আব্দুল হামিদ মিঞা:
প্রবাদ আছে, স্বামী যাকে দেখতে পারেন না ‘রাখালেও তাকে ঢিল মারে’। এই প্রবাদের সঙ্গে মিল রয়েছে ৫৫ বছর বয়সী তাসলিমা বেগমের জীবনের। ৩৯ বছরের সংসার জীবনেও তার কপালে জোটেনি সুখ। বর্তমানে তিনি মেয়ের আশ্রয়ে অসহায় জীবনযাপন করছেন।
জানা যায়, তাসলিমা বেগম নানা রোগে জর্জরিত। স্বামী ও দুই ছেলে থাকা সত্ত্বেও তারা তার দেখভাল করছেন না বলে অভিযোগ। বড় মেয়ে মারহুমা ফেদৌস শিল্পী খাতুন স্বামী পরিত্যক্তা। দুই মেয়ে নিয়ে ভাড়া বাসায় বসবাস করেন তিনি। সন্তানদের লেখাপড়া ও বাসা ভাড়ার খরচ সামলে নিজেই থাকেন চরম টানাপোড়েনে। এর মধ্যেও মায়ের অসহায়ত্ব দেখে তাকে নিজের ভাড়া বাসায় এনে সেবা-শুশ্রূষা করছেন। এতে তার সংসারে আরও আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। মায়ের চিকিৎসার ব্যয়ভার মেটাতে সম্প্রতি ২০ হাজার টাকা ঋণ নিতে হয়েছে তাকে। শিল্পী খাতুন বাঘা পৌরসভার বাজুবাঘা গ্রামে ভাড়া বাসায় থাকেন।
সোমবার (০২-০৩-২০২৬) শিল্পী খাতুনের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, মেঝেতে শোয়ানো তাসলিমা বেগম নড়াচড়া করতে পারছেন না। দীর্ঘদিন শুয়ে থাকার কারণে তার শরীরে পক্ষাঘাতের লক্ষণ (চিকিৎসকের ভাষায় স্ট্রোকজনিত সমস্যা) দেখা দিয়েছে। আশপাশে ঘিরে রয়েছে মশা-মাছি। কাছে গেলে অস্পষ্টভাবে কিছু বলার চেষ্টা করেন তিনি।
শিল্পী খাতুন জানান, ছোটবেলা থেকেই তিনি মায়ের সঙ্গে বাবার ঝগড়া-বিবাদ ও মারধর দেখেছেন। অসুস্থ হওয়ার পরও তার যথাযথ চিকিৎসা করা হয়নি। বিছানায় প্রস্রাব-পায়খানা করতে হয়েছে, দীর্ঘদিন শুয়ে থাকার কারণে শরীরে ঘা হয়েছে। ডান হাত ও ডান পা অবশ হয়ে গেছে।
তিনি জানান, চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি লালপুরের দুড়দুড়িয়া গ্রামের বাড়ি থেকে মাকে নিজের ভাড়া বাসায় নিয়ে আসেন। ১৪ জানুয়ারি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরো মেডিসিন বিভাগে ছয় দিন ভর্তি রেখে চিকিৎসা করান। এছাড়া হাসপাতালের ৩, ৩৬ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডে মোট সাত দিন চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরবর্তীতে থেরাপির জন্য রাজশাহীর সিআরপিতে নয় দিন চিকিৎসা নেওয়া হয়।
প্রশাসনের বাইরে সমাজপতি ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের হস্তক্ষেপে মাকে তার ভিটায় ফেরানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন শিল্পী খাতুন। শেষ পর্যন্ত আইনি সহায়তার পথ বেছে নেন। ১৫ ফেব্রুয়ারি নাটোর জেলার লিগ্যাল এইড অফিসে তাসলিমা বেগমের বড় মেয়ে মারহুমা ফেদৌস (শিল্পী খাতুন) বাদী হয়ে তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। আসামিরা হলেন—তাসলিমা বেগমের স্বামী আবু বকর সিদ্দিক ও দুই ছেলে আকাশ চৌধুরি সম্রাট এবং মো. শিমুল। তারা লালপুরের দুড়দুড়িয়া নতুনপাড়া এলাকার বাসিন্দা।
অভিযোগের বিষয়ে আবু বকর সিদ্দিক বলেন, “দেখভাল করিনি—এ কথা ঠিক নয়। সাত বছর আগে স্ট্রোক করলে চিকিৎসা করানো হয়েছিল। এবার অসুস্থ হওয়ার পর টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারিনি। বড় মেয়ে চিকিৎসার জন্য নিয়ে গেছে।” একই ধরনের বক্তব্য দেন দুই ছেলে সম্রাট ও শিমুল।
এ প্রসঙ্গে শাহদৌলা সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক আব্দুল হানিফ মিয়া বলেন, “সমাজে প্রবীণ ব্যক্তিদের মর্যাদা বৃদ্ধির কাজ এগোচ্ছে না। এখন সময় এসেছে মা-বাবার ভরণপোষণ বিষয়ে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কাঠামোগতভাবে সামাজিক নজরদারি বাড়িয়ে বিষয়টি আমলে নেওয়া। কাজগুলোকে বাধ্যবাধকতার মধ্যে এনে সম্মানজনক ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।”
প্রিন্ট

কুষ্টিয়ায় মাদক সেবনের টাকা না পেয়ে বসতঘরে আগুন 
আব্দুল হামিদ মিঞা, বাঘা (রাজশাহী) প্রতিনিধি 




















