আব্দুল হামিদ মিঞা:
রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চকরাজাপুর ইউনিয়নে পদ্মার পানি কমলেও দেখা দিয়েছে নদীভাঙন। ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বসতভিটা, ফসলি জমিসহ বিভিন্ন গাছপালা। ঝুঁকি এড়াতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বিদ্যুতের পোল। ভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে কয়েকটি পরিবার।
নতুন করে ভাঙন দেখা দিয়েছে উপজেলার গড়গড়ি ইউনিয়নের করারী নওশারা গ্রামে। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে প্রায় দেড়শ মিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন শুরু হয়েছে। ঝুঁকি এড়াতে নদীপাড় এলাকা থেকে বিদ্যুতের ১৭টি পোল সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ভাঙনে চকরাজাপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের লক্ষ্মীনগর গ্রামে কামরুল মোল্লার বসতভিটা ও ভাঙন রোধে দেওয়া জিও ব্যাগ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
চৌমাদিয়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিজ গাজী জানান, তাঁর বসতভিটা নদীভাঙনের কবলে পড়ায় বাড়ি সরিয়ে নিয়ে বাংলা বাজার এলাকায় বসবাস করছেন।
স্থানীয়রা জানান, এবারের বন্যায় চকরাজাপুর ইউনিয়নের ১৫টি গ্রামের মধ্যে ১৩টি গ্রামই বন্যার পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল। কেউ ঘরের মাচায় আশ্রয় নিয়েছেন, কেউ গবাদিপশু নিয়ে ছুটেছেন তুলনামূলক উঁচু জায়গায়। পানি নামতে শুরু করলেও এখন ভাঙনই প্রধান সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভাঙন অব্যাহত থাকলে ইউনিয়নের চৌমাদিয়া, আতারপাড়া, কালিদাসখালীসহ কয়েকটি গ্রাম ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
এদিকে বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ। কর্মহীন হয়ে পড়া শ্রমিক ও গো-খাদ্য সংকটে চরম বিপাকে পড়েছেন চরাঞ্চলের মানুষ। বন্যার প্রভাব পড়েছে শিক্ষা জীবনেও। ৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৮টিতেই পাঠদান বন্ধ হয়ে যায়। পানি-কাদার কারণে শিক্ষার্থীরা এখনো স্কুলে ফিরতে পারেনি। এতে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
বন্যার পানিতে শুধু ঘরবাড়ি ও স্কুল নয়, তলিয়ে গেছে মানুষের কর্মসংস্থানের প্রধান জায়গা—ফসলের মাঠও। ফলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দিনমজুরেরা। কৃষিকাজ বন্ধ থাকায় আয় নেই। অনেক পরিবারের চুলায় নিয়মিত হাঁড়ি উঠছে না।
নদীভাঙনে কোনো বিদ্যালয় সরিয়ে নিতে হয়েছে, কোনোটি পরিণত হয়েছে বন্যার্তদের আশ্রয়কেন্দ্রে। আবার কোনো বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে পানি ঢুকে যাওয়ায় পাঠদান সম্ভব হয়নি।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী এবং ব্যক্তি উদ্যোগে কয়েকজনের পক্ষ থেকে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। কথা হলে দিনমজুর হাশেম আলী বলেন, ‘ত্রাণ পাওয়া বড় কথা নয়। কাজে ফিরে পরিবার নিয়ে বাঁচতে চাই।’
গবাদিপশু পালনকারীরাও রয়েছেন মহাসংকটে। মাঠ ডুবে যাওয়ায় গো-খাদ্যের সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। খড় কিনতে হচ্ছে বাড়তি দামে। স্থানীয় বাসিন্দা রাজা ব্যাপারী বলেন, ‘নিজের বসবাস ও খাবারের চেয়ে গরু-ছাগল রাখা এবং তাদের খাদ্য জোগাড় করা বেশি বিপাকে ফেলেছে। মাঠ তলিয়ে যাওয়ায় গো-খাদ্যের সংকট প্রকট। খড়ের দামও আকাশছোঁয়া।’
ইউনিয়নটির ৫ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য কালিদাসখালী গ্রামের সহিদুল ইসলাম বলেন, গত বছর জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন ব্যক্তির পক্ষ থেকে ত্রাণ সহায়তা পাওয়া গেলেও এবার তেমন সাড়া মেলেনি। সরকারি সহায়তার বাইরে এমপি, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ছাত্রদলের শামীম সরকার ও আনসার-ভিডিপির এক সদস্য শুকনো খাবার ও ওষুধ দিয়েছেন।
ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জগলু শিকদার বলেন, গত সোমবার থেকে পানি কমতে শুরু করেছে। তবে চকরাজাপুরের মানুষের দুর্ভোগ কমার কোনো লক্ষণ নেই।
প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মামুনুর রহমান জানান, নদীভাঙনের কারণে চৌমাদিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আতারপাড়া ও ফতেপুর পলাশী প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্যার্তদের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। পশ্চিম চর কালীদাসখালী, লক্ষ্মীনগর ও চর কালীদাসখালী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পানি ঢুকে যাওয়ায় ক্লাস নেওয়া সম্ভব হয়নি। বন্ধ রয়েছে চকরাজাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের পাঠদানও। ফলে ইউনিয়নের মাত্র তিনটি বিদ্যালয়ে কোনোভাবে পাঠদান চালু থাকে। যদি পদ্মার পানি বৃদ্ধি না পায়, তাহলে কাদা-পানি শুকিয়ে গেলে বিদ্যালয়ে ফিরতে পারবে শিক্ষার্থীরা।
বাঘা উপজেলা নির্বাহী অফিসার তকী ফয়সাল তালুকদার বলেন, বন্যায় আক্রান্ত এগারো শতাধিক পরিবারকে সরকারি ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ভাঙনরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তা প্রদান করা হবে বলে জানিয়েছেন ইউএনও।
জানা যায়, চকরাজাপুর ইউনিয়নে মোট ১৫টি গ্রামের লোকসংখ্যা ছিল প্রায় ২০ হাজার। বিগত কয়েক বছরের ভাঙনে লোকসংখ্যা যেমন কমেছে, তেমনি আবাদি জমির পরিমাণও কমে গেছে। অভিযোগ রয়েছে, নদীর তলদেশ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে আকস্মিক ভাঙন দেখা দেয়।
গত কয়েক বছরে পদ্মার ভাঙনে মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে চকরাজাপুর ও লক্ষ্মীনগর গ্রাম। ২০২১ সালের ভাঙনে ইউনিয়নের ৩, ৫, ৬ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বেশিরভাগ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। তখন সরিয়ে নিতে হয়েছে চকরাজাপুর ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, চেয়ারম্যানের বসতবাড়ি, কমিউনিটি ক্লিনিক ও ১১৫টি বিদ্যুতের খুঁটি।
নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর বাঘা জোনাল অফিসের ডিজিএম জানান, এবারও ভাঙনের কবলে পড়ে করারী নওশারা গ্রাম থেকে ১৭টি পোল সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে চকরাজাপুর ইউনিয়নের প্রশাসক তরিকুল ইসলাম বলেন, ভাঙনের কবলে পড়ে অনেক মানুষ চলে গিয়ে অন্যত্র বসবাস করছেন। আদমশুমারির হিসাব মতে, বর্তমানে লোকসংখ্যা এগারো হাজারের বেশি নয়।

কুষ্টিয়া সীমান্তে বিএসএফের পুশইন চেষ্টা, বিজিবির বাধায় ফিরে গেল ৪ জন 
আব্দুল হামিদ মিঞা, বাঘা (রাজশাহী) প্রতিনিধি 




















