মাগুরার মহম্মদপুরের বিভিন্ন মাঠে মাঠে এ বছর আবাদ করা সরিষার ক্ষেতগুলো ফুলে ফুলে ভরে উঠেছে। বিশেষ করে মহম্মদপুর সদরও বাবুখালি ইউনিয়নের এলাকার মাঠজুড়ে যত দুর চোঁখ যায়, তত দূর হলদে রঙের সরিষা ফুল সৃষ্টি করেছে নয়নাভিরাম দৃশ্যের।
দিগন্ত বিস্তৃত কয়েকটি মাঠ দুর থেকে দেখতে মনে হয় বিশাল আকৃতির হলুদ চাদর বিছানো। উপজেলার বিভিন্ন এলাকার ফসলি জমিতে এখন হলদে রঙের সরিষা ফুলে ছেয়ে গেছে। হলদে রঙের সমারোহে চোঁখজুড়িয়ে যায়। তবে পুরোপুরি ফুল আসতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে।
তবে অধিকাংশ মাঠজুড়ে সরিষা ফুলের নয়নাভিরাম দৃশ্যে ভরে উঠেছে। ফুলে ফুলে মধু আহরণে ভিড়ছে মৌমাছি। সকালের সূর্যের কিরণ প্রতিফলিত হবার সাথে সাথে সরিষা ফুলের সমারোহ হেসে ওঠে চারিদিক আবার বিকেলের মিষ্টি রোদে দোল খেতে থাকে মৃদু বাতাসে।
এ যেন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের লীলা ভূমি। সবমিলিয়ে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা দেখছেন সরিষা চাষিরা।
সাধারণত রবি মৌসুমে কার্তিকের শেষ সপ্তাহ থেকে অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্তু সরিষার বীজ বপনের সময়। শীতকালে ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি সরিষা ফুলে ছেয়ে থাকে চারদিক। তবে মহম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকাগুলোতে অগ্রীম জাতের সরিষা আবাদ করা হয়েছে। এছাড়া যে জমিতে সরিষা আবাদের পর বোরো ধানের চাষ করা হবে সেসব জমিতে আগাম সরিষা চাষ করা হয় জানিয়েছেন স্থানীয কৃষক।
মাঠে মাঠে সরিষার আবাদে সৃষ্টি হয়েছে নয়নাভিরাম দৃশ্যের। দেখলে চোঁখ জুড়াবে সবার। সরিষার ফুলে মৌমাছির মধু আহোরনের দৃশ্য তৈরী করেছে মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। খরচ ও শ্রম কম দিয়ে ফলন বেশি হওয়ায় দিন দিন সরিষা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন মাগুরার মহম্মদপুরের কৃষকরা।
গত বছর ধান আবাদ করে লোকসানে এবং বাজারে সরিষার দাম ভালো পাওয়ায়ও এ বছর এই ফসলের আবাদ বেড়েছে। সরজমিন মাঠ পরিদর্শনে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
কৃষকরা আরো জানান, অল্প দিনে বেশি ফলন পাওয়ায় তারা এবার সরিষা চাষে আগ্রহী হয়েছেন। আবার সরিষা ওঠার পরপরই বোরো ধান চাষ করে কৃষক বাড়তি সুবিধা পান বলে জানিয়েছেন তারা। এ কারণে চলতি মৌসুমে মাগুরার উপজেলায় রেকর্ড পরিমাণ জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে।
চলতি মৌসুমে মহম্মদপুর উপজেলার ২ হাজার ৫৮০ হেক্টর জমিতে অধিক ফলনশীল জাতের সরিষা চাষ করেছেন চাষিরা। গত মৌসুমে এক হাজার ১ হাজার ২শ’ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছিল।
এবছর যার প্রায় দ্বিগুন জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে। বছরের পর বছর স্থানীয় জাতের সরিষা চাষ করে ফলনে মার খাওয়ায় হতাশ কৃষকরা সরিষা চাষ কমিয়ে দিয়েছিল বলে জানা গেছে। তবে এবার কৃষি বিভাগের সহায়তায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত অধিক ফলনশীল বারি-১৪, বারি-৯, বিনা-৯/১০, সরিষা-১৫, সোনালি সরিষা (এসএস-৭৫) এবং স্থানীয় টরি-৭ জাতের সরিষা আবাদ করছে কৃষকরা। এসব জাতের সরিষা মাত্র ৭৫-৮০ দিনে ঘরে তোলা যায়। প্রতি হেক্টরে ফলন হয় প্রায়য় দেড় হাজার কেজি। ওই বীজে তেলের পরিমান শতকরা
৪৩-৪৪ভাগ। সরিষা তোলার পর ওই জমিতে বোরো আবাদ করা যায়। এতে কৃষি জমির সর্বাধিক ব্যবহার নিশ্চিত হয়। সরিষা চাষে আগ্রহ বাড়াতে কৃষকদের যথাযথ পরামর্শ ও পরিচর্যার বিষয়ে দিক-নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
এ বছর দুই একর জমিতে বারি-১৪ ও বিনা-৯/১০ জাতের সরিষা চাষ করা উপজেলার পূর্বনারায়নপুর গ্রামের কৃষক হোসেন মিয়া বলেন, প্রতি একর জমিতে খরচ করেছেন চার হাজার টাকা। সরিষার গাছ, ফুল ও ফল ভালো হয়েছে। বাম্পার ফললের আশাও করছেন তিনি। গত বছর সরিষার দাম ও চাহিদা ভালো থাকায় এবারও সরিষা চাষ করেন রায়পুর গ্রামের কৃষক আবুল শেখ বলেন, এ বছর উপযুক্ত দাম পেলে আগামী বছর সরিষা চাষে আরও অনেকেই ঝুঁকে পড়বে বলে মনে করেন তিনি।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে জানা গেছে, এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় সরিষার ফলন ভালো হয়েছে। বড় ধরনের দুর্যোগ না হলে বাম্পার ফলন হবে। গত তিন মৌসুমে ধান আবাদে লোকসানের কারণে সবজি চাষের পাশাপাশি আবার সরিষা আবাদ করেছেন। উপজেলার নহাটা, বিনোদপুর, বাবুখালি, রাজাপুর, দীঘা, পলাশবাড়িয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে এ বছর ব্যাপক হারে সরিষার আবাদ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকুলে থাকলে বাম্পার ফলনের সম্ভবনাও রয়েছে।
কাতলাসুরের বিলের চাষী রবিউল ইসলাম বলেন, গত বছর ধান আবাদে তেমন কোনও লাভ পাইনি, উৎপাদন খরচই উঠে নাই। সরিষা আবাদে খরচ কম লাভ বেশি। এক থেকে দুই বার সেচ দিলে চলে। বাজার দর ভালো হলে একমণ সরিষা ৩৫০০-৩৮০০ টাকা পর্যন্তু বিক্রি করা যায়।
তিনি বলেন, ‘সরিষা চাষ করে মানসম্মত ভোজ্য তেল খাবো। আবার ভালো দামে বিক্রি করে লাভবান হবো।আগামীতে সরিষার পাশাপাশি শাক সবজির চাষের পরিকল্পনা করেছি।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুস সোহবান জানান, কৃষকের এই উদ্যোগকে আমরা ইতিবাচক হিসেবে দেখছি। জমির উর্বরতা ধরে রাখতে সরিষার আবাদে কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। এজন্য অধিকাংশ কৃষক এখন সরিষা আবাদের দিকে ঝুঁকছেন। তাছাড়া অল্প পরিশ্রমে অধিক ফসল ঘরে তোলা যায়।
প্রিন্ট