ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo কুষ্টিয়া সীমান্তে বিএসএফের পুশইন চেষ্টা, বিজিবির বাধায় ফিরে গেল ৪ জন Logo ঠাকুরগাঁওয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ও জেলা শিক্ষা অফিসের যৌথ পরিচ্ছন্নতা অভিযান Logo ১৫ বছর পর ভাঙ্গার কুমার নদে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচঃ লাখো মানুষের ঢল। Logo আলফাডাঙ্গা প্রেসক্লাবে লাইব্রেরি উদ্বোধন Logo রায়ের পর বদলে গেল গোগ্রামের পাঁচ বছরের নির্বাচনী হিসাব Logo শতবর্ষী সরকারি খাল দখলমুক্তে অভিযান, মালামাল স্পট নিলামে Logo মধুখালী থানার এএসআই শরীফুলের সাফল্য, ৬২ হারানো মোবাইল উদ্ধার Logo বিদ্যুৎ সংকটে গঙ্গাচড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সোলার-আইপিএস দিলেন জিওন Logo নরসিংদীর চরাঞ্চলে যৌথ অভিযান, অস্ত্র-গুলাবারুদ ও ১৩৬ ককটেলসহ গ্রেপ্তার ৩ Logo সারাদেশে জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস-২০২৬ পালিত
প্রতিনিধি নিয়োগ
সারা দেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আপনি আপনার এলাকায় সাংবাদিকতা পেশায় আগ্রহী হলে যোগাযোগ করুন। Hotline- +880 1728311111

তানোরে বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী পিতল-কাঁসা শিল্প

আলিফ হোসেন:

 

রাজশাহীর তানোরে আধুনিকতার ছোঁয়া ও কালের বিবর্তনে বিলুপ্তির পথে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য পিতল কাঁসা শিল্প।

 

উপজেলার মুন্ডুমালা-চৌবাড়িয়া ও গোল্লাপাড়া হাট কাঁসা-পিতলের জন্য বিখ্যাত ছিল। এসব হাটে ‘কাঁসা পট্টি’ নামে পৃথক পট্টি ছিলো। হাটবারে সেখানে কাঁসা-পিতল ব্যবসায়ীরা সারিবদ্ধভাবে কাঁসা-পিতলের পসরা নিয়ে বসতেন।

 

জানা গেছে, উপজেলায় বিয়ে, বৌভাত ও সুন্নতে খাতনা ইত্যাদি সামাজিক অনুষ্ঠানে কাঁসা-পিতলের জিনিসপত্র উপহার দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। পিতল-কাঁসার নিখুঁত নকশার এসব তৈজসপত্র ওজন ও নকশা দিয়ে মূল্যায়ন হতো।

 

ওই সময় শুধু দেশে নয়, দেশের বাইরেও ছিল এর প্রচুর চাহিদা। এছাড়া পর্যটকরা একসময়ে কাঁসা-পিতলের মধ্যে কারুকাজ খচিত বিভিন্ন দেব-দেবী ও জীবজন্তুর প্রতিকৃতি জিনিসপত্রগুলো নিয়ে যেতো।

 

এক সময়ে গোল্লাপাড়া বাজারের কাঁসা, তামা ও পিতল শিল্পের খুব সুনাম ছিলো। বিয়েসহ সব সামাজিক অনুষ্ঠানে উপহার হিসেবে পিতল-কাঁসার জিনিসপত্র দেওয়া হতো।

 

আবার উপহার পাওয়া এসব জিনিসপত্র পুরাতন হয়ে গেলে বাজারে নিয়ে পলিশ (ছিলে) করিয়ে আবার নতুনের মতো চকচকে করা হতো। দেখে বোঝার উপায় থাকত না যে এটি পুরাতন ছিল। পলিশ করানো পিতলের জিনিসপত্র পুনরায় অন্যত্র সামাজিক অনুষ্ঠানে উপহার হিসেবে দেওয়া হতো।

 

এক সময় গোল্লাপাড়া মহল্লার আব্দুল আজিজ, হাদু ও ভদু মন্ডলসহ কয়েকটি পরিবার ছিল এই পিতল-কাঁসা নির্ভর। পিতল-কাঁসার ব্যবসা করে তারা জীবিকা নির্বাহ করতেন।

 

জানা যায়, ১৫৭৬ থেকে ১৭৫৭ সালে মোগল শাসনামলে এদেশে তামা, কাঁসা ও পিতলের ব্যবহার শুরু হয়। এসব ধাতু দিয়ে তারা ঢাল, তলোয়ার, তীর, ধনুক, বন্দুক এবং কামান তৈরি করতেন।

 

ব্রিটিশ শাসনামলে এই শিল্পের প্রসার ঘটে এবং বাংলার ঘরে ঘরে এর ব্যবহার শুরু হয়। শুধু তাই নয়, বিত্তশালী পরিবারগুলোতে এসব পণ্য খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সেই সুবাদে এই শিল্পের ছোট-বড় অনেক কারখানা গড়ে ওঠে।

 

শত শত বছর ধরে গ্রাম বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে থালা, বাসন, কলস, জগ, বদনা ও গৃহস্থালির নানা কাজে ব্যবহার হত কাঁসা-পিতলের তৈরি সামগ্রী। এমনকি জমিদাররাও ব্যবহার করতেন এ ধরনের তৈজসপত্র।

 

বিভিন্ন ধরনের সৌখিন সামগ্রী হিসেবে সকলের গৃহে শোভা পেত কাঁসা-পিতলের তৈরি মনোমুগ্ধকর সামগ্রী। এমনি করে সকলের কাছে এর যথেষ্ট কদর ছিল।

 

নিত্য নতুন সিরামিক, মেলামাইন, কাঁচ ইত্যাদির সামগ্রী সহজলভ্য হওয়ায় মানুষ পিতল-কাঁসার ব্যবহার একেবারেই কমিয়ে দিয়েছেন।

 

নিকট অতীতেও পিতল-কাঁসা সামগ্রী গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে নিত্য ব্যবহৃত সামগ্রী হিসেবে দেখা যেতো। বর্তমানে আধুনিকতার ছোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসবের ব্যবহারে ভাটা পড়েছে।

 

কোকারিজ ব্যবসায়ী আলামিন আলী ও ইসলাম বলেন, “৯০ দশকে বিয়ে-সাদি, সামাজিক সব অনুষ্ঠানে পিতলের কলস, পান দান ডেক ও কাঁসার জিনিসপত্র উপহার দিতো। এখন বিয়ে-সাদিতে ডিনার সেট ও কাঁচের জিনিসপত্র উপহার হিসেবে দেওয়া হয়। এখন আর কাঁসা-পিতলের কদর নেই, তাই অনেক আগেই কাঁসা-পিতলের জিনিসপত্রের ব্যবসা বন্ধ করে দিছি।”

 

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে— তামা, কাঁসা ও পিতলের পণ্যের ব্যবহার কমে যাওয়া, মূল্য বৃদ্ধি পাওয়া এবং কারিগরদের পেশা বদলের ফলে এ শিল্প এখন বিলুপ্তপ্রায়।

 

অপরদিকে আধুনিক, বৈচিত্র্যময় ও স্বল্প মূল্যের প্লাস্টিক এবং মেলামাইনের পণ্যসামগ্রীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকতে পারছে না এই শিল্প।

 

এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পের সঙ্গে জড়িত শিল্প ও ব্যবসায়ীরা মন্দা গতির কারণে অন্য ব্যবসায় চলে গেছেন। ফলে আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী কাঁসা, তামা ও পিতল শিল্প এখন বিলুপ্তির পথে।

Tag :
এই অথরের আরো সংবাদ দেখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

এপস্টিনের সঙ্গে ভারতের মন্ত্রী পুরির বৈঠকের ছবি প্রকাশ্যে, সরব বিরোধীরা

error: Content is protected !!

তানোরে বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী পিতল-কাঁসা শিল্প

আপডেট টাইম : ০৯:৩৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ জুলাই ২০২৫
আলিফ হোসেন, তানোর (রাজশাহী) প্রতিনিধি :

আলিফ হোসেন:

 

রাজশাহীর তানোরে আধুনিকতার ছোঁয়া ও কালের বিবর্তনে বিলুপ্তির পথে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য পিতল কাঁসা শিল্প।

 

উপজেলার মুন্ডুমালা-চৌবাড়িয়া ও গোল্লাপাড়া হাট কাঁসা-পিতলের জন্য বিখ্যাত ছিল। এসব হাটে ‘কাঁসা পট্টি’ নামে পৃথক পট্টি ছিলো। হাটবারে সেখানে কাঁসা-পিতল ব্যবসায়ীরা সারিবদ্ধভাবে কাঁসা-পিতলের পসরা নিয়ে বসতেন।

 

জানা গেছে, উপজেলায় বিয়ে, বৌভাত ও সুন্নতে খাতনা ইত্যাদি সামাজিক অনুষ্ঠানে কাঁসা-পিতলের জিনিসপত্র উপহার দেওয়ার রেওয়াজ ছিল। পিতল-কাঁসার নিখুঁত নকশার এসব তৈজসপত্র ওজন ও নকশা দিয়ে মূল্যায়ন হতো।

 

ওই সময় শুধু দেশে নয়, দেশের বাইরেও ছিল এর প্রচুর চাহিদা। এছাড়া পর্যটকরা একসময়ে কাঁসা-পিতলের মধ্যে কারুকাজ খচিত বিভিন্ন দেব-দেবী ও জীবজন্তুর প্রতিকৃতি জিনিসপত্রগুলো নিয়ে যেতো।

 

এক সময়ে গোল্লাপাড়া বাজারের কাঁসা, তামা ও পিতল শিল্পের খুব সুনাম ছিলো। বিয়েসহ সব সামাজিক অনুষ্ঠানে উপহার হিসেবে পিতল-কাঁসার জিনিসপত্র দেওয়া হতো।

 

আবার উপহার পাওয়া এসব জিনিসপত্র পুরাতন হয়ে গেলে বাজারে নিয়ে পলিশ (ছিলে) করিয়ে আবার নতুনের মতো চকচকে করা হতো। দেখে বোঝার উপায় থাকত না যে এটি পুরাতন ছিল। পলিশ করানো পিতলের জিনিসপত্র পুনরায় অন্যত্র সামাজিক অনুষ্ঠানে উপহার হিসেবে দেওয়া হতো।

 

এক সময় গোল্লাপাড়া মহল্লার আব্দুল আজিজ, হাদু ও ভদু মন্ডলসহ কয়েকটি পরিবার ছিল এই পিতল-কাঁসা নির্ভর। পিতল-কাঁসার ব্যবসা করে তারা জীবিকা নির্বাহ করতেন।

 

জানা যায়, ১৫৭৬ থেকে ১৭৫৭ সালে মোগল শাসনামলে এদেশে তামা, কাঁসা ও পিতলের ব্যবহার শুরু হয়। এসব ধাতু দিয়ে তারা ঢাল, তলোয়ার, তীর, ধনুক, বন্দুক এবং কামান তৈরি করতেন।

 

ব্রিটিশ শাসনামলে এই শিল্পের প্রসার ঘটে এবং বাংলার ঘরে ঘরে এর ব্যবহার শুরু হয়। শুধু তাই নয়, বিত্তশালী পরিবারগুলোতে এসব পণ্য খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সেই সুবাদে এই শিল্পের ছোট-বড় অনেক কারখানা গড়ে ওঠে।

 

শত শত বছর ধরে গ্রাম বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে থালা, বাসন, কলস, জগ, বদনা ও গৃহস্থালির নানা কাজে ব্যবহার হত কাঁসা-পিতলের তৈরি সামগ্রী। এমনকি জমিদাররাও ব্যবহার করতেন এ ধরনের তৈজসপত্র।

 

বিভিন্ন ধরনের সৌখিন সামগ্রী হিসেবে সকলের গৃহে শোভা পেত কাঁসা-পিতলের তৈরি মনোমুগ্ধকর সামগ্রী। এমনি করে সকলের কাছে এর যথেষ্ট কদর ছিল।

 

নিত্য নতুন সিরামিক, মেলামাইন, কাঁচ ইত্যাদির সামগ্রী সহজলভ্য হওয়ায় মানুষ পিতল-কাঁসার ব্যবহার একেবারেই কমিয়ে দিয়েছেন।

 

নিকট অতীতেও পিতল-কাঁসা সামগ্রী গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে নিত্য ব্যবহৃত সামগ্রী হিসেবে দেখা যেতো। বর্তমানে আধুনিকতার ছোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসবের ব্যবহারে ভাটা পড়েছে।

 

কোকারিজ ব্যবসায়ী আলামিন আলী ও ইসলাম বলেন, “৯০ দশকে বিয়ে-সাদি, সামাজিক সব অনুষ্ঠানে পিতলের কলস, পান দান ডেক ও কাঁসার জিনিসপত্র উপহার দিতো। এখন বিয়ে-সাদিতে ডিনার সেট ও কাঁচের জিনিসপত্র উপহার হিসেবে দেওয়া হয়। এখন আর কাঁসা-পিতলের কদর নেই, তাই অনেক আগেই কাঁসা-পিতলের জিনিসপত্রের ব্যবসা বন্ধ করে দিছি।”

 

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে— তামা, কাঁসা ও পিতলের পণ্যের ব্যবহার কমে যাওয়া, মূল্য বৃদ্ধি পাওয়া এবং কারিগরদের পেশা বদলের ফলে এ শিল্প এখন বিলুপ্তপ্রায়।

 

অপরদিকে আধুনিক, বৈচিত্র্যময় ও স্বল্প মূল্যের প্লাস্টিক এবং মেলামাইনের পণ্যসামগ্রীর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকতে পারছে না এই শিল্প।

 

এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পের সঙ্গে জড়িত শিল্প ও ব্যবসায়ীরা মন্দা গতির কারণে অন্য ব্যবসায় চলে গেছেন। ফলে আবহমান বাংলার ঐতিহ্যবাহী কাঁসা, তামা ও পিতল শিল্প এখন বিলুপ্তির পথে।