ঢাকা , শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo কুষ্টিয়া সীমান্তে বিএসএফের পুশইন চেষ্টা, বিজিবির বাধায় ফিরে গেল ৪ জন Logo ঠাকুরগাঁওয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ও জেলা শিক্ষা অফিসের যৌথ পরিচ্ছন্নতা অভিযান Logo ১৫ বছর পর ভাঙ্গার কুমার নদে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচঃ লাখো মানুষের ঢল। Logo আলফাডাঙ্গা প্রেসক্লাবে লাইব্রেরি উদ্বোধন Logo রায়ের পর বদলে গেল গোগ্রামের পাঁচ বছরের নির্বাচনী হিসাব Logo শতবর্ষী সরকারি খাল দখলমুক্তে অভিযান, মালামাল স্পট নিলামে Logo মধুখালী থানার এএসআই শরীফুলের সাফল্য, ৬২ হারানো মোবাইল উদ্ধার Logo বিদ্যুৎ সংকটে গঙ্গাচড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সোলার-আইপিএস দিলেন জিওন Logo নরসিংদীর চরাঞ্চলে যৌথ অভিযান, অস্ত্র-গুলাবারুদ ও ১৩৬ ককটেলসহ গ্রেপ্তার ৩ Logo সারাদেশে জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস-২০২৬ পালিত
প্রতিনিধি নিয়োগ
সারা দেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আপনি আপনার এলাকায় সাংবাদিকতা পেশায় আগ্রহী হলে যোগাযোগ করুন। Hotline- +880 1728311111

একুশের চেতনা ও আমাদের দায়বদ্ধতা: ঠাকুরগাঁওয়ের আয়নায় অমর একুশে

জসীমউদ্দীন ইতি:

 

রক্তস্নাত ফাল্গুনের সেই অমর একুশে ফেব্রুয়ারি আজ আবার আমাদের দ্বারে সমাগত। ১৯৫২ সালের এই দিনে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ নাম না জানা অসংখ্য শহীদের রক্তে। সেই রক্তের ঋণে আমরা পেয়েছি আমাদের প্রাণের ভাষা—বাংলা। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যখন আমরা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করছি, তখন ঠাকুরগাঁওয়ের প্রতিটি শহীদ মিনারে উপচে পড়া ভিড় প্রমাণ করে, একুশের চেতনা আমাদের ধমনিতে আজও সমানভাবে প্রবহমান।

 

শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজ শহীদ মিনার যখন ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানের সুরে মুখরিত হয়ে ওঠে, তখন এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি হয়। জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে বীর মুক্তিযোদ্ধা, সংবাদকর্মী এবং সাধারণ মানুষের খালি পায়ে মিছিলে ছিল কেবল বিনম্র শ্রদ্ধা। রাত ১২টা ১৫ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার (বড়মাঠ) এবং ১২টা ২৫ মিনিটে ভাষা সৈনিক মরহুম দবিরুল ইসলামের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণের দৃশ্যটি ছিল এক অনন্য স্মারক। বিশেষ করে ঠাকুরগাঁওয়ের কৃতি সন্তান ভাষা সৈনিক দবিরুল ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই মাটির সন্তানরাও ভাষার লড়াইয়ে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন।

 

কিন্তু সম্পাদকীয় স্তম্ভে দাঁড়িয়ে আজ আমাদের কিছু অপ্রিয় সত্যের মুখোমুখি হতে হবে। আমরা কি কেবল একটি দিন ফুল দিয়ে এবং সাদা-কালো পোশাক পরেই আমাদের দায়িত্ব শেষ করছি?

 

বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলার যে বিকৃত রূপ আমরা দেখছি, তা উদ্বেগজনক। ইংরেজি আর বাংলার সংমিশ্রণে তৈরি ‘বাংলিশ’ সংস্কৃতি আমাদের নিজস্ব সত্তাকে গ্রাস করছে।

 

এই একটি দিন বাদে বাকি ৩৬৪ দিন আমাদের জেলার বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার শহীদ মিনারগুলোর কী অবস্থা থাকে? অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ অপরিচ্ছন্ন থাকে কিংবা সেখানে অসামাজিক কার্যকলাপ চলে। এটি ভাষা শহীদদের প্রতি চরম অবমাননা।

 

ঠাকুরগাঁওয়ের নিজস্ব একটি আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতি আছে। প্রমিত বাংলার পাশাপাশি আমাদের শেকড়ের এই ভাষাকে টিকিয়ে রাখা এবং সম্মান জানানোও একুশের চেতনার অংশ।

 

একুশ মানে কেবল শোক নয়, একুশ মানে শক্তি। এই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আমাদের ঠাকুরগাঁওকে একটি জ্ঞানভিত্তিক ও সংস্কৃতিমনা জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

 

১. সরকারি ও বেসরকারি সকল দপ্তরে বাংলার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
২. নতুন প্রজন্মের কাছে ভাষা আন্দোলনের সঠিক ইতিহাস, বিশেষ করে ঠাকুরগাঁওয়ের আঞ্চলিক অবদানের কথা তুলে ধরতে হবে।
৩. পাড়ায় পাড়ায় পাঠাগার আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে, যাতে বই পড়ার মাধ্যমে শুদ্ধ ভাষা চর্চা বাড়ে।

 

একুশের প্রথম প্রহরে ঠাকুরগাঁওয়ের রাজপথে যে জনস্রোত আমরা দেখেছি, তা যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। একুশ আমাদের শিখিয়েছে অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করতে। সেই শিক্ষাকে বুকে ধারণ করে দুর্নীতিমুক্ত, শোষণমুক্ত এবং ভাষাপ্রেমী একটি সমাজ গড়ার শপথ নিতে হবে আজ। ভাষা শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে আমাদের কলম হোক সত্যের অতন্দ্র প্রহরী।

Tag :
এই অথরের আরো সংবাদ দেখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

সরকারকে সময় না দিয়ে বিরোধিতা করছে বিরোধী দল: মনির

error: Content is protected !!

একুশের চেতনা ও আমাদের দায়বদ্ধতা: ঠাকুরগাঁওয়ের আয়নায় অমর একুশে

আপডেট টাইম : ০১:০৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
জসীমউদ্দীন ইতি, ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি :

জসীমউদ্দীন ইতি:

 

রক্তস্নাত ফাল্গুনের সেই অমর একুশে ফেব্রুয়ারি আজ আবার আমাদের দ্বারে সমাগত। ১৯৫২ সালের এই দিনে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ নাম না জানা অসংখ্য শহীদের রক্তে। সেই রক্তের ঋণে আমরা পেয়েছি আমাদের প্রাণের ভাষা—বাংলা। আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যখন আমরা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করছি, তখন ঠাকুরগাঁওয়ের প্রতিটি শহীদ মিনারে উপচে পড়া ভিড় প্রমাণ করে, একুশের চেতনা আমাদের ধমনিতে আজও সমানভাবে প্রবহমান।

 

শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজ শহীদ মিনার যখন ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানের সুরে মুখরিত হয়ে ওঠে, তখন এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি হয়। জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে বীর মুক্তিযোদ্ধা, সংবাদকর্মী এবং সাধারণ মানুষের খালি পায়ে মিছিলে ছিল কেবল বিনম্র শ্রদ্ধা। রাত ১২টা ১৫ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার (বড়মাঠ) এবং ১২টা ২৫ মিনিটে ভাষা সৈনিক মরহুম দবিরুল ইসলামের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণের দৃশ্যটি ছিল এক অনন্য স্মারক। বিশেষ করে ঠাকুরগাঁওয়ের কৃতি সন্তান ভাষা সৈনিক দবিরুল ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই মাটির সন্তানরাও ভাষার লড়াইয়ে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন।

 

কিন্তু সম্পাদকীয় স্তম্ভে দাঁড়িয়ে আজ আমাদের কিছু অপ্রিয় সত্যের মুখোমুখি হতে হবে। আমরা কি কেবল একটি দিন ফুল দিয়ে এবং সাদা-কালো পোশাক পরেই আমাদের দায়িত্ব শেষ করছি?

 

বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলার যে বিকৃত রূপ আমরা দেখছি, তা উদ্বেগজনক। ইংরেজি আর বাংলার সংমিশ্রণে তৈরি ‘বাংলিশ’ সংস্কৃতি আমাদের নিজস্ব সত্তাকে গ্রাস করছে।

 

এই একটি দিন বাদে বাকি ৩৬৪ দিন আমাদের জেলার বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার শহীদ মিনারগুলোর কী অবস্থা থাকে? অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ অপরিচ্ছন্ন থাকে কিংবা সেখানে অসামাজিক কার্যকলাপ চলে। এটি ভাষা শহীদদের প্রতি চরম অবমাননা।

 

ঠাকুরগাঁওয়ের নিজস্ব একটি আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতি আছে। প্রমিত বাংলার পাশাপাশি আমাদের শেকড়ের এই ভাষাকে টিকিয়ে রাখা এবং সম্মান জানানোও একুশের চেতনার অংশ।

 

একুশ মানে কেবল শোক নয়, একুশ মানে শক্তি। এই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আমাদের ঠাকুরগাঁওকে একটি জ্ঞানভিত্তিক ও সংস্কৃতিমনা জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

 

১. সরকারি ও বেসরকারি সকল দপ্তরে বাংলার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
২. নতুন প্রজন্মের কাছে ভাষা আন্দোলনের সঠিক ইতিহাস, বিশেষ করে ঠাকুরগাঁওয়ের আঞ্চলিক অবদানের কথা তুলে ধরতে হবে।
৩. পাড়ায় পাড়ায় পাঠাগার আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে, যাতে বই পড়ার মাধ্যমে শুদ্ধ ভাষা চর্চা বাড়ে।

 

একুশের প্রথম প্রহরে ঠাকুরগাঁওয়ের রাজপথে যে জনস্রোত আমরা দেখেছি, তা যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থাকে। একুশ আমাদের শিখিয়েছে অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করতে। সেই শিক্ষাকে বুকে ধারণ করে দুর্নীতিমুক্ত, শোষণমুক্ত এবং ভাষাপ্রেমী একটি সমাজ গড়ার শপথ নিতে হবে আজ। ভাষা শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে আমাদের কলম হোক সত্যের অতন্দ্র প্রহরী।