মোঃ আলম মৃধাঃ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন জমে উঠেছে। অনলাইন এবং মাঠ পর্যায়ে প্রচার প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন বিভিন্ন দলের এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। ভোটারদের আকৃষ্ট করতে তারা দিচ্ছেন নানা আশ্বাস, প্রতিশ্রুতি। মাঠে-ঘাটে চা স্টলে সব জায়গায় এখন নির্বাচনী উৎসব এবং আমেজ বিরাজ করছে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকলেও তাদের ভোটের প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করেন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
নরসিংদীতেও চলছে পাঁচটি আসন নিয়ে নানা হিসাব -নিকাশ। তবে নরসিংদী ১ ও ২ আসনে অনেকটাই এগিয়ে বিএনপি, নরসিংদী ৩ ও ৫ বিএনপি’র বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় বেকাদায় বিএনপি, অন্যদিকে ৪ আসনে মিলেছে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস।
নরসিংদী–১: (নরসিংদী সদর)
নরসিংদী ১ সদর আসনে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন জাতীয় বীর ৯০ এর গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও জেলা সভাপতি খায়রুল কবির খোকন। খোকন এখানে উপ নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হয়েছিল এবং অল্প সময়ে অনেক উন্নয়ন করে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন। অন্যদিকে সাবেক ইসলামী ব্যাংক কর্মকর্তা জামাতের প্রার্থী মোঃ ইব্রাহিম ভূঁইয়া নতুন হওয়ায় তিনি এখনো সব জায়গায় নিজেকে পরিচিতই করতে পারেননি। এখানে খোকন বিপুল ভোটে জয়লাভ করার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ এ আসনে বিএনপি’র সকল নেতাকর্মীরা নিজেদের মধ্যে বিভেদ ভুলে খায়রুল কবির খোকনের পক্ষে মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছেন। অন্যদিকে জামাতের প্রার্থী তার পক্ষে নামার মত লোকই পাচ্ছেন না। তাই এখানে এগিয়ে আছেন ধানের শীষ।
নরসিংদী–২: (পলাশ)
এ আসনে এগারো দলীয় জোট থেকে এনসিপি নেতা সারোয়ার তুষারকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তবে তার জনমত শূন্যের কোঠায়, বিশেষ করে দলীয় নারী নেত্রী সংক্রান্ত অশ্লীল অডিও ভাইরাল হওয়ার পর জনমতের নেতিবাচক প্রভাব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এজন্য জামায়াতে ইসলামের নেতা-কর্মীরা মোঃ আমজাদ হোসাইনকে মনোনয়ন প্রত্যাহার করতে দেননি। কিন্তু জামাত এই প্রার্থীকে প্রতীক বরাদ্দ না দেওয়ার দাবি তুলেছে। তাই নির্বাচনের মাঠে আমজাদ হোসেনের প্রতিদ্বন্দ্বী করার অবস্থান নেই। এখানে ১১ দলের প্রার্থী এনসিপির তুষার। অন্যদিকে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তিনি হেভিওয়েট একজন প্রার্থী। তার কাছে এনসিপির প্রার্থীর জমানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি দেখছেন সাধারণ ভোটাররা।
নরসিংদী পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি সারোয়ার মৃধা জানান, জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির সাবেক মরহুম খাদ্যমন্ত্রী আব্দুল মোমেন খান এর সুযোগ্য সন্তান ড. আব্দুল মঈন খানও তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সৎ। এলাকার জন্য অনেক উন্নয়ন করেছেন। পরীক্ষিত নেতা। নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করবেন।
নরসিংদী–৩: (শিবপুর)
এই আসনে উন্নয়নের রূপকার হিসেবে পরিচিত ছিলেন বিএনপির সাবেক মরহুম মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া। জীবদ্দশায় তিনি সংস্কারপন্থী নেতা হিসেবে দল থেকে বহিষ্কৃত হন এবং শেষ নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন। কিন্তু তার মৃত্যুর পর শিবপুরবাসী তার অভাব অনুভব করেন। তার আদর্শকে ধারণ করে মান্নান ভূঁইয়া স্মৃতি পরিষদ গঠন করা হয়। এই পরিষদের আহ্বায়ক আরিফ উল ইসলাম মৃধা, যিনি শিবপুর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন, এবার স্বতন্ত্র এমপি প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন। তিনি মরহুম মান্নান ভূঁইয়ার আদর্শে রাজনীতি করেন। ইতিমধ্যে তার পক্ষে ব্যাপক জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। তিনি মান্নান ভূইয়ার জীবনের শেষ নির্বাচনের প্রতীকে (হাঁস) মার্কা নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। তিনি দলমত নির্বিশেষে সকলের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পেয়েছেন। জয়ের সম্ভাবনা তারই বেশি। অন্যদিকে জেলা বিএনপির সেক্রেটারি মনজুর এলাহী ধানের শীষ প্রতীক পেলেও ভোটের অঙ্কে তিনি পিছিয়ে রয়েছেন।
শিবপুর উপজেলা যুবদলের সাবেক আহবায়ক রফিকুল ইসলাম মৃধা জানান, এখানে মূল লড়াই হবে আরিফ উল ইসলাম মৃধা এবং ১১ দলীয় জুটের প্রার্থী রাকিবুল ইসলাম রাকিবের মধ্যে। তিনি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী। তিনি রিস্কা প্রতীকে নির্বাচন করছেন। জামায়াতে ইসলামের প্রার্থী তাকে সমর্থন দিয়ে প্রার্থীতা প্রত্যাহার করেছেন। তবে আরিফ মৃধার জয়ের পাল্লাই ভারী বলে মনে করেন সাধারণ ভোটাররা।
নরসিংদী–৪: (বেলাব -মনোহরদী)
এ আসনে বিএনপির তিনজন মনোনয়ন প্রত্যাশী প্রার্থী ছিলেন। এর মধ্যে স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সেক্রেটারি ও বর্তমানে বিএনপির সহ-স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল এবং কেন্দ্রীয় মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদক লে. কর্নেল (অব.) জয়নুল আবেদীন ছিলেন। তারা মনোনয়ন বঞ্চিত হওয়ায় বিএনপির মূলধারা মনঃক্ষুণ্ণ। মনোনয়ন বঞ্চিত দুই নেতার ভোট যদি মাঠে না আসে, তবে নির্বাচনে তা একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে। অন্যদিকে সাবেক তিন বাহিনীর প্রধান ও আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ও জ্বালানি মন্ত্রী নুরুদ্দিন খানের একটি নির্দিষ্ট ভোট ব্যাংক রয়েছে। যদি তিনি এই ভোট জামাতের প্রার্থীকে দিতে পারেন, জয়ের সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। ব্যাকফুটে চলে যাবেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সরদার মোঃ সাখাওয়াত হোসেন বকুল। ইতিমধ্যে তার এবং তার নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ফেসবুকে ভাইরাল। তার নির্বাচনী প্রচারণায় আওয়ামীলীগকে নামানো হলেও আওয়ামী লীগের ভোট তিনি পাবেন না, বলে মনে করেন বিএনপিপন্থী ভোটাররা।
এ বিষয়ে নরসিংদী জেলা বিএনপির সাবেক প্রচার সম্পাদক মঞ্জুর মোর্শেদ বলেন, চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিবাজ বকুলের পরাজয় নিশ্চিত।
নরসিংদী–৫: (রায়পুরা)
এই আসনকে বলা হয় আওয়ামী লীগের ঘাঁটি। এখান থেকে মোট ছয়বার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের রাজউদ্দ্দিন আহমেদ রাজু। আওয়ামী লীগের ভোটকে পুঁজি করে ব্যারিস্টার তৌফিকুর রহমান এখানে প্রার্থী হয়েছিলেন। তবে নির্বাচনী প্রচার- প্রচারণায় না থাকায় তার কোন অবস্থান তৈরি হয়নি। অন্যদিকে চরাঞ্চল থেকে মোঃ পনির হোসেন, যিনি জামাতের বহিষ্কৃত নেতা, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটে অংশ নিচ্ছেন (মাইক মার্কা)। তিনি রায়পুরা উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান। রায়পুরা বাসীর সুখে- দুখে তিনি সবসময় পাশে দাঁড়িয়েছেন সামর্থ্য অনুযায়ী। চরাঞ্চলে তার একচেটিয়া ভোট ব্যাংক রয়েছে এবং তিনি পনির স্যার নামে বেশ পরিচিত। এলাকায় তার পরিচিতি এবং সুনাম দুটিই রয়েছে। জামাত যদি তাকে সমর্থন দিত তাহলে জয় পেতে কোন বেগ পেতে হতো না তাকে। কিন্তু জামাত এখানে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মোঃ তাজুল ইসলামকে সমর্থন দিয়েছেন। তাই একটু পিছিয়ে রয়েছেন পনির। কিন্তু ভোটারদের মধ্যে তাকে নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। ধানের শীষের মনোনীত প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুল এবং বিএনপি’র বিদ্রোহী প্রার্থী জামাল আহমেদ চৌধুরী আনারস প্রতীকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। বিএনপি’র ভোট বিভক্ত হওয়ার কারণে এই আসনে দুই প্রার্থীর লড়াইতে উত্তেজনা থাকবে। তবে মূল লড়াইয়ে তারা নাও আসতে পারেন বলে মনে করেন সাধারণ ভোটাররা।।
নির্বাচন বিষয়ে নরসিংদী জেলা যুবদলের সহ-সভাপতি মোহাম্মদ মাসুদ রানা জানান, চ্যালেঞ্জ থাকলেও পাঁচটি আসনেই ধানের শীষের প্রার্থীরা বিজয়ী হবেন বলে আমি বিশ্বাস করি। এখন সময় ধানের শীষের।
অন্যদিকে নরসিংদী জামায়াতে ইসলামের আমির মাওলানা মুসলেহুদ্দীন জানান, কালো টাকা ও পেশী শক্তির প্রভাব না থাকলে, প্রশাসন নিরপেক্ষ হলে নির্বাচনে ভালো করবে জামাতের প্রার্থীরা।
প্রিন্ট

বিএনপি প্রার্থী স্বামীর জন্য ধানের শীষে ভোট চাইলেন চীনা স্ত্রী 
মোঃ আলম মৃধা, নরসিংদী জেলা প্রতিনিধি 

















