ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo কুষ্টিয়া সীমান্তে বিএসএফের পুশইন চেষ্টা, বিজিবির বাধায় ফিরে গেল ৪ জন Logo ঠাকুরগাঁওয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ও জেলা শিক্ষা অফিসের যৌথ পরিচ্ছন্নতা অভিযান Logo ১৫ বছর পর ভাঙ্গার কুমার নদে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচঃ লাখো মানুষের ঢল। Logo আলফাডাঙ্গা প্রেসক্লাবে লাইব্রেরি উদ্বোধন Logo রায়ের পর বদলে গেল গোগ্রামের পাঁচ বছরের নির্বাচনী হিসাব Logo শতবর্ষী সরকারি খাল দখলমুক্তে অভিযান, মালামাল স্পট নিলামে Logo মধুখালী থানার এএসআই শরীফুলের সাফল্য, ৬২ হারানো মোবাইল উদ্ধার Logo বিদ্যুৎ সংকটে গঙ্গাচড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সোলার-আইপিএস দিলেন জিওন Logo নরসিংদীর চরাঞ্চলে যৌথ অভিযান, অস্ত্র-গুলাবারুদ ও ১৩৬ ককটেলসহ গ্রেপ্তার ৩ Logo সারাদেশে জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস-২০২৬ পালিত
প্রতিনিধি নিয়োগ
দৈনিক সময়ের প্রত্যাশা পত্রিকার জন্য সারা দেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আপনি আপনার এলাকায় সাংবাদিকতা পেশায় আগ্রহী হলে যোগাযোগ করুন। Hotline- +880 9617 179084

মহম্মদপুরের জমিদার বাড়ি ও নীলকুঠি

ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী

মো. কামরুল হাসান:

 

মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের রাড়িখালী গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো জমিদার উদয় চৌধুরীর জরাজীর্ণ প্রাসাদ। নবগঙ্গা নদীর তীরে বিস্তৃত ২০০ বিঘা জমির উপর প্রতিষ্ঠিত এই বাড়ি একসময় ছিল বিশাল ধন-সম্পদের ভাণ্ডার। উদয় চৌধুরী ছিলেন তৎকালীন এ অঞ্চলের অন্যতম ধনী জমিদার। কালের আবর্তে এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জমিদার বাড়িটির অস্তিত্ব আজ বিলীনের পথে।

 

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এই বাড়িতে ঘটে ব্যাপক লুটপাট। অর্থ-সম্পদ, স্বর্ণালঙ্কারসহ মূল্যবান সামগ্রী লুট হয়ে যায়। তবে আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে উদয় চৌধুরীর কাচারিঘর। এ প্রাচীন স্থাপত্য শুধু একটি পুরোনো বাড়ি নয়, এটি বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের অমূল্য নিদর্শন।

 

অন্যদিকে, মহম্মদপুরের বাবুখালিতে দাঁড়িয়ে আছে আরেকটি ঐতিহাসিক স্থাপনা—নীলকুঠি। উনিশ শতকে ইংরেজ বণিকদের নীল চাষ ও শোষণ-অত্যাচারের সাক্ষী এই স্থাপনাটি। ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবের সময় বস্ত্রশিল্পে নীলের চাহিদা বেড়ে গেলে বাংলার কৃষকদের উৎকৃষ্ট জমিতে জোরপূর্বক নীল চাষ করতে বাধ্য করা হতো। দাদন বা অগিম টাকা দিয়ে কৃষকদের দিয়ে নেওয়া হতো চুক্তিপত্র, যা আসলে ছিল দাসত্বের শৃঙ্খল। চুক্তি অনুযায়ী কাজ না করলে চালানো হতো অকথ্য নির্যাতন। কৃষকেরা নিজেদের জমিতেই হয়ে উঠেছিল ভূমিদাসে।

 

এই শোষণের বিরুদ্ধে কৃষকের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে ১৮৫৯ সালে। বাংলায় শুরু হয় কৃষক বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে কৃষকের আত্মমর্যাদা রক্ষার এক জ্বলন্ত উদাহরণ, যা নীলকরদের একাধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল। আজও বাবুখালির নীলকুঠি সেই সংগ্রামের ইতিহাস নীরবে স্মরণ করিয়ে দেয়।

 

বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা এসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আমাদের হাজার বছরের ইতিহাস ও জাতিসত্তার বিকাশের সাক্ষ্য বহন করছে। রাড়িখালীর জমিদার বাড়ি কিংবা বাবুখালির নীলকুঠির প্রতিটি স্থাপনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কীভাবে সময়ের প্রবাহে এগুলো হয়ে উঠেছে ঐতিহ্যের নীরব দলিল এবং ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ।

 

রাড়িখালী গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা মনমোহন সিংহ বলেন, “জমিদার বাড়ির ইতিহাস প্রায় মুছে যাবার পথে। এখানের অধিকাংশ ইট-পাথর চুরি হয়ে গেছে।”

 

বাবুখালি আফতাব উদ্দীন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রতন আলী খান বলেন, “শত বছরের পুরনো নীলকুঠি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। তবুও দুরাগত মানুষ এটিকে দেখতে এখনো আসে।”

 

উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহিনুর আক্তার বলেন, “উপজেলা সদরের রাজা সীতরাম রায়ের রাজবাড়িটি পরিষদের অর্থায়নে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের মাধ্যমে সংস্কার করে দর্শনীয় স্থানে পরিণত করা হয়েছে। তবে জমিদার বাড়ি এবং নীলকুঠির সংস্কার করার মত অবস্থা না থাকায় এ দুটি স্থাপনা নিয়ে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।”

Tag :
এই অথরের আরো সংবাদ দেখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজশাহীর কেশরহাটে বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা পেলেন ১৭০০ অসহায় মানুষ; উদ্যোক্তাদের প্রশংসায় এলাকাবাসী

error: Content is protected !!

মহম্মদপুরের জমিদার বাড়ি ও নীলকুঠি

ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী

আপডেট টাইম : ০৫:০৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৫
মো. কামরুল হাসান, মহম্মদপুর (মাগুরা) প্রতিনিধি :

মো. কামরুল হাসান:

 

মাগুরা জেলার মহম্মদপুর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের রাড়িখালী গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো জমিদার উদয় চৌধুরীর জরাজীর্ণ প্রাসাদ। নবগঙ্গা নদীর তীরে বিস্তৃত ২০০ বিঘা জমির উপর প্রতিষ্ঠিত এই বাড়ি একসময় ছিল বিশাল ধন-সম্পদের ভাণ্ডার। উদয় চৌধুরী ছিলেন তৎকালীন এ অঞ্চলের অন্যতম ধনী জমিদার। কালের আবর্তে এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জমিদার বাড়িটির অস্তিত্ব আজ বিলীনের পথে।

 

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এই বাড়িতে ঘটে ব্যাপক লুটপাট। অর্থ-সম্পদ, স্বর্ণালঙ্কারসহ মূল্যবান সামগ্রী লুট হয়ে যায়। তবে আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে উদয় চৌধুরীর কাচারিঘর। এ প্রাচীন স্থাপত্য শুধু একটি পুরোনো বাড়ি নয়, এটি বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের অমূল্য নিদর্শন।

 

অন্যদিকে, মহম্মদপুরের বাবুখালিতে দাঁড়িয়ে আছে আরেকটি ঐতিহাসিক স্থাপনা—নীলকুঠি। উনিশ শতকে ইংরেজ বণিকদের নীল চাষ ও শোষণ-অত্যাচারের সাক্ষী এই স্থাপনাটি। ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লবের সময় বস্ত্রশিল্পে নীলের চাহিদা বেড়ে গেলে বাংলার কৃষকদের উৎকৃষ্ট জমিতে জোরপূর্বক নীল চাষ করতে বাধ্য করা হতো। দাদন বা অগিম টাকা দিয়ে কৃষকদের দিয়ে নেওয়া হতো চুক্তিপত্র, যা আসলে ছিল দাসত্বের শৃঙ্খল। চুক্তি অনুযায়ী কাজ না করলে চালানো হতো অকথ্য নির্যাতন। কৃষকেরা নিজেদের জমিতেই হয়ে উঠেছিল ভূমিদাসে।

 

এই শোষণের বিরুদ্ধে কৃষকের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে ১৮৫৯ সালে। বাংলায় শুরু হয় কৃষক বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে কৃষকের আত্মমর্যাদা রক্ষার এক জ্বলন্ত উদাহরণ, যা নীলকরদের একাধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল। আজও বাবুখালির নীলকুঠি সেই সংগ্রামের ইতিহাস নীরবে স্মরণ করিয়ে দেয়।

 

বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা এসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আমাদের হাজার বছরের ইতিহাস ও জাতিসত্তার বিকাশের সাক্ষ্য বহন করছে। রাড়িখালীর জমিদার বাড়ি কিংবা বাবুখালির নীলকুঠির প্রতিটি স্থাপনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কীভাবে সময়ের প্রবাহে এগুলো হয়ে উঠেছে ঐতিহ্যের নীরব দলিল এবং ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ।

 

রাড়িখালী গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা মনমোহন সিংহ বলেন, “জমিদার বাড়ির ইতিহাস প্রায় মুছে যাবার পথে। এখানের অধিকাংশ ইট-পাথর চুরি হয়ে গেছে।”

 

বাবুখালি আফতাব উদ্দীন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রতন আলী খান বলেন, “শত বছরের পুরনো নীলকুঠি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। তবুও দুরাগত মানুষ এটিকে দেখতে এখনো আসে।”

 

উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহিনুর আক্তার বলেন, “উপজেলা সদরের রাজা সীতরাম রায়ের রাজবাড়িটি পরিষদের অর্থায়নে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের মাধ্যমে সংস্কার করে দর্শনীয় স্থানে পরিণত করা হয়েছে। তবে জমিদার বাড়ি এবং নীলকুঠির সংস্কার করার মত অবস্থা না থাকায় এ দুটি স্থাপনা নিয়ে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।”