জসীমউদ্দীন ইতি:
ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর উপজেলার প্রকৃতি এখন সাদা ফুলের মায়ায় ঢাকা। বসন্তের এই সময়ে প্রতিটি সজনে গাছে থোকায় থোকায় ফুটে থাকা ফুলগুলো কেবল নয়ন জুড়ানো দৃশ্য নয়, বরং এটি আমাদের স্থানীয় কৃষি অর্থনীতির জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার বার্তাও বটে। আবহমান কাল ধরে সজনেকে আমরা বাড়ির আঙিনায় বা পথের ধারে অযত্ন-অবহেলায় বেড়ে ওঠা একটি সাধারণ গাছ হিসেবেই দেখে এসেছি। কিন্তু বর্তমানের পুষ্টিবিজ্ঞানের যুগে দাঁড়িয়ে এই গাছটি এখন কেবল সবজি নয়, বরং এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী ‘সুপারফুড’ বা ‘জাদুকরী উদ্ভিদ’ হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি পেয়েছে। হরিপুরের মাটি ও আবহাওয়া যে সজনে চাষের জন্য কতটা আশীর্বাদপুষ্ট, তা চলতি মৌসুমে গাছের ডালপালাজুড়ে থাকা ফুলের প্রাচুর্যই প্রমাণ করে।
পুষ্টিবিদদের মতে, সজনে গাছ—বৈজ্ঞানিক নাম Moringa oleifera—প্রকৃতির এক অনন্য দান। অ্যানেমিয়া বা রক্তস্বল্পতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ কিংবা হাড়ের ব্যথাসহ আধুনিক জীবনযাত্রার অসংখ্য জটিল রোগের মহৌষধ লুকিয়ে আছে এই গাছের ডাটা ও পাতায়। দক্ষিণ আফ্রিকায় একে ‘মিরাকল ট্রি’ বা জাদুকরী গাছ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দুধের চেয়ে বেশি ক্যালসিয়াম, কলার চেয়ে বেশি পটাশিয়াম এবং কমলার চেয়েও বেশি ভিটামিন সি বিদ্যমান এই সজনেতে। আমাদের গ্রামীণ জনপদে যেখানে অপুষ্টি এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে সজনে হতে পারে পুষ্টি নিরাপত্তার সবচেয়ে সস্তা ও কার্যকর সমাধান। অথচ আমরা এখনো এর প্রকৃত গুণাগুণকে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে পারিনি।
হরিপুর উপজেলার বর্তমান চিত্রটি আশাব্যঞ্জক। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, সজনে চাষকে কেবল ‘মৌসুমি শখ’ বা ‘বাড়ির পাশের গাছ’ হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। একে বাণিজ্যিক রূপ দেওয়ার সময় এসেছে। আমাদের কৃষি বিভাগ, স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা এবং উদ্যোক্তাদের যৌথ উদ্যোগে সজনেকে একটি পরিকল্পিত চাষাবাদ পদ্ধতির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। যেহেতু এটি লবণ সহিষ্ণু এবং অত্যন্ত কম পরিচর্যায় বেড়ে ওঠে, তাই অন্যান্য শস্যের অনুপযোগী জমিগুলোতেও সজনে চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।
করণীয় কৌশলগত পদক্ষেপ
প্রথমত, প্রসেসিং ও ভ্যালু অ্যাডিশন:
সজনে কেবল সবজি হিসেবে বিক্রি না করে, এর পাতা শুকিয়ে পাউডার তৈরি বা প্রক্রিয়াজাত করার ক্ষুদ্র কুটির শিল্প গড়ে তুলতে হবে। সজনে পাতার পাউডারের আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে, যা স্থানীয় কৃষকদের আয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
দ্বিতীয়ত, কৃষি গবেষণার প্রসার:
স্থানীয় কৃষি বিভাগকে হরিপুরের মাটি অনুযায়ী উচ্চ ফলনশীল জাতের সজনে সম্প্রসারণে কৃষকদের কারিগরি সহায়তা দিতে হবে। আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করলে ফলন ও মান দুই-ই বৃদ্ধি পাবে।
তৃতীয়ত, সচেতনতা সৃষ্টি:
তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের পুষ্টি সচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রচারণা চালাতে হবে। সজনে যে কেবল একটি সবজি নয়, বরং পরিবারের স্বাস্থ্যরক্ষার বড় অবলম্বন—এই ধারণাটি প্রতিটি পরিবারে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন।
চতুর্থত, বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা:
কৃষকরা যেন ন্যায্যমূল্য পায়, সেজন্য স্থানীয় বাজারগুলোতে সজনার জন্য একটি স্থিতিশীল বিপণন ব্যবস্থা বা সমবায়ভিত্তিক বিক্রয় কেন্দ্র গড়ে তোলা জরুরি।
পরিশেষে, ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুরের এই সজনে ফুল কেবল বসন্তের সৌন্দর্য নয়, এটি আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতির নতুন দিনের হাতছানি। যদি পরিকল্পনা ও উদ্যোগের সমন্বয় ঘটে, তবে হরিপুর অদূর ভবিষ্যতে সজনে উৎপাদনে সারা দেশে মডেল হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সজনে হোক ঠাকুরগাঁওয়ের অর্থনৈতিক বিপ্লবের এক নতুন দিগন্ত। সময় এসেছে এই ‘সবুজ সোনা’কে অবহেলা না করে, একে জাতীয় সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার।
প্রিন্ট

কুষ্টিয়ায় মাদক সেবনের টাকা না পেয়ে বসতঘরে আগুন 
জসীমউদ্দীন ইতি, ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি 




















