো বর্ষার পানি। এই পানি থাকলে আলাদা করে বেশি সেচ দিতে হয় না। কিন্তু এবার মাঠে পানি নেই। এখন পর্যন্ত ভালো বৃষ্টি না হওয়ায় জমিতে বীজ থেকে চারা তৈরি করতে পারিনি। এখন যদি ভালো বৃষ্টি না হয়, তাহলে সময়মতো চারা লাগানো কঠিন হবে।”

 

পাকা ইউনিয়নের চিথলিয়া গ্রামের কৃষক মিন্টু আলী (৩৭) বলেন, “ভরা বর্ষায় মাঠে পানি নেই। এমন অবস্থা আগে খুব একটা দেখিনি। পানি না পেলে অনেক জমি হয়তো অনাবাদি থেকে যাবে। একদিকে সময় চলে যাচ্ছে, অন্যদিকে এখনো বৃষ্টির দেখা নেই।”

 

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ডা. ভবসিন্ধু রায় বলেন, “এ বছর প্রয়োজনের তুলনায় বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকার নিচু জমিতেও পর্যাপ্ত পানি জমেনি। এতে রোপা আমনের চারা রোপণে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। কৃষকদের জমির অবস্থা বিবেচনা করে সেচের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা নিশ্চিত করে সময়মতো চারা রোপণের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।”

 

তিনি আরও বলেন, “আমরা সার্বক্ষণিক মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি এবং উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কৃষকদের প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হলে পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি হবে বলে আমরা আশা করছি।”