ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রতিনিধি নিয়োগ
দৈনিক সময়ের প্রত্যাশা পত্রিকার জন্য সারা দেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আপনি আপনার এলাকায় সাংবাদিকতা পেশায় আগ্রহী হলে যোগাযোগ করুন। Hotline- +880 9617 179084

তানোরে বেকারদের পকেট কাটা!

আলিফ হোসেন:

 

রাজশাহীর তানোরে চাকরিপ্রত্যাশী বেকার যুবকদের পকেট কাটার অভিযোগ উঠেছে। একশ্রেণির প্রতিষ্ঠান চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে আবেদনকারীদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের অভিযোগ, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকরির বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এ ধরনের বাণিজ্য করা হচ্ছে।

 

জানা গেছে, চাকরির আবেদনের সঙ্গে অফেরতযোগ্য ব্যাংক ড্রাফট, পে-অর্ডার ও ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে আবেদনকারীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হচ্ছে। সূত্রমতে, আয়া, দারোয়ান ও নৈশপ্রহরীর মতো পদেও ব্যাংক ড্রাফট ও পে-অর্ডারের মাধ্যমে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।

 

ফলে চাকরির জন্য একটি পদে আবেদন করতেই বেকার যুবকদের পকেট ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অসহায় ও হতদরিদ্র পরিবারের সন্তানরা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও চাকরির আবেদন করতে উৎসাহী হন না। আবার অনেকে অর্থের অভাবে আবেদনই করতে পারেন না। অনেক সময় ব্যাংক ড্রাফট, পে-অর্ডার ও ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করেও চাকরির পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ মেলে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

স্থানীয়দের অভিযোগ, তানোরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একই পদে একাধিকবার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের ঘটনা রয়েছে।

 

সমাজ বিশ্লেষকদের অভিমত, চাকরির আবেদনের সঙ্গে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার মাধ্যমে সমাজের দরিদ্র ও অসহায় পরিবারের সন্তানদের জন্য চাকরির দরজা সংকুচিত করা হচ্ছে। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক শিক্ষিত বেকার ব্যাংক ড্রাফটের অর্থ জোগাড় করতে না পেরে চাকরির আবেদন করতে পারছেন না। কর্মজগতে প্রবেশের ক্ষেত্রে এটিই তাদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

তানোর উপজেলা প্রশাসনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, চাকরির বিজ্ঞপ্তি দিয়ে যেভাবে টাকা নেওয়া হচ্ছে, তা অন্যায়। তিনি বলেন, আয়া, মালী ও পিয়নসহ যেসব পদে লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয় না, সেসব পদে আবেদনের সঙ্গে অতিরিক্ত টাকা চাওয়া কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য বা যুক্তিযুক্ত নয়। তবে লিখিত পরীক্ষার খরচ বাবদ কিছু টাকা নেওয়া যেতে পারে। কোনোভাবেই এক থেকে দেড় হাজার টাকা নেওয়া যুক্তিসংগত নয়। বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে এভাবে বাণিজ্য করা অনৈতিক।

 

স্থানীয় সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) কালীগঞ্জহাট ডিগ্রি কলেজ তিনটি শূন্য পদে কর্মচারী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এতে আগ্রহী প্রার্থীদের কাছে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, কালীগঞ্জহাট শাখার অনুকূলে অফেরতযোগ্য ১ হাজার ৫০০ টাকার ব্যাংক ড্রাফট/পে-অর্ডার চাওয়া হয়েছে।

 

এর আগে গত ৮ এপ্রিল উপজেলার জিওল দারুচ্ছুন্নাহ দাখিল মাদ্রাসায় বিধিমোতাবেক কর্মচারীর সৃষ্ট দুটি পদে জনবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। সেখানেও আগ্রহী প্রার্থীদের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ১০ কর্মদিবসের মধ্যে সোনালী ব্যাংক, তানোর শাখার অনুকূলে অফেরতযোগ্য ১ হাজার ৫০০ টাকার ব্যাংক ড্রাফটসহ সুপার বরাবর আবেদন করতে বলা হয়।

 

এ নিয়ে স্থানীয়দের প্রশ্ন, ল্যাব সহকারী ও পরিচ্ছন্নতা কর্মীর মর্যাদা কি সমান? যদি না হয়, তাহলে একই পরিমাণ অর্থের ব্যাংক ড্রাফট চাওয়া হলো কেন?

 

অভিজ্ঞ মহলের মতে, যে দেশে একটি পদের বিপরীতে সহস্রাধিক প্রার্থীর আবেদন করার নজির রয়েছে, সেখানে একটি শূন্য পদের আবেদনের জন্য অফেরতযোগ্য দেড় হাজার টাকা ব্যাংক ড্রাফট চাওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সহস্রাধিক আবেদন পড়লে ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে আদায় করা বিপুল অর্থ কোথায় যাবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর এলাকার কৃষক পরিবারের সন্তানদের জন্য এ অর্থ জোগাড় করা কঠিন।

 

তাদের অভিযোগ, সাধারণ বা দরিদ্র পরিবারের প্রার্থীরা যাতে আবেদন করতে না পারেন, সে উদ্দেশ্যেই হয়তো অতিরিক্ত টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

 

সচেতন মহলের দাবি, চাকরির আবেদনের ক্ষেত্রে এভাবে অর্থ নেওয়ার কারণে এলাকার অসংখ্য বেকারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। তারা অফেরতযোগ্য দেড় হাজার টাকা ব্যাংক ড্রাফট ছাড়াই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন, যাতে এলাকার সব যোগ্য প্রার্থী চাকরির জন্য আবেদন করার সুযোগ পান।

 

স্থানীয় যুবসমাজ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, আয়া-পিয়ন পদে দেড় হাজার টাকা ব্যাংক ড্রাফট চাওয়া অনৈতিক। তবে এটি সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিষয়। যেখানে একটি পদের বিপরীতে শতাধিক আবেদন পড়ার রেকর্ড রয়েছে, সেখানে এভাবে ব্যাংক ড্রাফট চাওয়ার বিষয়টি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত দিতে পারে।

Tag :
এই অথরের আরো সংবাদ দেখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

বাবার মৃত্যুর খবর শুনে বাড়ি ফেরার পথে ট্রাক চাপায় যুবকের মৃত্যু

error: Content is protected !!

তানোরে বেকারদের পকেট কাটা!

আপডেট টাইম : ২২ ঘন্টা আগে
আলিফ হোসেন, তানোর (রাজশাহী) প্রতিনিধি :

আলিফ হোসেন:

 

রাজশাহীর তানোরে চাকরিপ্রত্যাশী বেকার যুবকদের পকেট কাটার অভিযোগ উঠেছে। একশ্রেণির প্রতিষ্ঠান চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে আবেদনকারীদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের অভিযোগ, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চাকরির বিজ্ঞপ্তি দিয়ে এ ধরনের বাণিজ্য করা হচ্ছে।

 

জানা গেছে, চাকরির আবেদনের সঙ্গে অফেরতযোগ্য ব্যাংক ড্রাফট, পে-অর্ডার ও ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে আবেদনকারীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হচ্ছে। সূত্রমতে, আয়া, দারোয়ান ও নৈশপ্রহরীর মতো পদেও ব্যাংক ড্রাফট ও পে-অর্ডারের মাধ্যমে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।

 

ফলে চাকরির জন্য একটি পদে আবেদন করতেই বেকার যুবকদের পকেট ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অসহায় ও হতদরিদ্র পরিবারের সন্তানরা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও চাকরির আবেদন করতে উৎসাহী হন না। আবার অনেকে অর্থের অভাবে আবেদনই করতে পারেন না। অনেক সময় ব্যাংক ড্রাফট, পে-অর্ডার ও ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করেও চাকরির পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ মেলে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

স্থানীয়দের অভিযোগ, তানোরের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একই পদে একাধিকবার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে অর্থ আদায়ের ঘটনা রয়েছে।

 

সমাজ বিশ্লেষকদের অভিমত, চাকরির আবেদনের সঙ্গে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার মাধ্যমে সমাজের দরিদ্র ও অসহায় পরিবারের সন্তানদের জন্য চাকরির দরজা সংকুচিত করা হচ্ছে। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক শিক্ষিত বেকার ব্যাংক ড্রাফটের অর্থ জোগাড় করতে না পেরে চাকরির আবেদন করতে পারছেন না। কর্মজগতে প্রবেশের ক্ষেত্রে এটিই তাদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

তানোর উপজেলা প্রশাসনের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, চাকরির বিজ্ঞপ্তি দিয়ে যেভাবে টাকা নেওয়া হচ্ছে, তা অন্যায়। তিনি বলেন, আয়া, মালী ও পিয়নসহ যেসব পদে লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয় না, সেসব পদে আবেদনের সঙ্গে অতিরিক্ত টাকা চাওয়া কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য বা যুক্তিযুক্ত নয়। তবে লিখিত পরীক্ষার খরচ বাবদ কিছু টাকা নেওয়া যেতে পারে। কোনোভাবেই এক থেকে দেড় হাজার টাকা নেওয়া যুক্তিসংগত নয়। বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে এভাবে বাণিজ্য করা অনৈতিক।

 

স্থানীয় সূত্র জানায়, গত মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) কালীগঞ্জহাট ডিগ্রি কলেজ তিনটি শূন্য পদে কর্মচারী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এতে আগ্রহী প্রার্থীদের কাছে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, কালীগঞ্জহাট শাখার অনুকূলে অফেরতযোগ্য ১ হাজার ৫০০ টাকার ব্যাংক ড্রাফট/পে-অর্ডার চাওয়া হয়েছে।

 

এর আগে গত ৮ এপ্রিল উপজেলার জিওল দারুচ্ছুন্নাহ দাখিল মাদ্রাসায় বিধিমোতাবেক কর্মচারীর সৃষ্ট দুটি পদে জনবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। সেখানেও আগ্রহী প্রার্থীদের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ১০ কর্মদিবসের মধ্যে সোনালী ব্যাংক, তানোর শাখার অনুকূলে অফেরতযোগ্য ১ হাজার ৫০০ টাকার ব্যাংক ড্রাফটসহ সুপার বরাবর আবেদন করতে বলা হয়।

 

এ নিয়ে স্থানীয়দের প্রশ্ন, ল্যাব সহকারী ও পরিচ্ছন্নতা কর্মীর মর্যাদা কি সমান? যদি না হয়, তাহলে একই পরিমাণ অর্থের ব্যাংক ড্রাফট চাওয়া হলো কেন?

 

অভিজ্ঞ মহলের মতে, যে দেশে একটি পদের বিপরীতে সহস্রাধিক প্রার্থীর আবেদন করার নজির রয়েছে, সেখানে একটি শূন্য পদের আবেদনের জন্য অফেরতযোগ্য দেড় হাজার টাকা ব্যাংক ড্রাফট চাওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সহস্রাধিক আবেদন পড়লে ব্যাংক ড্রাফটের মাধ্যমে আদায় করা বিপুল অর্থ কোথায় যাবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে কৃষিনির্ভর এলাকার কৃষক পরিবারের সন্তানদের জন্য এ অর্থ জোগাড় করা কঠিন।

 

তাদের অভিযোগ, সাধারণ বা দরিদ্র পরিবারের প্রার্থীরা যাতে আবেদন করতে না পারেন, সে উদ্দেশ্যেই হয়তো অতিরিক্ত টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

 

সচেতন মহলের দাবি, চাকরির আবেদনের ক্ষেত্রে এভাবে অর্থ নেওয়ার কারণে এলাকার অসংখ্য বেকারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। তারা অফেরতযোগ্য দেড় হাজার টাকা ব্যাংক ড্রাফট ছাড়াই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন, যাতে এলাকার সব যোগ্য প্রার্থী চাকরির জন্য আবেদন করার সুযোগ পান।

 

স্থানীয় যুবসমাজ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, আয়া-পিয়ন পদে দেড় হাজার টাকা ব্যাংক ড্রাফট চাওয়া অনৈতিক। তবে এটি সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিষয়। যেখানে একটি পদের বিপরীতে শতাধিক আবেদন পড়ার রেকর্ড রয়েছে, সেখানে এভাবে ব্যাংক ড্রাফট চাওয়ার বিষয়টি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত দিতে পারে।