ঢাকা , শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo ১৫ বছর পর ভাঙ্গার কুমার নদে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচঃ লাখো মানুষের ঢল। Logo আলফাডাঙ্গা প্রেসক্লাবে লাইব্রেরি উদ্বোধন Logo রায়ের পর বদলে গেল গোগ্রামের পাঁচ বছরের নির্বাচনী হিসাব Logo শতবর্ষী সরকারি খাল দখলমুক্তে অভিযান, মালামাল স্পট নিলামে Logo মধুখালী থানার এএসআই শরীফুলের সাফল্য, ৬২ হারানো মোবাইল উদ্ধার Logo বিদ্যুৎ সংকটে গঙ্গাচড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সোলার-আইপিএস দিলেন জিওন Logo নরসিংদীর চরাঞ্চলে যৌথ অভিযান, অস্ত্র-গুলাবারুদ ও ১৩৬ ককটেলসহ গ্রেপ্তার ৩ Logo সারাদেশে জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস-২০২৬ পালিত Logo সাতক্ষীরার শ্যামনগরে দুই সংখ্যালঘু পরিবারকে দেশছাড়ার হুমকি Logo নগরকান্দায় ৯৫০ পিচ ইয়াবাসহ আটক ১
প্রতিনিধি নিয়োগ
দৈনিক সময়ের প্রত্যাশা পত্রিকার জন্য সারা দেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আপনি আপনার এলাকায় সাংবাদিকতা পেশায় আগ্রহী হলে যোগাযোগ করুন। Hotline- +880 9617 179084

সেবার দোরগোড়ায় প্রশাসনঃ স্মার্ট ঠাকুরগাঁও গড়ার নেপথ্যে এক স্বচ্ছ অভিযাত্রা

জসীমউদ্দীন ইতিঃ

 

‘প্রজাতন্ত্রের কর্মীরা জনগণের সেবক’—সংবিধানের এই মহান বাণীটি কেবল সরকারি দপ্তরের দেয়ালে টাঙানো কোনো ফ্রেমবন্দি স্লোগান নয়, বরং এর সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যায় যখন একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ ছেড়ে ধুলোবালি মাখা মেঠোপথে সাধারণ মানুষের দুয়ারে দাঁড়ান। উত্তর জনপদের শান্ত ও স্নিগ্ধ জনপদ ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলায় বর্তমানে ঠিক এমন এক আশাজাগানিয়া দৃশ্যপট তৈরি হয়েছে। সরকারি সেবা আর সাধারণ মানুষের মাঝখানের যে দুর্ভেদ্য দেয়াল ছিল, তা ভাঙতে শুরু করেছে এক অনন্য প্রশাসনিক তৎপরতায়।

 

সরকারি বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুফল প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু অতীতে দেখা গেছে, সঠিক তদারকির অভাবে অনেক সময় প্রকৃত অভাবী মানুষ তালিকায় ঠাঁই পেতেন না। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কিংবা তথ্যের অসংগতিতে অনেক যোগ্য ব্যক্তি বাদ পড়ে যেতেন। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা প্রশাসন এবার সেই পুরনো প্রথা ভেঙে এক নির্ভুল ডাটাবেজ তৈরির চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে। এই ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে কারা সরকারি সহায়তার দাবিদার, তা নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এটি কেবল একটি কার্ড নয়, বরং একজন নাগরিকের রাষ্ট্রীয় সুবিধার অধিকার নিশ্চিত করার ডিজিটাল দলিল।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) খইরুল ইসলাম এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি কেবল দাপ্তরিক ফাইলে সই করেই তার দায়িত্ব শেষ মনে করছেন না। বরং কাকডাকা ভোরে বা তপ্ত দুপুরে তাকে দেখা যাচ্ছে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের দুর্গম গ্রামগুলোতে। তিনি নিজে সরাসরি মাঠে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ তদারকি করছেন। একজন ইউএনও যখন নিজে উপস্থিত থেকে সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলেন, তাদের অভাব-অভিযোগ শোনেন এবং ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য যাচাই করেন, তখন সেখানে অনিয়ম বা স্বজনপ্রীতির কোনো সুযোগ থাকে না। তার এই সশরীরে উপস্থিতি মাঠ পর্যায়ের অন্য কর্মীদের মাঝেও কাজের গতি ও দায়বদ্ধতা বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রশাসনের এই যে মানুষের কাছে যাওয়ার মানসিকতা, তা সাধারণ মানুষের মনে সরকারের প্রতি আস্থা ও ভরসা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

 

বাংলাদেশ এখন ডিজিটাল বিপ্লব পেরিয়ে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার চূড়ান্ত লক্ষ্যে ধাবমান। স্মার্ট বাংলাদেশের মূল ভিত্তি হলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নাগরিক সেবার সহজলভ্যতা। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা এই লক্ষ্যে একধাপ এগিয়ে গেছে। ফ্যামিলি কার্ডের এই ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির ফলে ভবিষ্যতে টিসিবি পণ্য বিতরণ, ওএমএস সুবিধা কিংবা অন্যান্য ত্রাণ কার্যক্রম অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হবে। এখানে একজন মানুষের তথ্য একবার নির্ভুলভাবে সংরক্ষিত হলে তাকে আর বারবার ভোগান্তিতে পড়তে হবে না। প্রযুক্তির এই সঠিক ব্যবহারই প্রমাণ করে যে, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা এখন আধুনিক ও স্মার্ট প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।

 

সদর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ। তারা আগে জানতেন সেবা পেতে হলে দপ্তরে যেতে হয়, কিন্তু এখন দেখছেন সেবাই তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাচ্ছে। গ্রামের সাধারণ মানুষ, যারা হয়তো ঠিকমতো সরকারি প্রক্রিয়াই বুঝতেন না, তারা আজ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিজেদের উঠানে দেখে আশ্বস্ত বোধ করছেন। তাদের চোখে-মুখে এখন এক ধরণের প্রাপ্তির আনন্দ এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি এক গভীর সম্মানবোধ কাজ করছে।

 

ঠাকুরগাঁও সদরের এই স্বচ্ছ ও আধুনিক উদ্যোগ কেবল একটি উপজেলার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। এটি হতে পারে সারা দেশের জন্য একটি অনুকরণীয় ‘মডেল’। যখন প্রশাসন এবং জনগণ একে অপরের পরিপূরক হয়ে কাজ করে, তখনই প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব হয়। ইউএনও খইরুল ইসলামের নেতৃত্বে যে স্বচ্ছ তদারকির সংস্কৃতি শুরু হয়েছে, তা যেন দীর্ঘস্থায়ী হয়—এটাই এই জনপদের মানুষের প্রত্যাশা। আমরা বিশ্বাস করি, এই পথ ধরেই ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা হবে আগামীর এক সমৃদ্ধ ও স্মার্ট জনপদ, যেখানে প্রতিটি নাগরিক তার প্রাপ্য অধিকার পাবে অত্যন্ত সম্মানের সাথে।

Tag :
এই অথরের আরো সংবাদ দেখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

সেভ রংপুর’ প্ল্যাটফর্মের উদ্বোধন: পরিচয় গোপন রেখে অপরাধের তথ্য দিতে পারবেন নাগরিকরা

error: Content is protected !!

সেবার দোরগোড়ায় প্রশাসনঃ স্মার্ট ঠাকুরগাঁও গড়ার নেপথ্যে এক স্বচ্ছ অভিযাত্রা

আপডেট টাইম : ০৪:৩১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
জসীমউদ্দীন ইতি, ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি :

জসীমউদ্দীন ইতিঃ

 

‘প্রজাতন্ত্রের কর্মীরা জনগণের সেবক’—সংবিধানের এই মহান বাণীটি কেবল সরকারি দপ্তরের দেয়ালে টাঙানো কোনো ফ্রেমবন্দি স্লোগান নয়, বরং এর সার্থকতা খুঁজে পাওয়া যায় যখন একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ ছেড়ে ধুলোবালি মাখা মেঠোপথে সাধারণ মানুষের দুয়ারে দাঁড়ান। উত্তর জনপদের শান্ত ও স্নিগ্ধ জনপদ ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলায় বর্তমানে ঠিক এমন এক আশাজাগানিয়া দৃশ্যপট তৈরি হয়েছে। সরকারি সেবা আর সাধারণ মানুষের মাঝখানের যে দুর্ভেদ্য দেয়াল ছিল, তা ভাঙতে শুরু করেছে এক অনন্য প্রশাসনিক তৎপরতায়।

 

সরকারি বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুফল প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু অতীতে দেখা গেছে, সঠিক তদারকির অভাবে অনেক সময় প্রকৃত অভাবী মানুষ তালিকায় ঠাঁই পেতেন না। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কিংবা তথ্যের অসংগতিতে অনেক যোগ্য ব্যক্তি বাদ পড়ে যেতেন। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা প্রশাসন এবার সেই পুরনো প্রথা ভেঙে এক নির্ভুল ডাটাবেজ তৈরির চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে। এই ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে কারা সরকারি সহায়তার দাবিদার, তা নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এটি কেবল একটি কার্ড নয়, বরং একজন নাগরিকের রাষ্ট্রীয় সুবিধার অধিকার নিশ্চিত করার ডিজিটাল দলিল।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) খইরুল ইসলাম এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি কেবল দাপ্তরিক ফাইলে সই করেই তার দায়িত্ব শেষ মনে করছেন না। বরং কাকডাকা ভোরে বা তপ্ত দুপুরে তাকে দেখা যাচ্ছে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের দুর্গম গ্রামগুলোতে। তিনি নিজে সরাসরি মাঠে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ তদারকি করছেন। একজন ইউএনও যখন নিজে উপস্থিত থেকে সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলেন, তাদের অভাব-অভিযোগ শোনেন এবং ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য যাচাই করেন, তখন সেখানে অনিয়ম বা স্বজনপ্রীতির কোনো সুযোগ থাকে না। তার এই সশরীরে উপস্থিতি মাঠ পর্যায়ের অন্য কর্মীদের মাঝেও কাজের গতি ও দায়বদ্ধতা বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রশাসনের এই যে মানুষের কাছে যাওয়ার মানসিকতা, তা সাধারণ মানুষের মনে সরকারের প্রতি আস্থা ও ভরসা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

 

বাংলাদেশ এখন ডিজিটাল বিপ্লব পেরিয়ে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার চূড়ান্ত লক্ষ্যে ধাবমান। স্মার্ট বাংলাদেশের মূল ভিত্তি হলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নাগরিক সেবার সহজলভ্যতা। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা এই লক্ষ্যে একধাপ এগিয়ে গেছে। ফ্যামিলি কার্ডের এই ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির ফলে ভবিষ্যতে টিসিবি পণ্য বিতরণ, ওএমএস সুবিধা কিংবা অন্যান্য ত্রাণ কার্যক্রম অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হবে। এখানে একজন মানুষের তথ্য একবার নির্ভুলভাবে সংরক্ষিত হলে তাকে আর বারবার ভোগান্তিতে পড়তে হবে না। প্রযুক্তির এই সঠিক ব্যবহারই প্রমাণ করে যে, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা এখন আধুনিক ও স্মার্ট প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।

 

সদর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ। তারা আগে জানতেন সেবা পেতে হলে দপ্তরে যেতে হয়, কিন্তু এখন দেখছেন সেবাই তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাচ্ছে। গ্রামের সাধারণ মানুষ, যারা হয়তো ঠিকমতো সরকারি প্রক্রিয়াই বুঝতেন না, তারা আজ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিজেদের উঠানে দেখে আশ্বস্ত বোধ করছেন। তাদের চোখে-মুখে এখন এক ধরণের প্রাপ্তির আনন্দ এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি এক গভীর সম্মানবোধ কাজ করছে।

 

ঠাকুরগাঁও সদরের এই স্বচ্ছ ও আধুনিক উদ্যোগ কেবল একটি উপজেলার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। এটি হতে পারে সারা দেশের জন্য একটি অনুকরণীয় ‘মডেল’। যখন প্রশাসন এবং জনগণ একে অপরের পরিপূরক হয়ে কাজ করে, তখনই প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব হয়। ইউএনও খইরুল ইসলামের নেতৃত্বে যে স্বচ্ছ তদারকির সংস্কৃতি শুরু হয়েছে, তা যেন দীর্ঘস্থায়ী হয়—এটাই এই জনপদের মানুষের প্রত্যাশা। আমরা বিশ্বাস করি, এই পথ ধরেই ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা হবে আগামীর এক সমৃদ্ধ ও স্মার্ট জনপদ, যেখানে প্রতিটি নাগরিক তার প্রাপ্য অধিকার পাবে অত্যন্ত সম্মানের সাথে।