জসীমউদ্দীন ইতিঃ
একবিংশ শতাব্দীর এই যান্ত্রিক ও ডিজিটাল বিপ্লবের যুগে মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই যখন ক্রমশই জটিল এবং বাণিজ্যিক হয়ে উঠছে, তখন ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলা থেকে আসা একটি খবর আমাদের স্থবির সমাজকে এক তীব্র ঝাঁকুনি দিয়েছে। রঘুনাথপুর গ্রামের দুই নিবেদিতপ্রাণ মানুষ—মোঃ সালাউদ্দিন ও মোঃ জাহাঙ্গীর—বিনামূল্যে কবর খননের যে নজির স্থাপন করেছেন, তা কেবল একটি সমাজসেবামূলক কাজ নয়; বরং এটি আমাদের বর্তমান সময়ের জন্য এক গভীর মানবিক ইশতেহার।
বাণিজ্যিকতার ভিড়ে এক মানবিক ইশতেহার বর্তমান সময়ে আমরা যখন দেখছি জীবনের প্রতিটি ধাপে, এমনকি শেষ বিদায়েও অর্থের লেনদেন অনিবার্য, তখন এই দুই বন্ধু যেন সমাজের প্রচলিত স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়েছেন। মৃত্যুর পর যখন স্বজনদের হৃদয় শোকে বিমর্ষ, তখন কবর খনন বা দাফনের মতো কাজেও অনেক সময় অর্থের জটিল সমীকরণ চলে আসে। সালাউদ্দিন ও জাহাঙ্গীরের এই উদ্যোগ সেই সব অসহায় মানুষদের জন্য এক পরম স্বস্তির বাতায়ন। তারা কোনো প্রতিদান ছাড়া, শুধুমাত্র পরকালের পাথেয় হিসেবে এই কাজকে পেশা নয়, বরং ইবাদত হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
পীরডাঙ্গী কবরস্থানে যারা অন্তত একশ’বার কোদাল ধরেছেন, তারা ভালো করেই জানেন—এটি কেবল মাটি কাটার কাজ নয়। মৃতদেহের প্রতি সম্মান জানানো এবং একজন মানুষকে শেষ শয্যায় শান্তিতে শোয়ানোর মতো বড় দায়িত্ব আর কী হতে পারে? সালাউদ্দিনের অমোঘ উচ্চারণ—“কেউ না কেউ তো আমার কবর খুঁড়বে, তাহলে আমি কেন অন্যের কবর খননের জন্য পারিশ্রমিক নেব?”—এই বাক্যটি আমাদের বুঝিয়ে দেয়, মানুষের মৃত্যুর পর কী নিয়ে যেতে পারে? কেবল এই ভালো কাজগুলোই। তারা জীবনের অনিশ্চয়তাকে এত কাছ থেকে দেখেছেন যে, জাগতিক মোহের চেয়ে পরকালীন শান্তিকেই তারা বড় করে দেখেছেন।
সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো তাদের সাহসিকতা। তারা কেবল মুখে প্রচার করেননি, বরং শহরের বিভিন্ন দেয়ালে ও গাছের সাথে বিজ্ঞাপন দিয়েছেন। অনেকের কাছে এটি অদ্ভুত ঠেকতে পারে, কিন্তু এর পেছনে রয়েছে গভীর এক মানবিক বোধ। একজন দরিদ্র মানুষ, যার প্রিয়জন মারা গেছেন, তিনি হয়তো সংকোচে কারও সাহায্য চাইতে পারেন না। এই বিজ্ঞাপনটি সেই সংকোচ দূর করেছে। এটি যেন অসহায় মানুষের কাছে একটি অভয়বাণী—‘আপনাদের শেষ যাত্রার সঙ্গ দিতে আমরা প্রস্তুত, আপনাদের টাকার প্রয়োজন নেই।’ এটি একাধারে লজ্জা দূর করার এবং পাশে দাঁড়ানোর এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত।
আমরা আজ ডিজিটাল মিডিয়ায় মত্ত। কিন্তু সালাউদ্দিন ও জাহাঙ্গীর আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন—মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ফেসবুক বা কোনো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন শুধু একটি বড় হৃদয়ের। আজকের দিনে যেখানে তরুণ সমাজ নানা অস্থিরতায় ভুগছে, সেখানে এই দুই ব্যক্তির কাজ আমাদের প্রজন্মের জন্য এক বড় শিক্ষা। এটি প্রমাণ করে, মানবিকতা মরে যায়নি, কেবল তা খুঁজে পাওয়ার জন্য সঠিক চোখের প্রয়োজন।
একটি আলোর দিশা ১ মার্চ ২০২৬—আজকের এই দিনে দাঁড়িয়ে, আমরা যখন আমাদের চারপাশের অবক্ষয়ের কথা শুনি, তখন পীরগঞ্জের এই ঘটনাটি আমাদের মনে আশার আলো জ্বালায়। সালাউদ্দিন আর জাহাঙ্গীরের মতো মানুষগুলোই আমাদের সমাজের আসল প্রতিনিধি। তাদের এই উদ্যোগ যেন কেবল একটি এলাকায় সীমাবদ্ধ না থাকে। সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান এবং সচেতন তরুণদেরও উচিত এমন সব নিঃস্বার্থ কাজে উৎসাহ যোগানো।
আমরা তাদের এই মহৎ কাজের জন্য শ্রদ্ধা জানাই। মহান সৃষ্টিকর্তা তাদের এই নেক হায়াত দান করুন এবং আমাদের প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে এমন দরদ সৃষ্টি করে দিন, যেন আমরা একে অপরের বিপদে, এমনকি মৃত্যুর অন্তিম ক্ষণেও পাশে দাঁড়াতে পারি।
প্রিন্ট

বাঘায় সুষ্ঠ সুন্দর পরিবেশে প্রাথমিকের বৃত্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিতঃ উপস্থিতির হারে বালিকা এগিয়ে 
জসীমউদ্দীন ইতি, ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি 



















