ঢাকা , রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo কুষ্টিয়া সীমান্তে বিএসএফের পুশইন চেষ্টা, বিজিবির বাধায় ফিরে গেল ৪ জন Logo ঠাকুরগাঁওয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ও জেলা শিক্ষা অফিসের যৌথ পরিচ্ছন্নতা অভিযান Logo ১৫ বছর পর ভাঙ্গার কুমার নদে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচঃ লাখো মানুষের ঢল। Logo আলফাডাঙ্গা প্রেসক্লাবে লাইব্রেরি উদ্বোধন Logo রায়ের পর বদলে গেল গোগ্রামের পাঁচ বছরের নির্বাচনী হিসাব Logo শতবর্ষী সরকারি খাল দখলমুক্তে অভিযান, মালামাল স্পট নিলামে Logo মধুখালী থানার এএসআই শরীফুলের সাফল্য, ৬২ হারানো মোবাইল উদ্ধার Logo বিদ্যুৎ সংকটে গঙ্গাচড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সোলার-আইপিএস দিলেন জিওন Logo নরসিংদীর চরাঞ্চলে যৌথ অভিযান, অস্ত্র-গুলাবারুদ ও ১৩৬ ককটেলসহ গ্রেপ্তার ৩ Logo সারাদেশে জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস-২০২৬ পালিত
প্রতিনিধি নিয়োগ
সারা দেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আপনি আপনার এলাকায় সাংবাদিকতা পেশায় আগ্রহী হলে যোগাযোগ করুন। Hotline- +880 1728311111

ছেঁউড়িয়ায় লালন তিরোধান দিবস: সাধুসঙ্গ ও দর্শনে মুখর আখড়াবাড়ি

ইসমাইল হোসেন বাবু, সিনিয়র ষ্টাফ রিপোর্টার

মরমি সাধক ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে সাধন-ভজন আর মরমি গানের সুরে মুখর হয়ে উঠেছে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় লালন আখড়াবাড়ি। সাধু-ফকির, বাউল ও ভক্ত-অনুরাগীদের মিলনমেলায় আখড়াবাড়িজুড়ে চলছে গুরু সেবা, ভাবের আদান-প্রদান ও লালনের মানবতাবাদী দর্শনচর্চা।

গতকাল শনিবার অধিবাস সেবার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া সাধুসঙ্গ শেষ হবে আজ রোববার সকালে বাল্যসেবা ও দুপুরে পূর্ণসেবার মধ্য দিয়ে। তবে তিরোধান দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও গ্রামীণ মেলা চলবে আগামীকাল সোমবার গভীর রাত পর্যন্ত।

গতকাল বিকেলে আখড়াবাড়ির মূল মঞ্চে তিন দিনব্যাপী তিরোধান দিবসের আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। এ সময় তিনি বলেন, ‘শুধু উৎসব বা আনুষ্ঠানিকতা পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, লালনের এই শাশ্বত বাণী ও দর্শন স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে শিক্ষিত সমাজ এবং সর্বস্তরের মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মানবপ্রেম জাগিয়ে তুলতে মরমি সাধকদের দর্শনচর্চার কোনো বিকল্প নেই।’

মন্ত্রী আরও বলেন, ‘কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে লালন একাডেমি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে লালনচর্চা ও গবেষণার পরিধি আরও প্রসারিত করা প্রয়োজন, যাতে তাঁর অন্তর্লীন বাণী বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে যেতে পারে। আসুন, সকল ভেদাভেদ ভুলে লালনের সাম্য, মৈত্রী ও মানবতার আদর্শকে বুকে ধারণ করে একটি প্রগতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়ে তুলি।’

১৩৬ বছর আগে কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ার এই আখড়াবাড়িতে দেহত্যাগ করেন ফকির লালন সাঁই। এর পর থেকে গুরুপরম্পরায় তাঁর মানবতাবাদী দর্শন ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করে আসছেন সাধু-ফকির ও অনুসারীরা। দোল পূর্ণিমার সাধুসঙ্গের মতো তিরোধান দিবসেও আয়োজন করা হয় অধিবাস, বাল্যসেবা ও পূর্ণসেবার। সেই ধারাবাহিকতায় শনিবার অধিবাস সেবার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে এবারের সাধুসঙ্গ।

আখড়াবাড়ির বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট বৈঠকি আসরে চলছে লালনের গান। গানের বাণী আর ভাবের আদান-প্রদানে মগ্ন সাধু-ফকিরেরা। তাঁদের সাধনা, জীবনাচার ও মানবদর্শনের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠছে লালনের সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার বাণী। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ভক্ত-অনুরাগী ও দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে এই সাধুসঙ্গ।

এদিকে সাধু-বাউল ও ভক্ত-অনুরাগীদের পদচারণে মুখর আখড়াবাড়ি-সংলগ্ন কালী নদীর তীরে বসেছে বিশাল গ্রামীণ মেলা।

লালন গবেষক ও অনুসারী হৃদয় শাহ বলেন, ‘লালন উৎসবকে ঘিরে এখানে মানুষের বিরল মেলা বসে। তবে এখানে এসে কিছুক্ষণ বসে বা ঘুরে চলে যাওয়ার মধ্যে আসল শিক্ষণীয় বিষয়টি নেই। আমরা লালনকে শুদ্ধতার মধ্যে চর্চা করি, তাঁর দর্শন ধারণ করি। এসবই সাঁইজির বাণী থেকে এসেছে। নতুন করে তরুণেরা লালনকে নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন, গবেষণা করছেন। তাঁর মানবতার পথকে বেছে নিয়েছেন।’

মামুন সাধু বলেন, সাধুসঙ্গে একদিকে যেমন সাধু-গুরুদের গান চলছে, অন্যদিকে চলছে গুরু-শিষ্যের ভাবের আদান-প্রদান। লালনের গানের বাণী এবং তাঁর অনুসারী সাধু-ফকিরদের সত্য ও সরল জীবনযাপন দেখতে মানুষের এত আগ্রহ। আরামদায়ক জীবন পাওয়া গেলেও আত্মতৃপ্তি পেতে আত্মসংস্কার করতে হয়। সত্যের সাধনায় তাঁরা নিজেদের সুন্দর করে তোলেন এবং সেই আত্মতৃপ্তির পথ মানুষকে দেখান। মূলত সাঁইজিকে অনুসরণ করতেই তাঁরা ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে এসেছেন। গুরু সেবা ও সাধুসঙ্গকে প্রাধান্য দিয়েই চলছে তাঁদের সাধন-ভজন।

এদিকে সাধু-বাউল ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। মেলাকে মাদকমুক্ত রাখতে জোরদার করা হয়েছে নজরদারি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মোতায়েন করা হয়েছে ৮৭২ পুলিশ সদস্য। পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করছে আনসার ও এসআরবির বিশেষ দল।

পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘পুলিশের পক্ষ থেকে এখানে ৮৭২ জন সদস্য নিয়োজিত আছেন। তাঁদের মধ্যে স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) ও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সদস্যরাও আছেন। কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যাতে না ঘটে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন হাসান বলেন, ‘আচার-অনুষ্ঠানে যাতে কোনো ধরনের ব্যাঘাত না ঘটে, সে বিষয়ে আমরা সতর্ক রয়েছি।’

বাল্যসেবা ও পূর্ণসেবার মধ্য দিয়ে আজ শেষ হবে সাধুসঙ্গ।

Tag :
এই অথরের আরো সংবাদ দেখুন

Ishtiaque Ahmed

জনপ্রিয় সংবাদ

তদন্তে ঘুষের সত্যতা মিলেছে, তবু বহাল নায়েব

error: Content is protected !!

ছেঁউড়িয়ায় লালন তিরোধান দিবস: সাধুসঙ্গ ও দর্শনে মুখর আখড়াবাড়ি

আপডেট টাইম : ৪৭ মিনিট আগে
সময়ের প্রত্যাশা ডেস্ক : :

ইসমাইল হোসেন বাবু, সিনিয়র ষ্টাফ রিপোর্টার

মরমি সাধক ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে সাধন-ভজন আর মরমি গানের সুরে মুখর হয়ে উঠেছে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় লালন আখড়াবাড়ি। সাধু-ফকির, বাউল ও ভক্ত-অনুরাগীদের মিলনমেলায় আখড়াবাড়িজুড়ে চলছে গুরু সেবা, ভাবের আদান-প্রদান ও লালনের মানবতাবাদী দর্শনচর্চা।

গতকাল শনিবার অধিবাস সেবার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া সাধুসঙ্গ শেষ হবে আজ রোববার সকালে বাল্যসেবা ও দুপুরে পূর্ণসেবার মধ্য দিয়ে। তবে তিরোধান দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও গ্রামীণ মেলা চলবে আগামীকাল সোমবার গভীর রাত পর্যন্ত।

গতকাল বিকেলে আখড়াবাড়ির মূল মঞ্চে তিন দিনব্যাপী তিরোধান দিবসের আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। এ সময় তিনি বলেন, ‘শুধু উৎসব বা আনুষ্ঠানিকতা পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, লালনের এই শাশ্বত বাণী ও দর্শন স্কুল-কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে শিক্ষিত সমাজ এবং সর্বস্তরের মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও মানবপ্রেম জাগিয়ে তুলতে মরমি সাধকদের দর্শনচর্চার কোনো বিকল্প নেই।’

মন্ত্রী আরও বলেন, ‘কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে লালন একাডেমি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে লালনচর্চা ও গবেষণার পরিধি আরও প্রসারিত করা প্রয়োজন, যাতে তাঁর অন্তর্লীন বাণী বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে যেতে পারে। আসুন, সকল ভেদাভেদ ভুলে লালনের সাম্য, মৈত্রী ও মানবতার আদর্শকে বুকে ধারণ করে একটি প্রগতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গড়ে তুলি।’

১৩৬ বছর আগে কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ার এই আখড়াবাড়িতে দেহত্যাগ করেন ফকির লালন সাঁই। এর পর থেকে গুরুপরম্পরায় তাঁর মানবতাবাদী দর্শন ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করে আসছেন সাধু-ফকির ও অনুসারীরা। দোল পূর্ণিমার সাধুসঙ্গের মতো তিরোধান দিবসেও আয়োজন করা হয় অধিবাস, বাল্যসেবা ও পূর্ণসেবার। সেই ধারাবাহিকতায় শনিবার অধিবাস সেবার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে এবারের সাধুসঙ্গ।

আখড়াবাড়ির বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট বৈঠকি আসরে চলছে লালনের গান। গানের বাণী আর ভাবের আদান-প্রদানে মগ্ন সাধু-ফকিরেরা। তাঁদের সাধনা, জীবনাচার ও মানবদর্শনের মধ্য দিয়ে ফুটে উঠছে লালনের সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার বাণী। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ভক্ত-অনুরাগী ও দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে এই সাধুসঙ্গ।

এদিকে সাধু-বাউল ও ভক্ত-অনুরাগীদের পদচারণে মুখর আখড়াবাড়ি-সংলগ্ন কালী নদীর তীরে বসেছে বিশাল গ্রামীণ মেলা।

লালন গবেষক ও অনুসারী হৃদয় শাহ বলেন, ‘লালন উৎসবকে ঘিরে এখানে মানুষের বিরল মেলা বসে। তবে এখানে এসে কিছুক্ষণ বসে বা ঘুরে চলে যাওয়ার মধ্যে আসল শিক্ষণীয় বিষয়টি নেই। আমরা লালনকে শুদ্ধতার মধ্যে চর্চা করি, তাঁর দর্শন ধারণ করি। এসবই সাঁইজির বাণী থেকে এসেছে। নতুন করে তরুণেরা লালনকে নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন, গবেষণা করছেন। তাঁর মানবতার পথকে বেছে নিয়েছেন।’

মামুন সাধু বলেন, সাধুসঙ্গে একদিকে যেমন সাধু-গুরুদের গান চলছে, অন্যদিকে চলছে গুরু-শিষ্যের ভাবের আদান-প্রদান। লালনের গানের বাণী এবং তাঁর অনুসারী সাধু-ফকিরদের সত্য ও সরল জীবনযাপন দেখতে মানুষের এত আগ্রহ। আরামদায়ক জীবন পাওয়া গেলেও আত্মতৃপ্তি পেতে আত্মসংস্কার করতে হয়। সত্যের সাধনায় তাঁরা নিজেদের সুন্দর করে তোলেন এবং সেই আত্মতৃপ্তির পথ মানুষকে দেখান। মূলত সাঁইজিকে অনুসরণ করতেই তাঁরা ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে এসেছেন। গুরু সেবা ও সাধুসঙ্গকে প্রাধান্য দিয়েই চলছে তাঁদের সাধন-ভজন।

এদিকে সাধু-বাউল ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। মেলাকে মাদকমুক্ত রাখতে জোরদার করা হয়েছে নজরদারি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মোতায়েন করা হয়েছে ৮৭২ পুলিশ সদস্য। পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করছে আনসার ও এসআরবির বিশেষ দল।

পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘পুলিশের পক্ষ থেকে এখানে ৮৭২ জন সদস্য নিয়োজিত আছেন। তাঁদের মধ্যে স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) ও গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সদস্যরাও আছেন। কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যাতে না ঘটে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন হাসান বলেন, ‘আচার-অনুষ্ঠানে যাতে কোনো ধরনের ব্যাঘাত না ঘটে, সে বিষয়ে আমরা সতর্ক রয়েছি।’

বাল্যসেবা ও পূর্ণসেবার মধ্য দিয়ে আজ শেষ হবে সাধুসঙ্গ।