ঢাকা , শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo কুষ্টিয়া সীমান্তে বিএসএফের পুশইন চেষ্টা, বিজিবির বাধায় ফিরে গেল ৪ জন Logo ঠাকুরগাঁওয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ও জেলা শিক্ষা অফিসের যৌথ পরিচ্ছন্নতা অভিযান Logo ১৫ বছর পর ভাঙ্গার কুমার নদে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচঃ লাখো মানুষের ঢল। Logo আলফাডাঙ্গা প্রেসক্লাবে লাইব্রেরি উদ্বোধন Logo রায়ের পর বদলে গেল গোগ্রামের পাঁচ বছরের নির্বাচনী হিসাব Logo শতবর্ষী সরকারি খাল দখলমুক্তে অভিযান, মালামাল স্পট নিলামে Logo মধুখালী থানার এএসআই শরীফুলের সাফল্য, ৬২ হারানো মোবাইল উদ্ধার Logo বিদ্যুৎ সংকটে গঙ্গাচড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সোলার-আইপিএস দিলেন জিওন Logo নরসিংদীর চরাঞ্চলে যৌথ অভিযান, অস্ত্র-গুলাবারুদ ও ১৩৬ ককটেলসহ গ্রেপ্তার ৩ Logo সারাদেশে জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস-২০২৬ পালিত
প্রতিনিধি নিয়োগ
সারা দেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আপনি আপনার এলাকায় সাংবাদিকতা পেশায় আগ্রহী হলে যোগাযোগ করুন। Hotline- +880 1728311111

মা ও মেয়ের ৫৪ বছর কেটে গেল কুষ্টিয়া রেলওয়ে স্টেশনে

ইসমাইল হোসেন বাবু:

 

মা ও মেয়ের ৫৪ বছর কেটে গেল কুষ্টিয়া কোর্ট রেলওয়ে স্টেশনে। সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধা খোদেজা বেগম ও তার মেয়ে বাতাসি—এই স্টেশনই তাদের একমাত্র আশ্রয়।

 

যুদ্ধের আগে খেজুরের রস খেয়ে স্বামী মারা যাওয়ার পর, যুদ্ধ শেষে জীবনযুদ্ধে নামেন খোদেজা বেগম। মেয়েকে নিয়ে ১৯৭১ সালের শেষের দিকে রাজবাড়ী জেলার পাংশা বাগদুলি গ্রাম ছেড়ে জীবিকার উদ্দেশ্যে চলে আসেন কুষ্টিয়ার কোর্ট স্টেশনে।

 

সেই থেকে শুরু, মেয়েকে নিয়ে তার জীবন সংগ্রাম। খেয়ে না খেয়ে এই স্টেশনের বারান্দাতেই কেটে গেছে ৫৪ বছর।

 

একমাত্র মেয়ে বাতাসি এই স্টেশনের আলো-বাতাসেই বড় হয়েছে। স্থানীয়রা এখন তাকে “বাতাসি পাগলি” নামেই চেনে। কখনো স্টেশনের পূর্ব পাশে, কখনো পশ্চিম পাশের চায়ের দোকানে গল্পে ব্যস্ত থাকে সে। দিনে সাত কাপ চা পান করাটাই বাতাসির অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

কোর্ট স্টেশনে ঝাড়ু দিয়ে আর মা খোদেজা বেগমের ভিক্ষার টাকায় চলে তাদের দুজনের জীবন।

 

বয়সের ভারে ঠিকমতো কথা বলতে পারেন না খোদেজা বেগম। অস্পষ্ট কণ্ঠে বলেন: “যুদ্ধের সময় ফ্যান-পানি খাইয়ে দিন কাটায়ছি। যুদ্ধ শেষ হলিই মিয়াডা (মেয়েকে) নিয়ে চলি আসি কুষ্টিয়া কোর্ট স্টেশনে। মিয়া নিয়েই কাজকাম করতাম, আর এই স্টেশনে রাত কাটাতাম। জীবনের সাথে যুদ্ধ করে রাতে থাকতে হতো এ স্টেশনে।”

 

কথা বলতে বলতে গলা ধরে এলে অনেকক্ষণ চুপ থাকেন তিনি।

 

এরপর প্রতিবেদককে জিজ্ঞাসা করেন: “বাবা, মরার আগে ভাতা কার্ড পামুনি? ভাতা কার্ড কারে কয় বাবা? আর আমি তো ভোট দিইনে, ভোটার হতি হয় কেম্বা বাবা?”

 

অসহায় চোখে বলেন, “মিয়াডারে নিয়া চিন্তা। আমি নাই মিয়াডারে পাহারা দিয়ে গেলাম। আমার তো মরনের টাইম হয়ছে। বাতাসির আল্লা ছাড়া উপায় নাই। এই স্টেশন আমার এখন মাথা গুঁজার ঠাঁই। ধুলা-ময়লা নিয়া পড়ে থাকি। এইডা যেন না হারায় বাবা।”

 

বাতাসির সঙ্গে কথা হলে সে বলে: “আমার একটা ঘরের ব্যবস্থা করলি আমি ঘরে থাকতি পারতাম। সেই ছোটকালে আইছি। আজও ঘর হলো না। আর আমারে ঘর দিবি কিডা! আমি তো ভোটার না। কেম্বা করে ভোটার হব, সমবাদিক সাহেব?”

 

কোর্ট স্টেশনের সর্দার মুকুল বলেন: “আমার বাবা ছিলেন সর্দার। আমিও সর্দারগিরি করছি। আমি সেই ছোটবেলা থেকে মা-মেয়েকে এখানেই দেখছি।”

 

স্টেশনে বই-পত্রিকা বিক্রেতা কামাল বলেন: “আমিও প্রায় ৩২ বছর ধরে ব্যবসা করছি। এখানেই দেখে গেলাম তাদের। তবে মা-মেয়ের মাঝে কোনো খারাপ কিছু দেখলাম না। এখানেই কাটিয়ে দিচ্ছে এতগুলো বছর। তাদের দেখার কেউ নেই। সমাজের উচ্চবিত্তরা একটু সহায়তা করলে এরা একটু ভালো থাকতে পারত।”

 

কুষ্টিয়া কোর্ট স্টেশন মাস্টার ইতি আরা বলেন: “বাতাসি খুব ভালো মেয়ে। তার মাও খুব ভালো মানুষ। জোরে কথা বলে না। তাদের আচরণ ভালো। আমরা চাই সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে আসুক এবং তাদের মতো মানুষকে সহযোগিতা করুক।”

Tag :
এই অথরের আরো সংবাদ দেখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রথমবারের মতো মাঠে গড়াচ্ছে এক্সপ্যাট ওয়ার্ল্ড কাপ

error: Content is protected !!

মা ও মেয়ের ৫৪ বছর কেটে গেল কুষ্টিয়া রেলওয়ে স্টেশনে

আপডেট টাইম : ১০:৫৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫
ইসমাইল হোসেন বাবু, সিনিয়র ষ্টাফ রিপোর্টার :

ইসমাইল হোসেন বাবু:

 

মা ও মেয়ের ৫৪ বছর কেটে গেল কুষ্টিয়া কোর্ট রেলওয়ে স্টেশনে। সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধা খোদেজা বেগম ও তার মেয়ে বাতাসি—এই স্টেশনই তাদের একমাত্র আশ্রয়।

 

যুদ্ধের আগে খেজুরের রস খেয়ে স্বামী মারা যাওয়ার পর, যুদ্ধ শেষে জীবনযুদ্ধে নামেন খোদেজা বেগম। মেয়েকে নিয়ে ১৯৭১ সালের শেষের দিকে রাজবাড়ী জেলার পাংশা বাগদুলি গ্রাম ছেড়ে জীবিকার উদ্দেশ্যে চলে আসেন কুষ্টিয়ার কোর্ট স্টেশনে।

 

সেই থেকে শুরু, মেয়েকে নিয়ে তার জীবন সংগ্রাম। খেয়ে না খেয়ে এই স্টেশনের বারান্দাতেই কেটে গেছে ৫৪ বছর।

 

একমাত্র মেয়ে বাতাসি এই স্টেশনের আলো-বাতাসেই বড় হয়েছে। স্থানীয়রা এখন তাকে “বাতাসি পাগলি” নামেই চেনে। কখনো স্টেশনের পূর্ব পাশে, কখনো পশ্চিম পাশের চায়ের দোকানে গল্পে ব্যস্ত থাকে সে। দিনে সাত কাপ চা পান করাটাই বাতাসির অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

কোর্ট স্টেশনে ঝাড়ু দিয়ে আর মা খোদেজা বেগমের ভিক্ষার টাকায় চলে তাদের দুজনের জীবন।

 

বয়সের ভারে ঠিকমতো কথা বলতে পারেন না খোদেজা বেগম। অস্পষ্ট কণ্ঠে বলেন: “যুদ্ধের সময় ফ্যান-পানি খাইয়ে দিন কাটায়ছি। যুদ্ধ শেষ হলিই মিয়াডা (মেয়েকে) নিয়ে চলি আসি কুষ্টিয়া কোর্ট স্টেশনে। মিয়া নিয়েই কাজকাম করতাম, আর এই স্টেশনে রাত কাটাতাম। জীবনের সাথে যুদ্ধ করে রাতে থাকতে হতো এ স্টেশনে।”

 

কথা বলতে বলতে গলা ধরে এলে অনেকক্ষণ চুপ থাকেন তিনি।

 

এরপর প্রতিবেদককে জিজ্ঞাসা করেন: “বাবা, মরার আগে ভাতা কার্ড পামুনি? ভাতা কার্ড কারে কয় বাবা? আর আমি তো ভোট দিইনে, ভোটার হতি হয় কেম্বা বাবা?”

 

অসহায় চোখে বলেন, “মিয়াডারে নিয়া চিন্তা। আমি নাই মিয়াডারে পাহারা দিয়ে গেলাম। আমার তো মরনের টাইম হয়ছে। বাতাসির আল্লা ছাড়া উপায় নাই। এই স্টেশন আমার এখন মাথা গুঁজার ঠাঁই। ধুলা-ময়লা নিয়া পড়ে থাকি। এইডা যেন না হারায় বাবা।”

 

বাতাসির সঙ্গে কথা হলে সে বলে: “আমার একটা ঘরের ব্যবস্থা করলি আমি ঘরে থাকতি পারতাম। সেই ছোটকালে আইছি। আজও ঘর হলো না। আর আমারে ঘর দিবি কিডা! আমি তো ভোটার না। কেম্বা করে ভোটার হব, সমবাদিক সাহেব?”

 

কোর্ট স্টেশনের সর্দার মুকুল বলেন: “আমার বাবা ছিলেন সর্দার। আমিও সর্দারগিরি করছি। আমি সেই ছোটবেলা থেকে মা-মেয়েকে এখানেই দেখছি।”

 

স্টেশনে বই-পত্রিকা বিক্রেতা কামাল বলেন: “আমিও প্রায় ৩২ বছর ধরে ব্যবসা করছি। এখানেই দেখে গেলাম তাদের। তবে মা-মেয়ের মাঝে কোনো খারাপ কিছু দেখলাম না। এখানেই কাটিয়ে দিচ্ছে এতগুলো বছর। তাদের দেখার কেউ নেই। সমাজের উচ্চবিত্তরা একটু সহায়তা করলে এরা একটু ভালো থাকতে পারত।”

 

কুষ্টিয়া কোর্ট স্টেশন মাস্টার ইতি আরা বলেন: “বাতাসি খুব ভালো মেয়ে। তার মাও খুব ভালো মানুষ। জোরে কথা বলে না। তাদের আচরণ ভালো। আমরা চাই সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে আসুক এবং তাদের মতো মানুষকে সহযোগিতা করুক।”