ঢাকা , শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo কুষ্টিয়া সীমান্তে বিএসএফের পুশইন চেষ্টা, বিজিবির বাধায় ফিরে গেল ৪ জন Logo ঠাকুরগাঁওয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ও জেলা শিক্ষা অফিসের যৌথ পরিচ্ছন্নতা অভিযান Logo ১৫ বছর পর ভাঙ্গার কুমার নদে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচঃ লাখো মানুষের ঢল। Logo আলফাডাঙ্গা প্রেসক্লাবে লাইব্রেরি উদ্বোধন Logo রায়ের পর বদলে গেল গোগ্রামের পাঁচ বছরের নির্বাচনী হিসাব Logo শতবর্ষী সরকারি খাল দখলমুক্তে অভিযান, মালামাল স্পট নিলামে Logo মধুখালী থানার এএসআই শরীফুলের সাফল্য, ৬২ হারানো মোবাইল উদ্ধার Logo বিদ্যুৎ সংকটে গঙ্গাচড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সোলার-আইপিএস দিলেন জিওন Logo নরসিংদীর চরাঞ্চলে যৌথ অভিযান, অস্ত্র-গুলাবারুদ ও ১৩৬ ককটেলসহ গ্রেপ্তার ৩ Logo সারাদেশে জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস-২০২৬ পালিত
প্রতিনিধি নিয়োগ
সারা দেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আপনি আপনার এলাকায় সাংবাদিকতা পেশায় আগ্রহী হলে যোগাযোগ করুন। Hotline- +880 1728311111

ঠাকুরগাঁও পৌর-আকচা ভূমি অফিসে দুর্নীতির মচ্ছব—জনগণের সেবক নাকি শোষক?

জসীমউদ্দীন ইতিঃ

 

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারি দপ্তরগুলো হওয়ার কথা ছিল জনগণের আস্থার প্রতীক। কিন্তু ঠাকুরগাঁওয়ের পৌর-আকচা ভূমি অফিসের বর্তমান চিত্র দেখলে মনে হয়, এটি যেন দুর্নীতির এক নিরাপদ অভয়ারণ্য। সম্প্রতি প্রকাশ্যে ঘুষ লেনদেনের যে ছবি জনসমক্ষে এসেছে, তা কেবল একজন অসাধু ব্যক্তির অপকর্ম নয়, বরং এটি পুরো ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়া পচনকেই নির্দেশ করে। প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি চেয়ারে বসে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় বেতনভুক্ত হয়ে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করার এই ধৃষ্টতা তারা কোথায় পায়?

 

সাধারণত ঘুষ বা অবৈধ লেনদেন আড়ালে-আবডালে হওয়ার কথা থাকলেও পৌর-আকচা ভূমি অফিসে তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। প্রাপ্ত স্থিরচিত্রে দেখা যায়, দাপ্তরিক কাজ চলাকালীন টেবিলের ওপর দিয়েই চলছে অর্থের আদান-প্রদান। কোনো প্রকার ভয় বা লোকলজ্জার তোয়াক্কা না করেই সেবাগ্রহীতাদের পকেট কাটা হচ্ছে। এই দৃশ্য প্রমাণ করে যে, সেখানে দুর্নীতির শেকড় এতটাই গভীরে যে, অপরাধীরা এখন আর ধরা পড়ার ভয় পায় না। তাদের এই দুঃসাহস প্রশাসনের নজরদারি ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।

 

ভূমি অফিসে নামজারি (মিউটেশন), পর্চা তোলা বা ভুল সংশোধন—প্রতিটি কাজের জন্য সরকার নির্ধারিত ফি রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, ঠাকুরগাঁওয়ের এই অফিসে সরাসরি কোনো কাজ হওয়া প্রায় অসম্ভব। এখানে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয়, যার একদিকে রয়েছে অফিসের কিছু অসাধু কর্মচারী এবং অন্যদিকে একদল প্রভাবশালী দালাল। সাধারণ মানুষ যখন নিজের বৈধ কাজের জন্য আবেদন করেন, তখন নানা অজুহাতে ফাইল আটকে রাখা হয়। আর যখনই সেই সিন্ডিকেটের দাবি করা ‘উপরি’ বা ঘুষের টাকা পরিশোধ করা হয়, তখন সব জটিলতা জাদুকরীভাবে দূর হয়ে যায়। বিশেষ করে নিরক্ষর বা সাধারণ কৃষকরা এই চক্রের হাতে সবচেয়ে বেশি হেনস্তার শিকার হচ্ছেন।

 

সরকার সারা দেশে ‘ডিজিটাল ভূমি সেবা’ নিশ্চিত করার মাধ্যমে স্বচ্ছতা আনার ঘোষণা দিয়েছে। অনলাইনে আবেদনের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে যাতে ভোগান্তি কমে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন। অনলাইনে আবেদন করার পরও ফাইলের হার্ডকপি অনুমোদনের জন্য যখনই অফিসে যাওয়া হয়, তখনই শুরু হয় নতুন করে হয়রানি। অর্থাৎ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও অসাধু কর্মকর্তাদের মানসিকতার কোনো পরিবর্তন হয়নি। তারা ডিজিটাল সিস্টেমকেও নিজেদের আখের গোছানোর ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।

 

পৌর-আকচা ভূমি অফিসের এই অরাজকতা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে গুঞ্জন থাকলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। বারবার অভিযোগ ওঠার পরও কেন তদন্ত কমিটি আলোর মুখ দেখে না? কেন দোষীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার বদলে কেবল লোকদেখানো বদলি করা হয়? এই নীরবতা কি দুর্নীতির প্রতি মৌন সমর্থন নয়? সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, জেলা প্রশাসন ও ভূমি মন্ত্রণালয় এই ভিডিও বা ছবির সত্যতা যাচাই করে দ্রুত কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেবে। কেবল শাস্তি নয়, বরং দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে যাতে ভবিষ্যতে অন্য কেউ এমন দুঃসাহস না দেখায়।

 

ভূমি অফিস মানেই ঘুষের আখড়া—এই তকমা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। ঠাকুরগাঁওয়ের সচেতন নাগরিক সমাজ আর কোনো হয়রানি বা প্রকাশ্য লুটপাট দেখতে চায় না। আমরা চাই প্রতিটি সেবাগ্রহীতা যেন তার ন্যায্য পাওনা সম্মান ও স্বচ্ছতার সাথে ফিরে পান। পৌর-আকচা ভূমি অফিসের এই দুর্নীতির মচ্ছব বন্ধ করতে হলে অবিলম্বে সিসিটিভি ফুটেজ নিয়মিত মনিটরিং, দালালমুক্ত পরিবেশ এবং দুর্নীতিবাজদের বরখাস্ত করার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জনগণের সেবক হয়ে শোষকের ভূমিকা পালন করা আর কতদিন চলবে? আমরা আশা করি, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এই সংবাদের ভিত্তিতে যথাযথ ব্যবস্থা নিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনবেন।

Tag :
এই অথরের আরো সংবাদ দেখুন

জনপ্রিয় সংবাদ
error: Content is protected !!

ঠাকুরগাঁও পৌর-আকচা ভূমি অফিসে দুর্নীতির মচ্ছব—জনগণের সেবক নাকি শোষক?

আপডেট টাইম : ০৫:৫৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
জসীমউদ্দীন ইতি, ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি :

জসীমউদ্দীন ইতিঃ

 

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারি দপ্তরগুলো হওয়ার কথা ছিল জনগণের আস্থার প্রতীক। কিন্তু ঠাকুরগাঁওয়ের পৌর-আকচা ভূমি অফিসের বর্তমান চিত্র দেখলে মনে হয়, এটি যেন দুর্নীতির এক নিরাপদ অভয়ারণ্য। সম্প্রতি প্রকাশ্যে ঘুষ লেনদেনের যে ছবি জনসমক্ষে এসেছে, তা কেবল একজন অসাধু ব্যক্তির অপকর্ম নয়, বরং এটি পুরো ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়া পচনকেই নির্দেশ করে। প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি চেয়ারে বসে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় বেতনভুক্ত হয়ে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করার এই ধৃষ্টতা তারা কোথায় পায়?

 

সাধারণত ঘুষ বা অবৈধ লেনদেন আড়ালে-আবডালে হওয়ার কথা থাকলেও পৌর-আকচা ভূমি অফিসে তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। প্রাপ্ত স্থিরচিত্রে দেখা যায়, দাপ্তরিক কাজ চলাকালীন টেবিলের ওপর দিয়েই চলছে অর্থের আদান-প্রদান। কোনো প্রকার ভয় বা লোকলজ্জার তোয়াক্কা না করেই সেবাগ্রহীতাদের পকেট কাটা হচ্ছে। এই দৃশ্য প্রমাণ করে যে, সেখানে দুর্নীতির শেকড় এতটাই গভীরে যে, অপরাধীরা এখন আর ধরা পড়ার ভয় পায় না। তাদের এই দুঃসাহস প্রশাসনের নজরদারি ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।

 

ভূমি অফিসে নামজারি (মিউটেশন), পর্চা তোলা বা ভুল সংশোধন—প্রতিটি কাজের জন্য সরকার নির্ধারিত ফি রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, ঠাকুরগাঁওয়ের এই অফিসে সরাসরি কোনো কাজ হওয়া প্রায় অসম্ভব। এখানে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট সক্রিয়, যার একদিকে রয়েছে অফিসের কিছু অসাধু কর্মচারী এবং অন্যদিকে একদল প্রভাবশালী দালাল। সাধারণ মানুষ যখন নিজের বৈধ কাজের জন্য আবেদন করেন, তখন নানা অজুহাতে ফাইল আটকে রাখা হয়। আর যখনই সেই সিন্ডিকেটের দাবি করা ‘উপরি’ বা ঘুষের টাকা পরিশোধ করা হয়, তখন সব জটিলতা জাদুকরীভাবে দূর হয়ে যায়। বিশেষ করে নিরক্ষর বা সাধারণ কৃষকরা এই চক্রের হাতে সবচেয়ে বেশি হেনস্তার শিকার হচ্ছেন।

 

সরকার সারা দেশে ‘ডিজিটাল ভূমি সেবা’ নিশ্চিত করার মাধ্যমে স্বচ্ছতা আনার ঘোষণা দিয়েছে। অনলাইনে আবেদনের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে যাতে ভোগান্তি কমে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন। অনলাইনে আবেদন করার পরও ফাইলের হার্ডকপি অনুমোদনের জন্য যখনই অফিসে যাওয়া হয়, তখনই শুরু হয় নতুন করে হয়রানি। অর্থাৎ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও অসাধু কর্মকর্তাদের মানসিকতার কোনো পরিবর্তন হয়নি। তারা ডিজিটাল সিস্টেমকেও নিজেদের আখের গোছানোর ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।

 

পৌর-আকচা ভূমি অফিসের এই অরাজকতা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে গুঞ্জন থাকলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। বারবার অভিযোগ ওঠার পরও কেন তদন্ত কমিটি আলোর মুখ দেখে না? কেন দোষীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার বদলে কেবল লোকদেখানো বদলি করা হয়? এই নীরবতা কি দুর্নীতির প্রতি মৌন সমর্থন নয়? সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, জেলা প্রশাসন ও ভূমি মন্ত্রণালয় এই ভিডিও বা ছবির সত্যতা যাচাই করে দ্রুত কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেবে। কেবল শাস্তি নয়, বরং দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে যাতে ভবিষ্যতে অন্য কেউ এমন দুঃসাহস না দেখায়।

 

ভূমি অফিস মানেই ঘুষের আখড়া—এই তকমা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। ঠাকুরগাঁওয়ের সচেতন নাগরিক সমাজ আর কোনো হয়রানি বা প্রকাশ্য লুটপাট দেখতে চায় না। আমরা চাই প্রতিটি সেবাগ্রহীতা যেন তার ন্যায্য পাওনা সম্মান ও স্বচ্ছতার সাথে ফিরে পান। পৌর-আকচা ভূমি অফিসের এই দুর্নীতির মচ্ছব বন্ধ করতে হলে অবিলম্বে সিসিটিভি ফুটেজ নিয়মিত মনিটরিং, দালালমুক্ত পরিবেশ এবং দুর্নীতিবাজদের বরখাস্ত করার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জনগণের সেবক হয়ে শোষকের ভূমিকা পালন করা আর কতদিন চলবে? আমরা আশা করি, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এই সংবাদের ভিত্তিতে যথাযথ ব্যবস্থা নিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনবেন।