ঢাকা , বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo কুষ্টিয়া সীমান্তে বিএসএফের পুশইন চেষ্টা, বিজিবির বাধায় ফিরে গেল ৪ জন Logo ঠাকুরগাঁওয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ও জেলা শিক্ষা অফিসের যৌথ পরিচ্ছন্নতা অভিযান Logo ১৫ বছর পর ভাঙ্গার কুমার নদে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচঃ লাখো মানুষের ঢল। Logo আলফাডাঙ্গা প্রেসক্লাবে লাইব্রেরি উদ্বোধন Logo রায়ের পর বদলে গেল গোগ্রামের পাঁচ বছরের নির্বাচনী হিসাব Logo শতবর্ষী সরকারি খাল দখলমুক্তে অভিযান, মালামাল স্পট নিলামে Logo মধুখালী থানার এএসআই শরীফুলের সাফল্য, ৬২ হারানো মোবাইল উদ্ধার Logo বিদ্যুৎ সংকটে গঙ্গাচড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সোলার-আইপিএস দিলেন জিওন Logo নরসিংদীর চরাঞ্চলে যৌথ অভিযান, অস্ত্র-গুলাবারুদ ও ১৩৬ ককটেলসহ গ্রেপ্তার ৩ Logo সারাদেশে জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস-২০২৬ পালিত
প্রতিনিধি নিয়োগ
দৈনিক সময়ের প্রত্যাশা পত্রিকার জন্য সারা দেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আপনি আপনার এলাকায় সাংবাদিকতা পেশায় আগ্রহী হলে যোগাযোগ করুন। Hotline- +880 9617 179084

ছোটগল্পঃ বাবুদের তাল বাগান

শামীম আহমেদঃ

কাঞ্চনপুর গ্রামের একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল তালবাগানটা এক সময় ছিল জমিদার হেমেন্দ্রলাল রায়ের গর্ব। লোকে বলত, “এই তালের বাগানই হচ্ছে জমিদারির চিহ্ন, হেমেন্দ্রবাবুর ঐশ্বর্যের ছায়া।” বছরের পর বছর তাল গাছগুলো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে ছিল ঠিক যেন রাজপুরুষেরা প্রহরায় আছে।

–

হেমেন্দ্রলাল রায় ছিলেন এককালের বিখ্যাত জমিদার। তবে সময় পাল্টেছে। জমিদারি উঠে গেছে। রাজস্ব প্রথা বাতিল হওয়ার পর উত্তরসূরিরা একে একে শহরে পাড়ি জমিয়েছেন। কিন্তু তালবাগানটা থেকে গেছে গ্রামের বুকে, একা একা।

–

এই বাগানের পাশেই ছোট একটা কুঁড়ে ঘরে থাকে বুড়ো মানুষটি – লোকেরা তাকে ডাকে “তালু চাচা”। তাঁর আসল নাম কেউ জানে না, তবে সে নাকি এক সময় জমিদারের বাগানের পাহারাদার ছিল। জমিদার যখন শহরে চলে যান, তালু চাচা থেকে গিয়েছিলেন এই বাগানের দেখভাল করতে। বিনা পারিশ্রমিকে, নিঃশব্দে।

–

প্রতি বর্ষায়, তালগুলো যখন পেকে পেকে ঝরে পড়ে, তালু চাচা সেগুলো কুড়িয়ে এনে গ্রামের ছেলেমেয়েদের বিলিয়ে দেন। সেই তাল দিয়ে কেউ বানাতো পাটালি, কেউ আবার তাল সন্দেশ বানাতেন। চাচার কোনো লোভ নেই— তিনি বলতেন, “এই গাছগুলোও তো একেকটা স্মৃতি। আমার চোখের সামনে বড় হয়েছে ওরা।”

–

একদিন গ্রামের স্কুলের মাস্টার মশাই সুশান্ত বাবু বাচ্চাদের নিয়ে এলেন তালবাগানে। বললেন, “এই বাগানটা সংরক্ষণ করা উচিত। সরকারকে একটা প্রস্তাবনা পাঠানো যাক, যাতে এখানে একটি স্মৃতিসৌধ কিংবা প্রকৃতি পাঠশালা করা যায়।” তালু চাচার চোখে জল এসে গেল।

–

“জমিদারবাবুর অনেক দোষ ছিল,” তিনি বললেন, “তবে এই তালবাগানটা উনি সবাইকে দিয়ে গিয়েছিলেন। এখন যদি তোমরা ওর যত্ন নাও, ওটাই হবে তার প্রকৃত সম্মান।”

–

সেই বিকেলে গ্রামের ছেলেমেয়েরা মিলে বাগানের মরা গাছ ছেঁটে ফেলল, মাটিতে পড়ে থাকা শুকনো ডাল পুঁতে নতুন চারা লাগাল। তালু চাচা দূরে বসে সব দেখলেন, আর একটানা হাসলেন। সূর্য ডুবছিল পশ্চিমে, তালগাছের ছায়াগুলো লম্বা হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছিল।

–

বাগানে একটা নতুন জীবন শুরু হচ্ছিল, আর তার নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল তালু চাচা…।

 

-শামীম আহমেদ

কবি, লেখক ও সাহিত্যিক

 

Tag :
এই অথরের আরো সংবাদ দেখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

কুমিল্লায় দুই শিশুকে সড়কের পাশে রেখে যাওয়ার অভিযোগ

error: Content is protected !!

ছোটগল্পঃ বাবুদের তাল বাগান

আপডেট টাইম : ০৬:২৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৩ জুন ২০২৫
শামীম আহমেদ, কবি, লেখক ও সাহিত্যিক :

শামীম আহমেদঃ

কাঞ্চনপুর গ্রামের একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল তালবাগানটা এক সময় ছিল জমিদার হেমেন্দ্রলাল রায়ের গর্ব। লোকে বলত, “এই তালের বাগানই হচ্ছে জমিদারির চিহ্ন, হেমেন্দ্রবাবুর ঐশ্বর্যের ছায়া।” বছরের পর বছর তাল গাছগুলো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে ছিল ঠিক যেন রাজপুরুষেরা প্রহরায় আছে।

–

হেমেন্দ্রলাল রায় ছিলেন এককালের বিখ্যাত জমিদার। তবে সময় পাল্টেছে। জমিদারি উঠে গেছে। রাজস্ব প্রথা বাতিল হওয়ার পর উত্তরসূরিরা একে একে শহরে পাড়ি জমিয়েছেন। কিন্তু তালবাগানটা থেকে গেছে গ্রামের বুকে, একা একা।

–

এই বাগানের পাশেই ছোট একটা কুঁড়ে ঘরে থাকে বুড়ো মানুষটি – লোকেরা তাকে ডাকে “তালু চাচা”। তাঁর আসল নাম কেউ জানে না, তবে সে নাকি এক সময় জমিদারের বাগানের পাহারাদার ছিল। জমিদার যখন শহরে চলে যান, তালু চাচা থেকে গিয়েছিলেন এই বাগানের দেখভাল করতে। বিনা পারিশ্রমিকে, নিঃশব্দে।

–

প্রতি বর্ষায়, তালগুলো যখন পেকে পেকে ঝরে পড়ে, তালু চাচা সেগুলো কুড়িয়ে এনে গ্রামের ছেলেমেয়েদের বিলিয়ে দেন। সেই তাল দিয়ে কেউ বানাতো পাটালি, কেউ আবার তাল সন্দেশ বানাতেন। চাচার কোনো লোভ নেই— তিনি বলতেন, “এই গাছগুলোও তো একেকটা স্মৃতি। আমার চোখের সামনে বড় হয়েছে ওরা।”

–

একদিন গ্রামের স্কুলের মাস্টার মশাই সুশান্ত বাবু বাচ্চাদের নিয়ে এলেন তালবাগানে। বললেন, “এই বাগানটা সংরক্ষণ করা উচিত। সরকারকে একটা প্রস্তাবনা পাঠানো যাক, যাতে এখানে একটি স্মৃতিসৌধ কিংবা প্রকৃতি পাঠশালা করা যায়।” তালু চাচার চোখে জল এসে গেল।

–

“জমিদারবাবুর অনেক দোষ ছিল,” তিনি বললেন, “তবে এই তালবাগানটা উনি সবাইকে দিয়ে গিয়েছিলেন। এখন যদি তোমরা ওর যত্ন নাও, ওটাই হবে তার প্রকৃত সম্মান।”

–

সেই বিকেলে গ্রামের ছেলেমেয়েরা মিলে বাগানের মরা গাছ ছেঁটে ফেলল, মাটিতে পড়ে থাকা শুকনো ডাল পুঁতে নতুন চারা লাগাল। তালু চাচা দূরে বসে সব দেখলেন, আর একটানা হাসলেন। সূর্য ডুবছিল পশ্চিমে, তালগাছের ছায়াগুলো লম্বা হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছিল।

–

বাগানে একটা নতুন জীবন শুরু হচ্ছিল, আর তার নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল তালু চাচা…।

 

-শামীম আহমেদ

কবি, লেখক ও সাহিত্যিক