ইসমাইল হোসেন বাবু, সিনিয়ার স্টাফ রিপোর্টার
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে একের পর এক হত্যাকাণ্ড, সংঘর্ষ, গোলাগুলি এবং প্রতিনিয়ত চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও নির্যাতনের ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বাড়ছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত প্রায় ৮ মাসে অন্তত ১০টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
এর বাইরেও জমি ও পারিবারিক বিরোধ নিয়ে সংঘর্ষ, মাদক কারবারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, নিত্যদিনের চুরির অভিযোগ, বাড়িঘর ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে চুরি এবং সড়কে অ্যাম্বুলেন্সসহ বিভিন্ন যানবাহন থামিয়ে ডাকাতির একাধিক ঘটনা দৌলতপুরবাসীকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
পুলিশের দাবি, অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডের পেছনে জমিজমা ও ব্যক্তিগত বিরোধ রয়েছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তবে ধারাবাহিক ও নিত্যদিনের এসব ঘটনায় জননিরাপত্তা ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে জনমনে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি খলিশাকুন্ডি বাজার এলাকার একটি ভাড়া বাসার তালাবদ্ধ কক্ষ থেকে ট্রাকচালক উজ্জ্বল হোসেনের (৩৫) অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার বাওট গ্রামের বাসিন্দা। তাকে হত্যা করে লাশ ঘরের মধ্যে আটকিয়ে রাখা হয়। ১৮ মার্চ সদর ইউনিয়নের দক্ষিণ দাড়েরপাড়া এলাকায় আড়াই বছরের শিশু নুজাইফা আক্তারকে পারিবারিক বিরোধের জেরে শ্বাসরোধে হত্যার পর মরদেহ গাছে ঝুলিয়ে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা করে তার আপন চাচি। পরে পুলিশ চাচি কল্পনা আক্তারকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে হত্যার দায় স্বীকার করে।
সবথেকে আলোচিত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয় ১১ এপ্রিল। উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের দক্ষিণ-পশ্চিম ফিলিপনগর এলাকায় ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে ‘পীর’ শামীম জাহাঙ্গীর ওরফে আবদুর রহমানকে পিটিয়ে ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে বিক্ষুব্ধ জনতা। এসময় পীরের দরবারে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে ব্যাপক লুটপাটের তাণ্ডবলীলা চালায় ধর্মান্ধরা।
১০ জুলাই চিলমারী ইউনিয়নের শুকারঘাট এলাকায় গরু চুরির অভিযোগে মামুন মোল্লা নামে এক ব্যক্তিকে শাবল দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়। ২৩ জুলাই আদাবাড়িয়া ইউনিয়নের ধর্মদহ এলাকার মাঠ থেকে চা বিক্রেতা সামিরুল শাহ (৬০) নামে এক ব্যক্তির রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ২৬ জুলাই রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের সীমান্ত সংলগ্ন চড়ইকুড়ি এলাকায় মহিষ বিক্রির টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে ছেলের টর্চলাইটের আঘাতে বানেজ উদ্দিন (৫৫) নামে ব্যক্তি নিহত হন। ১৩ সেপ্টেম্বর বোয়ালিয়া ইউনিয়নের শেহালা বাদালতলা এলাকায় জমির সীমানা ও চলাচলের রাস্তা নিয়ে বিরোধের জেরে আপন বড় ভাই বজলুর রহমান বাদালের ধারালো হাসুয়ার কোপে ইমদাদুল হক বাদাল (৫৫) নিহত হন। ৩০ সেপ্টেম্বর পিয়ারপুর ইউনিয়নের কামালপুর সাতবিল মাঠের সড়কের পাশ থেকে ঘাস ও খড় দিয়ে ঢেকে রাখা অবস্থায় রাজা হোসেন (২৫) নামে এক যুবকের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় তাঁর বন্ধু রিফাজকে (২৬) গ্রেফতার করা হলে সে হত্যার দায় স্বীকার করে।
১ অক্টোবর রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের চড়ুঁইকুড়ি (মরার চর) গ্রামে মাদক কারবারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষে টেঙ্গুর (৬০) নামে একজন নিহত হন। এ ঘটনায় অন্তত ৮ জন আহত হয়। সংঘর্ষ চলাকালে গুলিবর্ষণের ঘটনাও ঘটে বলে স্থানীয়রা জানান। ২ অক্টোবর হোগলবাড়িয়া ইউনিয়নের সোনাইকুন্ডি তাজপুর গ্রামে বাবার কাছে ২০০ টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে ছোট ভাইয়ের হাসুয়ার আঘাতে মাদকাসক্ত এমদাদ হোসেন রাসেল (৩৫) নিহত হন।
শুধুমাত্র হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সীমাবদ্ধ নয়, হত্যাকাণ্ডের বাইরে রয়েছে নানা ধরণের অপরাধচিত্র। ১৬ ফেব্রুয়ারি ফিলিপনগরে চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও গোলাগুলিতে অন্তত ৩ জন গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটে। ২৩ মার্চ ধর্মদহ পূর্বপাড়ায় সুজন আলী (৩২) নামে এক যুবককে হাত-পা বেঁধে শরীরে পেরেক ঢুকিয়ে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। ৮ এপ্রিল আল্লারদর্গার একটি ফিলিং স্টেশনে সংঘর্ষে নারী-পুরুষসহ অন্তত ৭ জন আহত হন।
জ্বালানি তেলের অনিয়ম ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। ১৫ মে মথুরাপুর দরগাহ শরিফের খাদেম কামাল হোসেনকে ফিলিপনগরে চরের বালুর ভিতর হাত-পা বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার করে পুলিশ। ২৩ মে আড়িয়া ইউনিয়নের ছাতারপাড়ায় সংঘর্ষ ও গুলির ঘটনায় অন্তত ৪ জন আহত হন। ৩১ মে পিয়ারপুরে একটি ইউনিয়ন বিএনপি কার্যালয়ে হামলা ও ককটেল বিস্ফোরণে ৩ জন আহত হন। ১১ জুন কিস্তির টাকা সংগ্রহ করে ফেরার পথে ব্র্যাকের এক নারী মাঠকর্মীর কাছ থেকে অস্ত্রের মুখে প্রায় দেড় লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ১১ আগস্ট দৌলতপুর সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের দুটি এসির তামার তার ও যন্ত্রাংশ চুরি হয়। উপজেলা কৃষি অফিসেও দুই দফায় সিসি ক্যামেরা চুরির ঘটনা ঘটে। শুধুমাত্র সেপ্টেম্বর মাসে দৌলতপুর থানার আশপাশসহ দুই কিলোমিটারের মধ্যে অন্তত ২০টি বাড়িতে চুরির ঘটনা ঘটেছে। উপজেলা বাজার পূর্বপাড়া এলাকার বাসিন্দা হাবিবের বাড়িতে ৩ বার চুরির অভিযোগও রয়েছে। এর বাইরেও গরু চুরির ঘটনাও সংখ্যাধিক রয়েছে।
এছাড়াও রয়েছে বাস-অ্যাম্বুলেন্সেও ডাকাতি ও সড়কে একাধিক ছিনতাইয়ের ঘটনা। গত ১৬ সেপ্টেম্বর হোসেনাবাদ-মথুরাপুর সড়কে ঢাকা থেকে আসা একটি যাত্রীবাহী বাসে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ডাকাতদল অস্ত্রের মুখে যাত্রীদের জিম্মি করে নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার লুট করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ২২ সেপ্টেম্বর ভোরে ভেড়ামারা-তারাগুনিয়া সড়কের কল্যাণপুর ও জয়রামপুরের মাঝামাঝি এলাকায় রোগীবাহী একটি অ্যাম্বুলেন্স থামিয়ে ডাকাতির অভিযোগ ওঠে।
অ্যাম্বুলেন্স চালক রাব্বি আহমেদের ভাষ্য অনুযায়ী, ডাকাতরা তার হাতে ও কাঁধে দেশীয় অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। পরে রোগী ও স্বজনদের কাছ থেকে স্বর্ণালংকার, মোবাইল ফোন ও টাকা লুট করে নিয়ে যায়। রাব্বি আহমেদ বলেন, দৌলতপুর ও ভেড়ামারা থেকে রোগী নিয়ে রাজশাহী যেতে প্রায়ই রাতে সড়কে চলাচল করতে হয়। এমন ঘটনায় চালকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। একইদিন ভোরে আদাবাড়িয়ার ব্যাঙ্গাড়ী মাঠের সড়কে মাছ ব্যবসায়ী খবিরুল হোসেনকে (৪৫) গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করে ১৬ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ২৫ সেপ্টেম্বর জয়রামপুরে আইফোন চুরির অভিযোগে রুহুল হোসেন (২০) নামে এক যুবককে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে মারধর, হাত-পা ভেঙে দেওয়া ও মাথার চুল কেটে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
প্রেমের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে তাকে ঘিরে দলবদ্ধ হামলার পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল বলেও পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়। ২৬ সেপ্টেম্বর সিরাজনগর এলাকার সড়কের পাশ থেকে একটি ককটেল উদ্ধার করে পুলিশ। ১২ অক্টোবর খলিশাকুন্ডির পিপুলবাড়ীয়া-বালিডাঙ্গা মাঠে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে দেশীয় অস্ত্রসহ সোহান নামে এক যুবককে আটক করেন স্থানীয়রা। পরে তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়। এছাড়াও একই এলাকায় রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সে ডাকাতি, বয়লার মুরগি বহনকারী নছিমন থামিয়ে মুরগি ও মুরগি বিক্রির টাকা লুট করা হয়।
একের পর এক হত্যাকাণ্ড, সংঘর্ষ, গোলাগুলি, নির্যাতন, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও সহিংসতার ঘটনায় জনমনে নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বিরোধ থেকে প্রাণহানি, চুরির অপবাদে পিটিয়ে হত্যা, রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সেও ডাকাতি। সব মিলিয়ে প্রশাসনিক তৎপরতা ও জবাবদিহিতানি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে জনমনে।
তবে এসব ঘটনার বিষয়ে দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালেদুর রহমানের ভিন্নমত রয়েছে। তিনি জানান, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক রয়েছে। আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সর্বদা কাজ করছি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ নজরদারি জোরদার করেছি। জমিজমা ও ছোটখাটো বিরোধকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে একটি ক্লুলেস হত্যাকাণ্ডের রহস্য ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে উদঘাটন করে আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পরে তাকে আদালতে সোপর্দ করা হলে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। এ ছাড়াও অভিযানে একটি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়াও চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আমরা কাজ করছি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে। পাড়া-মহল্লা ও গ্রামাঞ্চলে যেসব ছোটখাটো চুরির ঘটনা ঘটছে, সেগুলোর সঙ্গেও মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে আমরা ধারণা করছি। তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। সার্বিকভাবে দৌলতপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
দৌলতপুরের আইনশৃঙ্খলা প্রসঙ্গে কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেলোয়ার হোসেন বলেন, দৌলতপুরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডগুলো বেশির ভাগই জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ ও তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঘটেছে। এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সম্প্রতি ডাকাতির বিষয়টি সামনে আসায় পুলিশের গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। আশা করছি, দ্রুত সময়ের মধ্যে ডাকাত দলের সদস্যদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে। এছাড়াও পাড়া-মহল্লা ও গ্রামাঞ্চলে কিছু মাদকাসক্ত তরুণ চুরির সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে স্থানীয় বাসিন্দাদেরও সচেতন ও সতর্ক থাকতে হবে। এলাকায় কাউকে সন্দেহজনক মনে হলে বা কোনো অপরাধের তথ্য পেলে তাৎক্ষণিকভাবে থানা পুলিশকে জানানোর আহ্বান জানাচ্ছি। সার্বিকভাবে দৌলতপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। অপরাধ দমনে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আশা করছি, দ্রুত পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে।
তবে দৌলতপুরবাসীর প্রত্যাশা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত টহল, গুরুত্বপূর্ণ সড়কে নজরদারি, সংঘর্ষপ্রবণ এলাকায় আগাম গোয়েন্দা তৎপরতা এবং প্রতিটি ঘটনার দ্রুত তদন্ত নিশ্চিত করা সহ রাজনৈতিক তদবির বন্ধে প্রশাসনকে আরো সক্রিয় হওয়ার আহ্বান সচতন মহলের।

কুষ্টিয়া সীমান্তে বিএসএফের পুশইন চেষ্টা, বিজিবির বাধায় ফিরে গেল ৪ জন 
সময়ের প্রত্যাশা ডেস্ক : 




















