ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo ১৫ বছর পর ভাঙ্গার কুমার নদে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচঃ লাখো মানুষের ঢল। Logo আলফাডাঙ্গা প্রেসক্লাবে লাইব্রেরি উদ্বোধন Logo রায়ের পর বদলে গেল গোগ্রামের পাঁচ বছরের নির্বাচনী হিসাব Logo শতবর্ষী সরকারি খাল দখলমুক্তে অভিযান, মালামাল স্পট নিলামে Logo মধুখালী থানার এএসআই শরীফুলের সাফল্য, ৬২ হারানো মোবাইল উদ্ধার Logo বিদ্যুৎ সংকটে গঙ্গাচড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সোলার-আইপিএস দিলেন জিওন Logo নরসিংদীর চরাঞ্চলে যৌথ অভিযান, অস্ত্র-গুলাবারুদ ও ১৩৬ ককটেলসহ গ্রেপ্তার ৩ Logo সারাদেশে জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস-২০২৬ পালিত Logo সাতক্ষীরার শ্যামনগরে দুই সংখ্যালঘু পরিবারকে দেশছাড়ার হুমকি Logo নগরকান্দায় ৯৫০ পিচ ইয়াবাসহ আটক ১
প্রতিনিধি নিয়োগ
দৈনিক সময়ের প্রত্যাশা পত্রিকার জন্য সারা দেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আপনি আপনার এলাকায় সাংবাদিকতা পেশায় আগ্রহী হলে যোগাযোগ করুন। Hotline- +880 9617 179084

উপজেলা প্রশাসনের হৃৎপিণ্ডে আঘাত

হরিপুরে ইউএনও’র কক্ষে নথিপত্র ছিনতাই

জসীমউদ্দীন ইতিঃ

 

ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে চলন্ত নিয়োগ পরীক্ষার ভাইভা বোর্ড থেকে নথিপত্র ছিনিয়ে নেওয়ার যে ঘটনাটি সম্প্রতি ঘটে গেল, তা কেবল একটি সাধারণ বিশৃঙ্খলা নয়; বরং এটি দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থার মেরুদণ্ডে চরম আঘাতের শামিল। গত শুক্রবার বিকেলে উপজেলা প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্রে, খোদ ইউএনও’র খাস কামরায় বসে একদল রাজনৈতিক নেতাকর্মী যেভাবে নথিপত্র ছিনতাই ও তান্ডব চালিয়েছেন, তা কোনোভাবেই একটি সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

 

মেদনিসাগর টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছিল। লিখিত পরীক্ষা শেষে যখন ৮ জন পরীক্ষার্থীর ভাইভা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল, ঠিক তখনই উপজেলা বিএনপির সভাপতি জামাল উদ্দীন ও তার অনুসারীরা সেখানে চড়াও হন। তাদের অভিযোগ ছিল নিয়োগে অনিয়ম হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যদি অনিয়ম হয়েই থাকে, তবে তার প্রতিকার কি নথিপত্র ছিনতাই? একটি সরকারি দপ্তরে, যেখানে সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে একজন নির্বাহী কর্মকর্তা বসে আছেন, সেখানে এমন পেশিশক্তির প্রদর্শন প্রমাণ করে যে, স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতি কতটা উগ্র রূপ ধারণ করেছে।

 

আমাদের দেশে নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে অভিযোগ নতুন কিছু নয়। কিন্তু সেই অভিযোগ খতিয়ে দেখার জন্য সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক কাঠামো রয়েছে। বিভাগীয় কমিশনার বা জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া কিংবা উচ্চ আদালতের আশ্রয় নেওয়ার পথ সবার জন্যই খোলা। অথচ আইনি পথে না গিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং সরকারি নথিপত্র লুট করা স্পষ্টতই একটি ফৌজদারি অপরাধ। মেদনিসাগর কলেজের অধ্যক্ষ হারুনুর রশিদ এবং ইউএনও রায়হানুল ইসলাম উভয়েই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। নথিপত্র ছিনতাইয়ের মাধ্যমে কেবল একটি নিয়োগ প্রক্রিয়াই বাধাগ্রস্ত হয়নি, বরং সাধারণ ও নিরীহ পরীক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।

 

রাজনীতি হওয়া উচিত জনগণের অধিকার আদায়ের হাতিয়ার, প্রশাসনের স্বাভাবিক কাজে বাধা দেওয়ার মাধ্যম নয়। অভিযুক্ত বিএনপি নেতা জামাল উদ্দীনের দাবি—প্রতিষ্ঠানটি রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন মতাবলম্বীদের এবং সেখানে জালিয়াতি হচ্ছিল। কিন্তু সেই দাবির সত্যতা প্রমাণের দায়িত্ব প্রশাসনের, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়। মব সৃষ্টি করে বা টেবিল থেকে কাগজপত্র ছিনিয়ে নিয়ে নিজের দাবি প্রতিষ্ঠা করা কোনো রাজনৈতিক আদর্শ হতে পারে না। এটি প্রশাসনের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছে রাজনীতিকদের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।

 

এই নজিরবিহীন ঘটনায় হরিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মামলা করার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন বলে জানা গেছে। আমরা মনে করি, এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। যদি দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তবে ভবিষ্যতে সরকারি কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা এবং সরকারি কাজের গোপনীয়তা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসন এবং পুলিশ বিভাগকে এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখতে হবে।

 

সরকারি কার্যালয় কোনো রাজনৈতিক আড্ডাখানা বা বিশৃঙ্খলা তৈরির জায়গা নয়। হরিপুরের এই ঘটনা প্রশাসনের জন্য একটি সতর্কবার্তা। আমরা আশা করি, ছিনতাই হওয়া নথিপত্র দ্রুত উদ্ধার করা হবে এবং যারা আইনের ঊর্ধ্বে নিজেদের ভাবছেন, তাদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা হবে। অন্যথায়, মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে এবং সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে।

Tag :
এই অথরের আরো সংবাদ দেখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

পানি কমলেও বাড়ছে পদ্মার ভাঙন, সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বিদ্যুতের পোল

error: Content is protected !!

উপজেলা প্রশাসনের হৃৎপিণ্ডে আঘাত

হরিপুরে ইউএনও’র কক্ষে নথিপত্র ছিনতাই

আপডেট টাইম : ০৩:৩৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬
জসীমউদ্দীন ইতি, ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি :

জসীমউদ্দীন ইতিঃ

 

ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে চলন্ত নিয়োগ পরীক্ষার ভাইভা বোর্ড থেকে নথিপত্র ছিনিয়ে নেওয়ার যে ঘটনাটি সম্প্রতি ঘটে গেল, তা কেবল একটি সাধারণ বিশৃঙ্খলা নয়; বরং এটি দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থার মেরুদণ্ডে চরম আঘাতের শামিল। গত শুক্রবার বিকেলে উপজেলা প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্রে, খোদ ইউএনও’র খাস কামরায় বসে একদল রাজনৈতিক নেতাকর্মী যেভাবে নথিপত্র ছিনতাই ও তান্ডব চালিয়েছেন, তা কোনোভাবেই একটি সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

 

মেদনিসাগর টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিএম কলেজের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছিল। লিখিত পরীক্ষা শেষে যখন ৮ জন পরীক্ষার্থীর ভাইভা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছিল, ঠিক তখনই উপজেলা বিএনপির সভাপতি জামাল উদ্দীন ও তার অনুসারীরা সেখানে চড়াও হন। তাদের অভিযোগ ছিল নিয়োগে অনিয়ম হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যদি অনিয়ম হয়েই থাকে, তবে তার প্রতিকার কি নথিপত্র ছিনতাই? একটি সরকারি দপ্তরে, যেখানে সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে একজন নির্বাহী কর্মকর্তা বসে আছেন, সেখানে এমন পেশিশক্তির প্রদর্শন প্রমাণ করে যে, স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতি কতটা উগ্র রূপ ধারণ করেছে।

 

আমাদের দেশে নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে অভিযোগ নতুন কিছু নয়। কিন্তু সেই অভিযোগ খতিয়ে দেখার জন্য সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক কাঠামো রয়েছে। বিভাগীয় কমিশনার বা জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া কিংবা উচ্চ আদালতের আশ্রয় নেওয়ার পথ সবার জন্যই খোলা। অথচ আইনি পথে না গিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং সরকারি নথিপত্র লুট করা স্পষ্টতই একটি ফৌজদারি অপরাধ। মেদনিসাগর কলেজের অধ্যক্ষ হারুনুর রশিদ এবং ইউএনও রায়হানুল ইসলাম উভয়েই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। নথিপত্র ছিনতাইয়ের মাধ্যমে কেবল একটি নিয়োগ প্রক্রিয়াই বাধাগ্রস্ত হয়নি, বরং সাধারণ ও নিরীহ পরীক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।

 

রাজনীতি হওয়া উচিত জনগণের অধিকার আদায়ের হাতিয়ার, প্রশাসনের স্বাভাবিক কাজে বাধা দেওয়ার মাধ্যম নয়। অভিযুক্ত বিএনপি নেতা জামাল উদ্দীনের দাবি—প্রতিষ্ঠানটি রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন মতাবলম্বীদের এবং সেখানে জালিয়াতি হচ্ছিল। কিন্তু সেই দাবির সত্যতা প্রমাণের দায়িত্ব প্রশাসনের, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়। মব সৃষ্টি করে বা টেবিল থেকে কাগজপত্র ছিনিয়ে নিয়ে নিজের দাবি প্রতিষ্ঠা করা কোনো রাজনৈতিক আদর্শ হতে পারে না। এটি প্রশাসনের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের কাছে রাজনীতিকদের ভাবমূর্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।

 

এই নজিরবিহীন ঘটনায় হরিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মামলা করার প্রক্রিয়া শুরু করেছেন বলে জানা গেছে। আমরা মনে করি, এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি। যদি দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তবে ভবিষ্যতে সরকারি কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা এবং সরকারি কাজের গোপনীয়তা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসন এবং পুলিশ বিভাগকে এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখতে হবে।

 

সরকারি কার্যালয় কোনো রাজনৈতিক আড্ডাখানা বা বিশৃঙ্খলা তৈরির জায়গা নয়। হরিপুরের এই ঘটনা প্রশাসনের জন্য একটি সতর্কবার্তা। আমরা আশা করি, ছিনতাই হওয়া নথিপত্র দ্রুত উদ্ধার করা হবে এবং যারা আইনের ঊর্ধ্বে নিজেদের ভাবছেন, তাদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা হবে। অন্যথায়, মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করা অসম্ভব হয়ে পড়বে এবং সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে।