ঢাকা , বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo কুষ্টিয়া সীমান্তে বিএসএফের পুশইন চেষ্টা, বিজিবির বাধায় ফিরে গেল ৪ জন Logo ঠাকুরগাঁওয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ও জেলা শিক্ষা অফিসের যৌথ পরিচ্ছন্নতা অভিযান Logo ১৫ বছর পর ভাঙ্গার কুমার নদে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচঃ লাখো মানুষের ঢল। Logo আলফাডাঙ্গা প্রেসক্লাবে লাইব্রেরি উদ্বোধন Logo রায়ের পর বদলে গেল গোগ্রামের পাঁচ বছরের নির্বাচনী হিসাব Logo শতবর্ষী সরকারি খাল দখলমুক্তে অভিযান, মালামাল স্পট নিলামে Logo মধুখালী থানার এএসআই শরীফুলের সাফল্য, ৬২ হারানো মোবাইল উদ্ধার Logo বিদ্যুৎ সংকটে গঙ্গাচড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সোলার-আইপিএস দিলেন জিওন Logo নরসিংদীর চরাঞ্চলে যৌথ অভিযান, অস্ত্র-গুলাবারুদ ও ১৩৬ ককটেলসহ গ্রেপ্তার ৩ Logo সারাদেশে জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস-২০২৬ পালিত
প্রতিনিধি নিয়োগ
সারা দেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আপনি আপনার এলাকায় সাংবাদিকতা পেশায় আগ্রহী হলে যোগাযোগ করুন। Hotline- +880 1728311111

বরেন্দ্র অঞ্চলে গ্রামীণ জনপদে আভিজাত্যর প্রতিক মাটির দ্বিতল বাড়ি বিলুপ্ত প্রায়

আলিফ হোসেনঃ

প্রচন্ড খরাপ্রবণ তানোর উপজেলাসহ বরেন্দ্র অঞ্চল থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যের নির্দশন ও আভিজাত্যর প্রতিক সবুজ শ্যামল ছায়াঘেরা শান্তির নীড় মাটির দ্বিতল বাড়ি।গ্রামীণ জনপদে একটা সময় সমাজের বিত্তশীল প্রভাবশালীরা মাটির দ্বিতল বাড়ি নির্মাণ করতেন। যার বাড়ি যতো বড় সমাজে তার আভিজাত্য ছিলো ততো বেশী।আবার গ্রামের অনেক মানুষ বলতো, গরিবের এসি ঘর। কিন্তু আধুনিকতার দাপটে, মানুষের জীবন যাত্রার মান বৃদ্ধি পাওয়ায় এমন মাটির দোতলা বাড়ি এখন আর তেমন নজরে পড়ে না। এখন কেউ আর মাটির দ্বিতল বাড়ি নির্মাণও করেন না।

–

অথচ খুব বেশী দিনের কথা নয় দুদশক আগেও বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রতিটি গ্রামে নজরে পড়তো দৃষ্টিনন্দন মাটির দ্বিতল ঘর। কিন্তু গ্রামের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন এসেছে, মানুষের আয় বৃদ্ধি পেয়েছে, সরকারী পাবলিক লিমিটেড ব্যাংকসহ বিভিন্ন এনজিওর ঋণ ও কায়িক পরিশ্রম করা গরিব পরিবারগুলো এখন তৈরি করছে ছোট্ট আকারে হলেও পাকা দালান। তার উপরে তুলছেন টিনের চালা কিংবা ছাঁদ। এক সময় গোদাগাড়ী উপজেলার ৯টি ও তানোর উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের প্রায় প্রতিটি গ্রামে মাটির দ্বিতল বাড়ি-ঘর চোখে পড়তো। যেখানে লাল বা চিপটে মাটি সহজলভ্য সেখানে এ ঘরগুলো বেশি তৈরি করা হয়। কিন্তু কালের বিবর্তনে আজ হারিয়ে যেতে বসেছে এই ঐতিহ্যবাহী মাটির দ্বিতল বাড়ি। এই বাড়ি শীত ও গরম মৌসুমে আরামদায়ক বলে গ্রামের গরিব ও দরিদ্র মানুষের পাশাপাশি বিত্তবানগণ এই মাটির দ্বিতল বাড়ি নির্মান করতেন।

–

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অতি প্রাচীনকাল থেকেই মাটির দ্বিতল বাড়ির প্রচলন এবং গ্রামের মানুষের কাছে এই বাড়ি আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের প্রতীক ছিল। এঁটেল বা আঠালো মাটি কাদায় পরিণত করে ২-৩ ফুট চওড়া করে দেয়াল তৈরি করা হয়। প্রায় ১০-১৫ ফুট উঁচু দেয়ালে কাঠ বা বাঁশের সিলিং তৈরি করে তার ওপর খড় বা টিনের ছাউনি দিয়ে নির্মাণ করা এই মাটির দ্বিতর বাড়িতে গৃহিণীরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মাটির দেয়ালে বিভিন্ন রকমের আল্পনা এঁকে ঘরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বর্ষা মৌসুমে মাটির ঘরের ক্ষতি হয় বলে বর্তমান সময়ে দীর্ঘ স্থায়িত্বের কারণসহ গ্রামাঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক পরিবর্তন হওয়ায় গ্রামের মানুষেরা ইট-সিমেন্টের বাড়ি নির্মাণে আগ্রহী হচ্ছেন। ভূমিকম্প বা বন্যা না হলে একটি মাটির বাড়ি শত বছরেরও বেশি স্থায়ী হয়। কিন্তু বর্তমান সময়ে কালের বির্বতনে ইট-বালির দালান কোঠা আর বড় বড় অট্টালিকার কাছে হার মানছে মাটির বাড়ি।

–

তানোর উপজেলার কলমা ইউনিয়নের (ইউপি) চৌরখৈর মাসুদ চৌধুরী রানা বলেন, বাপদাদার তৈরী মাটির বাড়ীতে এখনও আমরা বাস করছি, মাটির তেরী বাড়ীতে বিদ্যুৎ চলে গেলেও ঘরগুলি ঠন্ডা হওয়ায় বাস করতে ভাল লাগে। মনে হয় এসি রুমে বাস করছি। একই এলাকার মোজাম বলেন, মাটির তৈরি এই বাড়ি তারা পেয়েছেন পৈত্রিকভাবে। তাদের পূর্ব পুরুষরাও এই মাটির তৈরি বাড়িতেই জীবন কাটিয়ে গেছেন। তাই এখনও তারা এই বাড়িগুলো ভাঙ্গেন নি।

–

গোদাগাড়ী উপজেলার সৈয়দপুর এলাকার আলহাজ্ব দুলাল ফকির বলেন, মাটির তৈরী বাড়ী খুব আরামদায়ক, ফ্যান ছাড়া ঘুমানো যায়, তেমন অসুবিধা হয় না। কিন্তু কালের বিবর্তনে সব হারিয়ে যাচ্ছ, প্রধান কারণ হিসেবে তিনি জানান, যৌথপরিবারগুলি ভেঙে খান খান হয়ে যাচ্ছে, বিয়ের কিছুদিন পর বাবা, মা, ভাই, বোনকে ত্যাগ একক পরিবার গঠন করতে আগ্রহী হচ্ছে। পরিবারে বসবাস করতে শহরমুখি বসবাস ঝুঁকে পড়ছেন।গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হওয়ার ফলেই গত ১০ বছরের মধ্যেই মাটির দোতলা বাড়ি ভেঙ্গে পাকা বাড়ি তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে এখন আর কেউ নতুন ভাবে মাটির বাড়ি নির্মাণ করার কথা মাথায় আনতে চায় না, যার যা আছে তা দিয়েই সকলেই ইট-সিমেন্ট দিয়ে পাকা বাড়ি তৈরি করছেন। অনেকেই বলছেন এঅবস্থা চলতে থাকলে একসময় মাটির দোতলা বাড়ির ছবি ছাড়া আর বাস্তবে মাটির দোতলা বাড়ি ঘুজে পাওয়া যাবেনা।

Tag :
এই অথরের আরো সংবাদ দেখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

‘তারেক রহমান প্রতিশ্রুতি দিলে বাস্তবায়ন করেন, দুর্গাপূজার নিরাপত্তা তার প্রমাণ’

error: Content is protected !!

বরেন্দ্র অঞ্চলে গ্রামীণ জনপদে আভিজাত্যর প্রতিক মাটির দ্বিতল বাড়ি বিলুপ্ত প্রায়

আপডেট টাইম : ১০:০৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ জুন ২০২৫
আলিফ হোসেন, তানোর (রাজশাহী) প্রতিনিধি :

আলিফ হোসেনঃ

প্রচন্ড খরাপ্রবণ তানোর উপজেলাসহ বরেন্দ্র অঞ্চল থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যের নির্দশন ও আভিজাত্যর প্রতিক সবুজ শ্যামল ছায়াঘেরা শান্তির নীড় মাটির দ্বিতল বাড়ি।গ্রামীণ জনপদে একটা সময় সমাজের বিত্তশীল প্রভাবশালীরা মাটির দ্বিতল বাড়ি নির্মাণ করতেন। যার বাড়ি যতো বড় সমাজে তার আভিজাত্য ছিলো ততো বেশী।আবার গ্রামের অনেক মানুষ বলতো, গরিবের এসি ঘর। কিন্তু আধুনিকতার দাপটে, মানুষের জীবন যাত্রার মান বৃদ্ধি পাওয়ায় এমন মাটির দোতলা বাড়ি এখন আর তেমন নজরে পড়ে না। এখন কেউ আর মাটির দ্বিতল বাড়ি নির্মাণও করেন না।

–

অথচ খুব বেশী দিনের কথা নয় দুদশক আগেও বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রতিটি গ্রামে নজরে পড়তো দৃষ্টিনন্দন মাটির দ্বিতল ঘর। কিন্তু গ্রামের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন এসেছে, মানুষের আয় বৃদ্ধি পেয়েছে, সরকারী পাবলিক লিমিটেড ব্যাংকসহ বিভিন্ন এনজিওর ঋণ ও কায়িক পরিশ্রম করা গরিব পরিবারগুলো এখন তৈরি করছে ছোট্ট আকারে হলেও পাকা দালান। তার উপরে তুলছেন টিনের চালা কিংবা ছাঁদ। এক সময় গোদাগাড়ী উপজেলার ৯টি ও তানোর উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের প্রায় প্রতিটি গ্রামে মাটির দ্বিতল বাড়ি-ঘর চোখে পড়তো। যেখানে লাল বা চিপটে মাটি সহজলভ্য সেখানে এ ঘরগুলো বেশি তৈরি করা হয়। কিন্তু কালের বিবর্তনে আজ হারিয়ে যেতে বসেছে এই ঐতিহ্যবাহী মাটির দ্বিতল বাড়ি। এই বাড়ি শীত ও গরম মৌসুমে আরামদায়ক বলে গ্রামের গরিব ও দরিদ্র মানুষের পাশাপাশি বিত্তবানগণ এই মাটির দ্বিতল বাড়ি নির্মান করতেন।

–

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অতি প্রাচীনকাল থেকেই মাটির দ্বিতল বাড়ির প্রচলন এবং গ্রামের মানুষের কাছে এই বাড়ি আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের প্রতীক ছিল। এঁটেল বা আঠালো মাটি কাদায় পরিণত করে ২-৩ ফুট চওড়া করে দেয়াল তৈরি করা হয়। প্রায় ১০-১৫ ফুট উঁচু দেয়ালে কাঠ বা বাঁশের সিলিং তৈরি করে তার ওপর খড় বা টিনের ছাউনি দিয়ে নির্মাণ করা এই মাটির দ্বিতর বাড়িতে গৃহিণীরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মাটির দেয়ালে বিভিন্ন রকমের আল্পনা এঁকে ঘরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বর্ষা মৌসুমে মাটির ঘরের ক্ষতি হয় বলে বর্তমান সময়ে দীর্ঘ স্থায়িত্বের কারণসহ গ্রামাঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক পরিবর্তন হওয়ায় গ্রামের মানুষেরা ইট-সিমেন্টের বাড়ি নির্মাণে আগ্রহী হচ্ছেন। ভূমিকম্প বা বন্যা না হলে একটি মাটির বাড়ি শত বছরেরও বেশি স্থায়ী হয়। কিন্তু বর্তমান সময়ে কালের বির্বতনে ইট-বালির দালান কোঠা আর বড় বড় অট্টালিকার কাছে হার মানছে মাটির বাড়ি।

–

তানোর উপজেলার কলমা ইউনিয়নের (ইউপি) চৌরখৈর মাসুদ চৌধুরী রানা বলেন, বাপদাদার তৈরী মাটির বাড়ীতে এখনও আমরা বাস করছি, মাটির তেরী বাড়ীতে বিদ্যুৎ চলে গেলেও ঘরগুলি ঠন্ডা হওয়ায় বাস করতে ভাল লাগে। মনে হয় এসি রুমে বাস করছি। একই এলাকার মোজাম বলেন, মাটির তৈরি এই বাড়ি তারা পেয়েছেন পৈত্রিকভাবে। তাদের পূর্ব পুরুষরাও এই মাটির তৈরি বাড়িতেই জীবন কাটিয়ে গেছেন। তাই এখনও তারা এই বাড়িগুলো ভাঙ্গেন নি।

–

গোদাগাড়ী উপজেলার সৈয়দপুর এলাকার আলহাজ্ব দুলাল ফকির বলেন, মাটির তৈরী বাড়ী খুব আরামদায়ক, ফ্যান ছাড়া ঘুমানো যায়, তেমন অসুবিধা হয় না। কিন্তু কালের বিবর্তনে সব হারিয়ে যাচ্ছ, প্রধান কারণ হিসেবে তিনি জানান, যৌথপরিবারগুলি ভেঙে খান খান হয়ে যাচ্ছে, বিয়ের কিছুদিন পর বাবা, মা, ভাই, বোনকে ত্যাগ একক পরিবার গঠন করতে আগ্রহী হচ্ছে। পরিবারে বসবাস করতে শহরমুখি বসবাস ঝুঁকে পড়ছেন।গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হওয়ার ফলেই গত ১০ বছরের মধ্যেই মাটির দোতলা বাড়ি ভেঙ্গে পাকা বাড়ি তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে এখন আর কেউ নতুন ভাবে মাটির বাড়ি নির্মাণ করার কথা মাথায় আনতে চায় না, যার যা আছে তা দিয়েই সকলেই ইট-সিমেন্ট দিয়ে পাকা বাড়ি তৈরি করছেন। অনেকেই বলছেন এঅবস্থা চলতে থাকলে একসময় মাটির দোতলা বাড়ির ছবি ছাড়া আর বাস্তবে মাটির দোতলা বাড়ি ঘুজে পাওয়া যাবেনা।