মাহবুবুর রহমান সোহেলঃ
গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মুন্সিরটেক এলাকায় একটি বাড়ির খোলা ম্যানহোলে পড়ে শ্রী নিলীমা রানী রায় (৫) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ম্যানহোলটির ঢাকনা না থাকায় শিশুটি সেখানে পড়ে যায় বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীরা। এ ঘটনায় বাড়ির মালিকের দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগের পাশাপাশি শিশুটির মরদেহ থানায় নেওয়ার পর কথিত ‘সমঝোতা’ নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন।
নিহত নিলীমা রানী রায় দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার বাসিন্দা। তার বাবা শ্রী শিতল চন্দ্র রায় এবং মা শ্রী রেবা রানী রায়। স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, নিলীমা তার মায়ের সঙ্গে মুন্সিরটেক এলাকার লিমা আক্তারের বাসায় যায়। ওই বাসায় শিশুটির বড় ভাই একজন শিক্ষিকার কাছে প্রাইভেট পড়াশোনা করত।
পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বাসায় অবস্থানকালে শিশুটি বাড়ির খোলা ম্যানহোলে পড়ে যায়। শিশুটির মায়ের কান্নার শব্দ শুনে আশপাশের লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। পরে স্থানীয়রা শিশুটিকে উদ্ধার করে সফিপুরের তানহা হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বাড়িটির নিচতলায় একটি মাদরাসা এবং দ্বিতীয় তলায় একটি কোচিং সেন্টার রয়েছে। বাড়িটি নির্মাণের পর থেকেই ম্যানহোলটি ঢাকনাবিহীন অবস্থায় ছিল বলেও অভিযোগ তাদের। দীর্ঘদিন ধরে এমন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও ম্যানহোলটি নিরাপদ করার জন্য কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি স্থানীয়দের।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষিকা ডলি পারভীন বলেন, “ম্যানহোলের ঢাকনা খোলা ছিল। আমরা ঘরের ভেতরই ছিলাম। কখন যে দুর্ঘটনা ঘটেছে তাও জানি না। এক বাচ্চা এসে আমাদের খবর দেয়।”
তবে বাড়ির মালিক লিমা আক্তার বলেন, ঘটনার সময় তিনি বাসায় ছিলেন না। ম্যানহোলের ঢাকনা খোলা থাকায় দুর্ঘটনাটি ঘটেছে বলে তিনি স্বীকার করেন। তার দাবি, ঘটনার আগের দিন তিনি জায়গাটি পরিষ্কার করে বস্তা ও ইট দিয়ে ম্যানহোলটি ঢেকে রেখেছিলেন। এরপরও কীভাবে শিশুটি সেখানে পড়ে গেল, তা তিনি জানেন না।
দুর্ঘটনার পর কালিয়াকৈর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশুটির মরদেহ থানায় নিয়ে যায়। পরিবারের পক্ষ থেকে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ নেওয়ার দাবি জানানো হয় বলে জানা গেছে। পরিবারের সদস্যদের দাবি, তারা কোনো টাকা-পয়সা চাননি; তাদের একমাত্র চাওয়া ছিল শিশুটির মরদেহ।
পরিবারের সদস্যরা বলেন, “আমাদের লাশ লাগবে, টাকা-পয়সার দরকার নেই। মানুষ মারা গেছে, টাকা দিয়ে কী হবে?”
এদিকে শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় থানায় কথিত ‘সমঝোতা’ হয়েছে—এমন অভিযোগ সামনে আসার পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, বাড়ির মালিকের কোনো দায় বা অবহেলা না থাকলে থানায় গিয়ে সমঝোতার প্রয়োজন হলো কেন? আর যদি ম্যানহোল খোলা রাখার ক্ষেত্রে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ থাকে, তাহলে তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি নির্ধারণের আগে থানায় কীভাবে সমঝোতা হলো?
আইন বিশ্লেষকদের মতে, কোনো দুর্ঘটনা বা অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে ময়নাতদন্ত না চাওয়ার বিষয়টি একেবারে আলাদা। তবে কারও দায়িত্বে অবহেলা বা অপরাধের কারণে মৃত্যু হয়েছে কি না—এমন অভিযোগ থাকলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা পুলিশের দায়িত্ব।
ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৪ ধারায় দুর্ঘটনা বা সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশকে অনুসন্ধান করে মৃত্যুর আপাত কারণ সম্পর্কে প্রতিবেদন তৈরির বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে কোনো অপরাধ আপসযোগ্য কি না, সেটিও নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট আইনের বিধানের ওপর। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪৫ ধারায় আপসযোগ্য অপরাধ ও আপসের পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়েছে।
একজন আইন বিশ্লেষক বলেন, “ওসি কোনো ফৌজদারি মামলার বিচার করতে পারেন না। পুলিশ তদন্ত করতে পারে এবং তদন্তের ভিত্তিতে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে। কোনো ব্যক্তি অপরাধী কি না, তার বিচারিক সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষমতা আদালতের। তাই থানায় বসে অর্থের বিনিময়ে কোনো ফৌজদারি দায় নিষ্পত্তির সাধারণ ক্ষমতা একজন ওসির নেই।”
তিনি আরও বলেন, “কোনো নির্দিষ্ট অপরাধ আপসযোগ্য কি না, সেটি সংশ্লিষ্ট আইনের বিধানের ওপর নির্ভর করে। ফলে একটি শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় কী ধরনের সমঝোতা হয়েছে এবং সেটির আইনগত ভিত্তি কী ছিল, তা যাচাই করা প্রয়োজন।”
দণ্ডবিধির ৩০৪(এ) ধারায় বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত কর্মকাণ্ডের কারণে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু হলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। তবে নিলীমা রানী রায়ের মৃত্যুর ঘটনায় ওই ধারা প্রযোজ্য কি না, তা তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
এ ক্ষেত্রে ম্যানহোলটি কার দায়িত্বে ছিল, কতদিন ধরে সেটি খোলা ছিল, বাড়ির মালিক বিষয়টি জানতেন কি না, ম্যানহোলের চারপাশে কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল কি না এবং এসবের সঙ্গে শিশুটির মৃত্যুর সরাসরি কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন আইনজীবীরা।
এ বিষয়ে কালিয়াকৈর থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম (পিপিএম)-এর কাছে মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি থানায় সমঝোতার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “সমঝোতা না করে আপনি কী করতে চান, আপনি বুঝবেন না, একসময় আইসেন, বুঝাবনি।”
ওসির এই বক্তব্যের পর থানায় হওয়া কথিত সমঝোতার আইনগত ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে সেখানে কোনো অর্থের লেনদেন হয়ে থাকলে তার ভিত্তি কী ছিল, কী ধরনের সমঝোতা হয়েছে এবং ময়নাতদন্ত ছাড়া শিশুটির মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের ক্ষেত্রে পুলিশ কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে—এসব বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয়দের দাবি, জনবহুল এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে একটি ম্যানহোল ঢাকনাবিহীন থাকার অভিযোগ যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে শুধু দুর্ঘটনার পরের ঘটনাই নয়, দুর্ঘটনার আগে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থাটি কেন নজরে আসেনি—সেটিও তদন্তের আওতায় আনা উচিত।
একটি পাঁচ বছরের শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু যেন কেবল একটি ‘সমঝোতা’র মধ্য দিয়ে শেষ না হয়—এমনটাই দাবি স্থানীয়দের। তাদের প্রত্যাশা, ঘটনার প্রকৃত কারণ, দায়িত্বে অবহেলা ছিল কি না এবং থানায় কী ধরনের প্রক্রিয়ায় সমঝোতা হয়েছে—সবকিছু নিরপেক্ষভাবে যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে এলাকার সব খোলা ও ঝুঁকিপূর্ণ ম্যানহোল দ্রুত নিরাপদ করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

মধুখালী থানার এএসআই শরীফুলের সাফল্য, ৬২ হারানো মোবাইল উদ্ধার 
মাহবুবুর রহমান সোহেল, বিষেশ প্রতিনিধি 




















