ঢাকা , মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রতিনিধি নিয়োগ
দৈনিক সময়ের প্রত্যাশা পত্রিকার জন্য সারা দেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আপনি আপনার এলাকায় সাংবাদিকতা পেশায় আগ্রহী হলে যোগাযোগ করুন। Hotline- +880 9617 179084

ফরিদপুরের সালথায় স্কুল গড়তে জমি দানঃ এখন সেই জমিই ফেরত চায় দাতা পরিবার

নুরুল ইসলামঃ

ফরিদপুরের সালথা উপজেলার সাড়ুকদিয়া উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় জমি দান করেছিল দত্ত পরিবার। তবে বিদ্যালয়ের নামে রেকর্ড হওয়া জমির একটি বড় অংশ শিক্ষা কার্যক্রমে ব্যবহার না হওয়ায় বর্তমানে সেগুলো স্থানীয় বিভিন্ন ব্যক্তি দখল করে রেখেছেন বলে অভিযোগ পরিবারের। দীর্ঘদিনের এ বিরোধ এখন গড়িয়েছে আদালত ও উপজেলা প্রশাসন পর্যন্ত।

 

বিদ্যালয়ের নামে রেকর্ড থাকা ২ দশমিক ০১ একর জমির মধ্যে বিদ্যালয়ের ভবন ও ব্যবহারযোগ্য অংশ বাদ দিয়ে ১ দশমিক ৫০ একর জমি নিজেদের নামে নামজারির আবেদন করেছেন জমিদাতা পরিবারের উত্তরসূরি সনজিত কুমার দত্ত। আদালতের রায়-ডিক্রি, খতিয়ানসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযুক্ত করে সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর এ আবেদন করা হয়েছে।

 

আবেদনকারী সনজিত কুমার দত্ত নিজেকে মৃত রমেন্দ্রনাথ দত্তের ছেলে হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, তাঁদের পূর্বপুরুষ উপেন্দ্রনাথ দত্ত ওরফে ‘পঞ্চায়েত বাবু’ ছিলেন এ এলাকার প্রভাবশালী জমিদার। তৎকালীন সময়ে স্থানীয়ভাবে খাজনা আদায় ও জমিসংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রম তাঁর মাধ্যমেই পরিচালিত হতো। শিক্ষা, চিকিৎসা ও জনকল্যাণে দত্ত পরিবারের পূর্বপুরুষদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলেও দাবি পরিবারের।

 

পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রমেন্দ্রনাথ দত্ত সাড়ুকদিয়া উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য ৪০ শতাংশ জমি দান করেন। ১৯৬২ সালে ওই জমিতে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়া এলাকার বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের জন্যও দত্ত পরিবার জমি দান করেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

 

সনজিত কুমার দত্ত বলেন, “আমার বাবা ভোট অফিসকে ১০ শতাংশ জমি দান করেছেন, কৃষি অফিসকে দিয়েছেন ১৫ শতাংশ এবং হাসপাতালের জন্য দিয়েছেন ৩৫ শতাংশ জমি। এর বাইরেও আমাদের অনেক জমি হাতছাড়া হয়ে গেছে। অনেকে আমাদের জায়গা-জমি ভোগদখল করে খাচ্ছে। স্কুলের প্রয়োজনে ভবিষ্যতে আমাদের আরও জমি প্রয়োজন হলে সেটিও আমরা দলিল করে দিতে প্রস্তুত। কিন্তু স্কুলের বাইরে আমাদের যে জমিগুলো রয়েছে, সেগুলো উদ্ধার করে আমাদের বুঝিয়ে দিতে হবে।”

 

তিনি আরও বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে আইনি লড়াই করেছি। আদালতের রায়ও আমাদের পক্ষে এসেছে। এখন আমরা চাই, আইন অনুযায়ী আমাদের জমি আমাদের বুঝিয়ে দেওয়া হোক। এ বিষয়ে মাননীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদসহ উপজেলা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।”

 

আবেদনপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, সালথা উপজেলার ১৮ নম্বর সলিয়া মৌজার আরএস ৫২, ৭৯ ও ৯১; এসএ ৫৬, ৭৪ ও ৯১ এবং বিএস ২, ৩, ৪ ও ২৫৬ নম্বর খতিয়ানের আওতায় থাকা মোট ২ দশমিক ০১ একর জমি নিয়ে দেওয়ানি ৮৮৩/২৬ নম্বর মামলা হয়। পরিবারের দাবি, ওই মামলায় তাঁদের পক্ষে রায়-ডিক্রি হয়েছে।

 

আবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৯ জুলাই তারিখের ১০ নম্বর আদেশপত্রে উল্লিখিত রায়-ডিক্রির ভিত্তিতে বিদ্যালয়ের ব্যবহারের বাইরে থাকা ১ দশমিক ৫০ একর জমি নিজেদের নামে নামজারির আবেদন করা হয়েছে। আবেদনের সঙ্গে আদালতের রায়-ডিক্রির কপি, আরএস ও এসএ খতিয়ান এবং বিএস ২৫৬ নম্বর খতিয়ানের কপিও সংযুক্ত করা হয়েছে।

 

পরিবারের দাবি, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় ৪০ শতাংশ জমি দান করা হলেও পরবর্তী সময়ে আশপাশের আরও জমি বিদ্যালয়ের ব্যবহারের মধ্যে চলে যায় এবং ভূমি রেকর্ডের সময় তাঁদের মালিকানাধীন আরও জমি বিদ্যালয়ের নামে রেকর্ড হয়। এসব জমির অনেক অংশ বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমে ব্যবহার না হওয়ায় স্থানীয় বিভিন্ন ব্যক্তি দোকানপাট ও স্থাপনা নির্মাণ করে দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখল করছেন বলে অভিযোগ তাঁদের।

 

এদিকে বিষয়টি নিয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সাড়ুকদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাবু জয়ন্ত কুমার বিশ্বাস বলেন, “বিদ্যালয়ের ব্যবহারকৃত জমি বাদে বাইরের বেশ কিছু জায়গা স্থানীয়রা দখল করে দোকানপাট তুলে দীর্ঘদিন ধরে সুবিধা ভোগ করছে। এসব জায়গা থেকে স্কুল কোনো সুবিধা পাচ্ছে না। আমরাও চাই আইনগতভাবে জায়গাগুলো দখলমুক্ত হোক। তবে যেহেতু মামলায় একটি রায় এসেছে, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আমরা বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করব।”

 

দখলকৃত জমির একটি অংশে ব্যবসা পরিচালনাকারী সুরুজ মোল্লা বলেন, “জায়গার মালিকের কাছ থেকে আমার মার্কেটের পেছনের জমি ক্রয় করেছি। তবে সামনের জমি স্কুলের। আমরা দীর্ঘ বছর ধরে এই জায়গা ব্যবহার করে ব্যবসা করছি। আমাদের কাছ থেকে স্কুল কর্তৃপক্ষ কোনো সুযোগ-সুবিধা পায় না।”

 

অবৈধভাবে দখল করা হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “যদি সরকার আমাদের জায়গা উচ্ছেদ করে দেয়, তাহলে আমার মতো অনেকের প্রতিষ্ঠান উচ্ছেদ করতে হবে।”

 

দত্ত পরিবারের দাবির বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও প্রকৃত মালিকানা যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।

 

স্থানীয় বাসিন্দা নাসির উদ্দিন বলেন, “ভুক্তভোগী পরিবারটি স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য জমি দান করেছিল। কিন্তু স্কুলের ব্যবহারের বাইরে যে জমিগুলো রয়েছে, সেগুলো অনেকেই জবরদখল করে খাচ্ছে। আমরা চাই, জমির প্রকৃত মালিক যেন তাদের জমির দখল বুঝে পান। এ বিষয়ে প্রয়োজন হলে আমরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অনুরোধ করব, যাতে প্রকৃত মালিক তাঁর জমি ফেরত পান।”

 

গোবিন্দপুর গ্রামের হাসমত খান বলেন, “স্কুলের জমির বাইরে যে জমিগুলো অবৈধভাবে দখল করা হয়েছে, সেগুলো প্রকৃত মালিককে ফেরত দিতে হবে।

 

স্থানীয় বাসিন্দা আকরাম মাতুব্বর বলেন, “সঞ্জিত দত্তের বাবা-দাদা এই এলাকাবাসীর জন্য অনেক কিছু করেছেন। এখন যদি তাঁর কোনো ন্যায্য দাবি থাকে, সেই দাবি পূরণ করা হোক, কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের অনুরোধ।”

 

কাশেম মাতুব্বর বলেন, “স্কুলের জমির বাইরে দখলকৃত জমিগুলো উদ্ধার করে প্রকৃত মালিককে বুঝিয়ে দেওয়া উচিত। কারণ এই পরিবারটি আমাদের এলাকার জন্য অনেক কিছু করেছে, অনেক উপকার করেছে। তাই আমাদের সবার উচিত তাদের পাশে থাকা।”

 

সাড়ুকদিয়া গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা আশরাফ আলী বলেন, “আমার জানামতে, এই জমিগুলোর প্রকৃত মালিক পঞ্চায়েত বাবুর বংশধরেরা। এই এলাকায় স্কুল প্রতিষ্ঠাও তাঁরাই করেছিলেন। অথচ এখন তাঁদের সম্পদ বাইরের মানুষ দখল করে ভোগ করছে। আমরা এর সঠিক সমাধান চাই। আমরা চাই, প্রকৃত মালিক তাঁর জমি ফেরত পাক।”

 

খাগৈর গ্রামের সোহেল মোল্লা বলেন, “আমরা জানি, সঞ্জিত দত্ত বিদ্যালয়ের ভেতরে যে জমি নিয়ে রায় পেয়েছেন, তিনি সেই জমি নেবেন না। তাঁর এই সিদ্ধান্তে আমরা সন্তুষ্ট। তবে বাজারে কিছু জমি দখল করে ভোগ করা হচ্ছে। আমরা সবাই চাই, সেই জমি তিনি ফেরত পান।”

 

এদিকে রমেন্দ্রনাথ দত্তের স্ত্রী শেফালী রানী দত্ত বলেন, “আমার শ্বশুরের পর আমার স্বামী এই এলাকার মানুষের সুবিধার জন্য এবং শিক্ষা বিস্তারের স্বার্থে ৪০ শতাংশ জমি স্কুলের জন্য দান করেছিলেন। কিন্তু ওই ৪০ শতাংশ জমি দান করার পরও আমাদের অনেক জমি হাতছাড়া হয়ে গেছে। আমাদের জমিগুলো এলাকার প্রভাবশালীরা ভোগদখল করে খাচ্ছে। দীর্ঘদিন আদালতে মামলা পরিচালনার পর আদালত আমাদের পক্ষে রায় দিয়েছে।
এখন আমরা চাই, আমরা যেহেতু জমির প্রকৃত মালিক, তাই সরকার আমাদের জমিগুলো ফিরিয়ে দিক এবং দখলদারদের কাছ থেকে জমি উদ্ধার করে দিক।”

 

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, এ ঘটনায় আবেগ বা প্রভাব নয়, প্রথমে যাচাই করতে হবে জমির মূল মালিকানা, সরকারি রেকর্ড, আদালতের রায়-ডিক্রি এবং বর্তমান বাস্তব দখলের অবস্থা। বিদ্যালয়ের জন্য প্রয়োজনীয় জমি বিদ্যালয়ের স্বার্থে সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি আদালতের রায় ও সরকারি নথিতে যদি বিদ্যালয়ের ব্যবহারের বাইরে থাকা জমি দত্ত পরিবারের মালিকানাধীন প্রমাণিত হয়, তাহলে আইন অনুযায়ী সেই জমি প্রকৃত মালিককে বুঝিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত।

 

সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সাড়ুকদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি দবির উদ্দিন বলেন, “যেহেতু আদালতের একপাক্ষিক রায় রয়েছে, সেহেতু রায়ভুক্ত জমির মধ্যে বিদ্যালয়ের ভবন রয়েছে। তাই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ওই রায়ের বিরুদ্ধে একটি আপিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যাতে স্কুলের বাউন্ডারি বা সীমানার মধ্যে কোনো পক্ষ প্রবেশ করতে না পারে।”

তিনি বলেন, “যেহেতু বিদ্যালয়টি এলাকার স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, তাই আমরা বিদ্যালয়ের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার পর বিষয়টিকে আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখব এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করব, যাতে কোনো পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।”

 

স্কুলের বাইরে বিভিন্ন ব্যক্তির দখলে থাকা জমির বিষয়ে ইউএনও বলেন, “তিনি যদি তাঁর পক্ষে স্কুলের জমির বাইরে বিভিন্ন ব্যক্তির দখলে থাকা জমির বিষয়ে আদালত থেকে তাঁর পক্ষে রায় আনতে পারেন, তবে সেই বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখব এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”

Tag :
এই অথরের আরো সংবাদ দেখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

ফরিদপুরের সালথায় স্কুল গড়তে জমি দানঃ এখন সেই জমিই ফেরত চায় দাতা পরিবার

error: Content is protected !!

ফরিদপুরের সালথায় স্কুল গড়তে জমি দানঃ এখন সেই জমিই ফেরত চায় দাতা পরিবার

আপডেট টাইম : ৮ ঘন্টা আগে
নুরুল ইসলাম, নিজস্ব প্রতিনিধি :

নুরুল ইসলামঃ

ফরিদপুরের সালথা উপজেলার সাড়ুকদিয়া উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় জমি দান করেছিল দত্ত পরিবার। তবে বিদ্যালয়ের নামে রেকর্ড হওয়া জমির একটি বড় অংশ শিক্ষা কার্যক্রমে ব্যবহার না হওয়ায় বর্তমানে সেগুলো স্থানীয় বিভিন্ন ব্যক্তি দখল করে রেখেছেন বলে অভিযোগ পরিবারের। দীর্ঘদিনের এ বিরোধ এখন গড়িয়েছে আদালত ও উপজেলা প্রশাসন পর্যন্ত।

 

বিদ্যালয়ের নামে রেকর্ড থাকা ২ দশমিক ০১ একর জমির মধ্যে বিদ্যালয়ের ভবন ও ব্যবহারযোগ্য অংশ বাদ দিয়ে ১ দশমিক ৫০ একর জমি নিজেদের নামে নামজারির আবেদন করেছেন জমিদাতা পরিবারের উত্তরসূরি সনজিত কুমার দত্ত। আদালতের রায়-ডিক্রি, খতিয়ানসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযুক্ত করে সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবর এ আবেদন করা হয়েছে।

 

আবেদনকারী সনজিত কুমার দত্ত নিজেকে মৃত রমেন্দ্রনাথ দত্তের ছেলে হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, তাঁদের পূর্বপুরুষ উপেন্দ্রনাথ দত্ত ওরফে ‘পঞ্চায়েত বাবু’ ছিলেন এ এলাকার প্রভাবশালী জমিদার। তৎকালীন সময়ে স্থানীয়ভাবে খাজনা আদায় ও জমিসংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রম তাঁর মাধ্যমেই পরিচালিত হতো। শিক্ষা, চিকিৎসা ও জনকল্যাণে দত্ত পরিবারের পূর্বপুরুষদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলেও দাবি পরিবারের।

 

পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রমেন্দ্রনাথ দত্ত সাড়ুকদিয়া উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য ৪০ শতাংশ জমি দান করেন। ১৯৬২ সালে ওই জমিতে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়া এলাকার বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের জন্যও দত্ত পরিবার জমি দান করেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

 

সনজিত কুমার দত্ত বলেন, “আমার বাবা ভোট অফিসকে ১০ শতাংশ জমি দান করেছেন, কৃষি অফিসকে দিয়েছেন ১৫ শতাংশ এবং হাসপাতালের জন্য দিয়েছেন ৩৫ শতাংশ জমি। এর বাইরেও আমাদের অনেক জমি হাতছাড়া হয়ে গেছে। অনেকে আমাদের জায়গা-জমি ভোগদখল করে খাচ্ছে। স্কুলের প্রয়োজনে ভবিষ্যতে আমাদের আরও জমি প্রয়োজন হলে সেটিও আমরা দলিল করে দিতে প্রস্তুত। কিন্তু স্কুলের বাইরে আমাদের যে জমিগুলো রয়েছে, সেগুলো উদ্ধার করে আমাদের বুঝিয়ে দিতে হবে।”

 

তিনি আরও বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে আইনি লড়াই করেছি। আদালতের রায়ও আমাদের পক্ষে এসেছে। এখন আমরা চাই, আইন অনুযায়ী আমাদের জমি আমাদের বুঝিয়ে দেওয়া হোক। এ বিষয়ে মাননীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদসহ উপজেলা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।”

 

আবেদনপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, সালথা উপজেলার ১৮ নম্বর সলিয়া মৌজার আরএস ৫২, ৭৯ ও ৯১; এসএ ৫৬, ৭৪ ও ৯১ এবং বিএস ২, ৩, ৪ ও ২৫৬ নম্বর খতিয়ানের আওতায় থাকা মোট ২ দশমিক ০১ একর জমি নিয়ে দেওয়ানি ৮৮৩/২৬ নম্বর মামলা হয়। পরিবারের দাবি, ওই মামলায় তাঁদের পক্ষে রায়-ডিক্রি হয়েছে।

 

আবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৯ জুলাই তারিখের ১০ নম্বর আদেশপত্রে উল্লিখিত রায়-ডিক্রির ভিত্তিতে বিদ্যালয়ের ব্যবহারের বাইরে থাকা ১ দশমিক ৫০ একর জমি নিজেদের নামে নামজারির আবেদন করা হয়েছে। আবেদনের সঙ্গে আদালতের রায়-ডিক্রির কপি, আরএস ও এসএ খতিয়ান এবং বিএস ২৫৬ নম্বর খতিয়ানের কপিও সংযুক্ত করা হয়েছে।

 

পরিবারের দাবি, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় ৪০ শতাংশ জমি দান করা হলেও পরবর্তী সময়ে আশপাশের আরও জমি বিদ্যালয়ের ব্যবহারের মধ্যে চলে যায় এবং ভূমি রেকর্ডের সময় তাঁদের মালিকানাধীন আরও জমি বিদ্যালয়ের নামে রেকর্ড হয়। এসব জমির অনেক অংশ বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমে ব্যবহার না হওয়ায় স্থানীয় বিভিন্ন ব্যক্তি দোকানপাট ও স্থাপনা নির্মাণ করে দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখল করছেন বলে অভিযোগ তাঁদের।

 

এদিকে বিষয়টি নিয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সাড়ুকদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাবু জয়ন্ত কুমার বিশ্বাস বলেন, “বিদ্যালয়ের ব্যবহারকৃত জমি বাদে বাইরের বেশ কিছু জায়গা স্থানীয়রা দখল করে দোকানপাট তুলে দীর্ঘদিন ধরে সুবিধা ভোগ করছে। এসব জায়গা থেকে স্কুল কোনো সুবিধা পাচ্ছে না। আমরাও চাই আইনগতভাবে জায়গাগুলো দখলমুক্ত হোক। তবে যেহেতু মামলায় একটি রায় এসেছে, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আমরা বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করব।”

 

দখলকৃত জমির একটি অংশে ব্যবসা পরিচালনাকারী সুরুজ মোল্লা বলেন, “জায়গার মালিকের কাছ থেকে আমার মার্কেটের পেছনের জমি ক্রয় করেছি। তবে সামনের জমি স্কুলের। আমরা দীর্ঘ বছর ধরে এই জায়গা ব্যবহার করে ব্যবসা করছি। আমাদের কাছ থেকে স্কুল কর্তৃপক্ষ কোনো সুযোগ-সুবিধা পায় না।”

 

অবৈধভাবে দখল করা হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “যদি সরকার আমাদের জায়গা উচ্ছেদ করে দেয়, তাহলে আমার মতো অনেকের প্রতিষ্ঠান উচ্ছেদ করতে হবে।”

 

দত্ত পরিবারের দাবির বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও প্রকৃত মালিকানা যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।

 

স্থানীয় বাসিন্দা নাসির উদ্দিন বলেন, “ভুক্তভোগী পরিবারটি স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য জমি দান করেছিল। কিন্তু স্কুলের ব্যবহারের বাইরে যে জমিগুলো রয়েছে, সেগুলো অনেকেই জবরদখল করে খাচ্ছে। আমরা চাই, জমির প্রকৃত মালিক যেন তাদের জমির দখল বুঝে পান। এ বিষয়ে প্রয়োজন হলে আমরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অনুরোধ করব, যাতে প্রকৃত মালিক তাঁর জমি ফেরত পান।”

 

গোবিন্দপুর গ্রামের হাসমত খান বলেন, “স্কুলের জমির বাইরে যে জমিগুলো অবৈধভাবে দখল করা হয়েছে, সেগুলো প্রকৃত মালিককে ফেরত দিতে হবে।

 

স্থানীয় বাসিন্দা আকরাম মাতুব্বর বলেন, “সঞ্জিত দত্তের বাবা-দাদা এই এলাকাবাসীর জন্য অনেক কিছু করেছেন। এখন যদি তাঁর কোনো ন্যায্য দাবি থাকে, সেই দাবি পূরণ করা হোক, কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের অনুরোধ।”

 

কাশেম মাতুব্বর বলেন, “স্কুলের জমির বাইরে দখলকৃত জমিগুলো উদ্ধার করে প্রকৃত মালিককে বুঝিয়ে দেওয়া উচিত। কারণ এই পরিবারটি আমাদের এলাকার জন্য অনেক কিছু করেছে, অনেক উপকার করেছে। তাই আমাদের সবার উচিত তাদের পাশে থাকা।”

 

সাড়ুকদিয়া গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা আশরাফ আলী বলেন, “আমার জানামতে, এই জমিগুলোর প্রকৃত মালিক পঞ্চায়েত বাবুর বংশধরেরা। এই এলাকায় স্কুল প্রতিষ্ঠাও তাঁরাই করেছিলেন। অথচ এখন তাঁদের সম্পদ বাইরের মানুষ দখল করে ভোগ করছে। আমরা এর সঠিক সমাধান চাই। আমরা চাই, প্রকৃত মালিক তাঁর জমি ফেরত পাক।”

 

খাগৈর গ্রামের সোহেল মোল্লা বলেন, “আমরা জানি, সঞ্জিত দত্ত বিদ্যালয়ের ভেতরে যে জমি নিয়ে রায় পেয়েছেন, তিনি সেই জমি নেবেন না। তাঁর এই সিদ্ধান্তে আমরা সন্তুষ্ট। তবে বাজারে কিছু জমি দখল করে ভোগ করা হচ্ছে। আমরা সবাই চাই, সেই জমি তিনি ফেরত পান।”

 

এদিকে রমেন্দ্রনাথ দত্তের স্ত্রী শেফালী রানী দত্ত বলেন, “আমার শ্বশুরের পর আমার স্বামী এই এলাকার মানুষের সুবিধার জন্য এবং শিক্ষা বিস্তারের স্বার্থে ৪০ শতাংশ জমি স্কুলের জন্য দান করেছিলেন। কিন্তু ওই ৪০ শতাংশ জমি দান করার পরও আমাদের অনেক জমি হাতছাড়া হয়ে গেছে। আমাদের জমিগুলো এলাকার প্রভাবশালীরা ভোগদখল করে খাচ্ছে। দীর্ঘদিন আদালতে মামলা পরিচালনার পর আদালত আমাদের পক্ষে রায় দিয়েছে।
এখন আমরা চাই, আমরা যেহেতু জমির প্রকৃত মালিক, তাই সরকার আমাদের জমিগুলো ফিরিয়ে দিক এবং দখলদারদের কাছ থেকে জমি উদ্ধার করে দিক।”

 

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, এ ঘটনায় আবেগ বা প্রভাব নয়, প্রথমে যাচাই করতে হবে জমির মূল মালিকানা, সরকারি রেকর্ড, আদালতের রায়-ডিক্রি এবং বর্তমান বাস্তব দখলের অবস্থা। বিদ্যালয়ের জন্য প্রয়োজনীয় জমি বিদ্যালয়ের স্বার্থে সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি আদালতের রায় ও সরকারি নথিতে যদি বিদ্যালয়ের ব্যবহারের বাইরে থাকা জমি দত্ত পরিবারের মালিকানাধীন প্রমাণিত হয়, তাহলে আইন অনুযায়ী সেই জমি প্রকৃত মালিককে বুঝিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত।

 

সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সাড়ুকদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি দবির উদ্দিন বলেন, “যেহেতু আদালতের একপাক্ষিক রায় রয়েছে, সেহেতু রায়ভুক্ত জমির মধ্যে বিদ্যালয়ের ভবন রয়েছে। তাই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ওই রায়ের বিরুদ্ধে একটি আপিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যাতে স্কুলের বাউন্ডারি বা সীমানার মধ্যে কোনো পক্ষ প্রবেশ করতে না পারে।”

তিনি বলেন, “যেহেতু বিদ্যালয়টি এলাকার স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, তাই আমরা বিদ্যালয়ের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার পর বিষয়টিকে আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখব এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করব, যাতে কোনো পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।”

 

স্কুলের বাইরে বিভিন্ন ব্যক্তির দখলে থাকা জমির বিষয়ে ইউএনও বলেন, “তিনি যদি তাঁর পক্ষে স্কুলের জমির বাইরে বিভিন্ন ব্যক্তির দখলে থাকা জমির বিষয়ে আদালত থেকে তাঁর পক্ষে রায় আনতে পারেন, তবে সেই বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখব এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”