ইসমাইল হোসেন বাবু, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার
গুরুর টানে, মনের মানুষের সন্ধানে আর আত্মার প্রশান্তি খুঁজতে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের আখড়াবাড়িতে সমবেত হয়েছেন সাধু, বাউল ও ভক্ত-অনুরাগীরা। তাঁদের পদচারণা, মরমি সাধনার আবহ আর লালনের গানের আকর্ষণে মুখর হয়ে উঠেছে সাইজির বারামখানা।
লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী সাধু সংঘ ও লালন স্মরণোৎসবকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছেন তাঁর অনুসারীরা। কেউ এসেছেন গুরুর স্মরণে, কেউ সাধুসঙ্গে অংশ নিতে, আবার কেউ লালনের দর্শন ও মরমি গানের মধ্য দিয়ে আত্মিক প্রশান্তি খুঁজতে।
ছেঁউড়িয়ার এই সাধনভূমিতে এসে একে অন্যের সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদান করছেন সাধু-বাউলরা। লালনের গান, দর্শন ও সাধনপদ্ধতি নিয়ে তাঁদের মধ্যে তৈরি হয়েছে এক আত্মিক সংযোগ। ভক্তদের কাছে এই মিলন কেবল উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং গুরু-পরম্পরা ও সাধনার ধারাকে ধারণ করার উপলক্ষ।
কারও কাছে ছেঁউড়িয়া গুরুর স্মৃতিবিজড়িত সাধনভূমি, কারও কাছে আত্মার খোঁজে ফিরে আসার ঠিকানা। আবার কারও কাছে লালনের গান ও দর্শনের মধ্য দিয়ে মানুষকে নতুন করে চেনার জায়গা। তাই দূরত্বের হিসাব নয়, ভক্তির টানেই তাঁদের এই ছুটে আসা।
লালনের স্মৃতিধন্য আখড়াবাড়িকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে সাধুসঙ্গের আবহ। ভক্তদের আগমন, মরমি গানের আকর্ষণ আর গুরুকে স্মরণের প্রস্তুতিতে উৎসবকে ঘিরে তৈরি হয়েছে প্রাণচাঞ্চল্য।
লালন গবেষক ফকির হৃদয় সাঁই লালনসংগীতের তাৎপর্য তুলে ধরে বলেন, “সাঁইজি তাঁর ভক্তের উদ্দেশে বলেছেন, ‘তিন পোড়াতেও খাঁটি হইলি না।’ তাঁর ভক্তরা সেই কথার মর্মার্থ বুঝতে পারেননি। এসবই সাঁইজির সত্যবাণী, যা তিনি তাঁর ভক্তকুলের জন্য রেখে গেছেন।”
তিনি মনে করেন, লালনের গানের প্রতিটি বাণীর গভীরে রয়েছে জীবনবোধ, আত্মজিজ্ঞাসা ও সাধনার তাৎপর্য। এসব গানের মর্মার্থ উপলব্ধি করতে পারলেই লালন দর্শনের প্রকৃত শিক্ষা অনুধাবন করা সম্ভব।
যশোর থেকে আসা ফকির পরিতোষ বাউল লালন সাঁইয়ের প্রতি গভীর অনুরাগ থেকে যশোর থেকে ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে এসেছেন। সাধু সংঘে অংশ নিয়ে তিনি লালনের স্মৃতিবিজড়িত এই সাধনভূমিতে সাধু-ভক্তদের সঙ্গে মিলিত হয়েছেন। তিনি বলেন, সাধুসঙ্গের মূল আকর্ষণ শুধু গান নয়, ভাবের আদান-প্রদানও। লালনের গান ও দর্শনকে কেন্দ্র করে সাধক-অনুসারীরা আত্মজিজ্ঞাসা, মানবপ্রেম এবং জীবনবোধ নিয়ে আলোচনা করেন। গুরুর প্রতি ভক্তি তাঁদের এক সূত্রে বাঁধে।
লালন সাঁই তাঁর গান ও দর্শনে মানুষে মানুষে বিভেদ ভুলে মানবপ্রেম, আত্মজিজ্ঞাসা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর সেই দর্শনের টানেই আজও ছেঁউড়িয়ায় সমবেত হন নানা শ্রেণি-পেশা ও অঞ্চলের মানুষ।
সাধু-বাউলদের কাছে সাইজির বারামখানা তাই শুধু একটি স্মৃতিবিজড়িত স্থান নয়, এটি গুরু-পরম্পরা, সাধনা ও আত্মিক মিলনের এক বিশেষ ক্ষেত্র। লালনের তিরোধান দিবসের এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছেও তাঁর গান, দর্শন ও মানবতার বাণী পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
লালনের স্মৃতিধন্য ছেঁউড়িয়ায় এখন সাধু-ভক্তদের মিলনমেলা। গুরুর প্রতি ভক্তি, মরমি গানের আবেশ আর ভাবের আদান-প্রদানে মুখর হয়ে উঠেছে সাইজির বারামখানা।
আজ শনিবার (১৭ অক্টোবর) বিকেলে আনুষ্ঠানিকভাবে উৎসবের উদ্বোধন করবেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী।
১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর (১২৯৭ বঙ্গাব্দের পহেলা কার্তিক) কুমারখালী উপজেলার চাপড়া ইউনিয়নের ছেঁউড়িয়া গ্রামে ফকির লালন শাহ দেহত্যাগ করেন। এজন্য প্রতিবছর পহেলা কার্তিক বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ এর তিরোধান দিবসের আয়োজন করে লালন একাডেমি।

কুষ্টিয়া সীমান্তে বিএসএফের পুশইন চেষ্টা, বিজিবির বাধায় ফিরে গেল ৪ জন 
সময়ের প্রত্যাশা ডেস্ক : 



























