ইসমাইল হোসেন বাবু, সিনিয়ার স্টাফ রিপোর্টার
মানুষের ভেতর মানুষকে খুঁজে ফেরার যে আহ্বান ফকির লালন শাহ রেখে গেছেন, সেই আহ্বানকে ধারণ করেই ছেঁউড়িয়ায় বসছে সাধুর হাট। জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণের বিভেদ ভুলে মানবতার মিলনমেলায় পরিণত হওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে শুরু হচ্ছে লালন সাঁইজির ১৩৬তম তিরোধান দিবসের স্মরণোৎসব।
মরমি সাধক ফকির লালন শাহের গানে মুখর হতে যাচ্ছে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়া। আগামীকাল শনিবার (১৭ অক্টোবর) থেকে শুরু হচ্ছে বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবসের স্মরণোৎসব। চলবে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত। তিন দিনের এ আয়োজনকে ঘিরে লালন আখড়াবাড়িতে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। বসতে শুরু করেছে মেলার দোকানপাট। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসতে শুরু করেছেন সাধু, বাউল ও লালনভক্তরা। তাঁদের পদচারণায় ধীরে ধীরে জমে উঠছে সাধুসঙ্গের ঐতিহ্যবাহী আসর।
তবে ছেঁউড়িয়ার এ আয়োজন কেবল একটি স্মরণোৎসব কিংবা গ্রামীণ মেলা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শত বছরের সাধুসঙ্গের ঐতিহ্য, গুরু-শিষ্যের আধ্যাত্মিক সম্পর্ক, আত্মসাধনা এবং জাত-পাত ও ধর্মীয় বিভেদের ঊর্ধ্বে মানুষকে দেখার দর্শন। লালন সাঁইয়ের গান ও জীবনদর্শনকে ধারণ করে প্রতিবছর এখানে মিলিত হন নানা শ্রেণি-পেশা ও বিশ্বাসের মানুষ।
কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়াবাড়ি ও আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, স্মরণোৎসবকে সামনে রেখে সাজসজ্জা, মঞ্চ নির্মাণ, মাঠ প্রস্তুত ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছে। লালন আখড়াবাড়ির পাশের মাঠে বসতে শুরু করেছে বিভিন্ন পণ্যের দোকান। ব্যবসায়ীরা তাঁদের পসরা সাজাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। অন্যদিকে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা সাধু-বাউল ও ভক্তদের আগমনে বাড়ছে উৎসবের আমেজ।
মেলা আয়োজক কমিটির সদস্য আলমাস হোসেন বলেন, মেলার প্যান্ডেল নির্মাণ ও মাঠের অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজ প্রায় শেষের পথে। এবারই প্রথম মেলার জন্য আলাদা একটি রাস্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। মেলাকে সফল করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দর্শনার্থীদের একটি সুন্দর ও সুশৃঙ্খল মেলা উপহার দেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
লালন অনুসারীদের কাছে সাধুসঙ্গের গুরুত্ব কেবল ধর্মীয় কিংবা আধ্যাত্মিক আচার-অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক, দর্শনচর্চা, আত্মোপলব্ধি এবং পারস্পরিক ভাববিনিময়ের দীর্ঘ ঐতিহ্য।
ফকির লালন শাহের ঘরের রেজা ফকির জানান, লালন শাহের ঘর, পাঞ্জু শাহের ঘর, দেলবার শাহের ঘর, চৌধুরীর ঘর ও সতীমার ঘর, এই পাঁচ ঘরের গুরুপাঠ আলাদা হলেও তাঁদের মতাদর্শের মধ্যে ছিল গভীর সাদৃশ্য। অভিন্ন দর্শন, বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক বন্ধনের টানে পাঁচ ঘরের অনুসারীরা একত্র হয়ে সাধুসঙ্গে মিলিত হতেন।
তিনি বলেন, লালন সাঁইজি জীবিত থাকাকালে দোল পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে সাধুসঙ্গের আয়োজন করা হতো। সেই ঐতিহ্য শুধু একটি উৎসব ছিল না, বরং গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক, আধ্যাত্মিক সাধনা, সম্প্রীতি ও ভাববিনিময়ের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল। সেই ঐতিহ্যকে হৃদয়ে ধারণ করেই আজও সাধুসঙ্গের আয়োজন করা হচ্ছে।
লালন গবেষক হৃদয় সাঁই বলেন, সাধুসঙ্গের মূল উদ্দেশ্য আত্মশুদ্ধি, গুরুর সান্নিধ্যে দর্শনচর্চা এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তোলা। সময়ের পরিবর্তনে আয়োজনের ধরনে নানা পরিবর্তন এলেও সাধুসঙ্গের ঐতিহ্য ও লালনের দর্শনকে ধারণ করার আকাঙ্ক্ষা এখনো অটুট রয়েছে।
লালনের দর্শনে মানুষই মুখ্য উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, লালনের গান মানেই আত্মানুসন্ধান, মানবপ্রেম ও প্রচলিত সামাজিক বিভেদের বিরুদ্ধে প্রশ্ন। তাঁর গানে ‘মনের মানুষ’ হয়ে ওঠে আত্মার গভীরে থাকা সত্যের সন্ধান, আর ‘অচিন পাখি’ মানুষের দেহ ও অন্তর্জগতের রহস্য অনুসন্ধানের প্রতীক।
‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি’ গানে দেহ ও আত্মার রহস্যকে যেভাবে তুলে ধরেছেন লালন, তা আজও শ্রোতা ও গবেষকদের ভাবায়। জাতপাত, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং সামাজিক বিভেদের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষকে জানার আহ্বান তাঁর দর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
লালন সাঁইয়ের জীবন ও দর্শন নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিভিন্ন ব্যাখ্যা থাকলেও তাঁর গান বাংলা লোকসংগীত ও বাউল ঐতিহ্যের অমূল্য সম্পদ হিসেবে স্বীকৃত। তাঁর সৃষ্টিতে মানবিক মর্যাদা, সাম্য, আত্মজিজ্ঞাসা ও সম্প্রীতির যে বার্তা উঠে এসেছে, তা সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে আজও মানুষের কাছে প্রাসঙ্গিক।
এ কারণেই ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়াবাড়ি শুধু একটি স্মৃতিবিজড়িত স্থান নয়। এটি মরমি সাধনা, লোকসংস্কৃতি ও মানবতাবাদী দর্শনের চর্চাকেন্দ্র। এখানে সাধু-বাউলদের মিলন যেমন ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে, তেমনি নতুন প্রজন্মের কাছেও লালনের জীবনদর্শন পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করে।
লালন অনুসারী মামুন সাধু বলেন, ‘জয় হোক দরবেশ সিরাজ সাঁইয়ের, জয় হোক ফকির লালন সাঁইয়ের! সাঁইজির তিরোধান দিবস উপলক্ষে আমাদের এখানে আসা।’
আগামীকাল বিকেলে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী তিন দিনব্যাপী এ মেলার উদ্বোধন করবেন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন আয়োজিত এ মেলার প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে।
তিন দিনের স্মরণোৎসবকে কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধু, বাউল, লালনভক্ত, গবেষক ও দর্শনার্থীদের সমাগমের প্রত্যাশা করছেন লালন একাডেমির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন হাসান। লালনের গান, সাধুসঙ্গ ও মরমি দর্শনের চর্চার মধ্য দিয়ে আখড়াবাড়ি পরিণত হবে ভাববিনিময় ও সাংস্কৃতিক মিলনক্ষেত্রে।
তিনি বলেন, স্মরণোৎসবে বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগমের সম্ভাবনা থাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রস্তুতি নিয়েছে প্রশাসন। মেলার মাঠ, মাজার এলাকা ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
লালন শাহের মাজারের প্রধান খাদেম মোহাম্মদ আলী শাহ লালন সাঁইজির জীবন ও স্মৃতিবিজড়িত নানা ঘটনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রায় আড়াইশ বছর আগে তৎকালীন কালীগঙ্গা নদীতে একটি ভেলায় অসুস্থ এক শিশুকে পাওয়ার ঘটনা লালনের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। তবে এ ঘটনার ঐতিহাসিক বিবরণ ও শিশুটির বয়স নিয়ে বিভিন্ন মত থাকায় বিষয়টি নিশ্চিতভাবে উপস্থাপনের জন্য আরও তথ্য যাচাই প্রয়োজন।
কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম বলেন, মেলার নিরাপত্তার জন্য কুষ্টিয়া জেলা পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মাধ্যমে নিয়মিত টহল কার্যক্রম চলছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে মেলা শুরুর আগে থেকেই পুলিশের প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। গোয়েন্দা নজরদারির পাশাপাশি মেলার মাঠ ও মাজার এলাকায় টহল দল দায়িত্ব পালন করছে। উৎসব চলাকালে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অন্যতম লক্ষ্য।
লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবস উপলক্ষে ছেঁউড়িয়ার এই আয়োজন প্রতিবছরই বাঙালির লোকজ সংস্কৃতি ও মরমি ঐতিহ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। এখানে কেউ আসেন গানের টানে, কেউ সাধুসঙ্গের আকর্ষণে, আবার কেউ আসেন লালনের দর্শন জানতে ও নিজের অন্তর্জগতের অনুসন্ধানে।
লালনের দর্শনের মূল শক্তি মানুষের প্রতি ভালোবাসা, আত্মজিজ্ঞাসা এবং বিভেদের বিরুদ্ধে অবস্থান। তাঁর গান মানুষকে নিজের ভেতরে তাকাতে শেখায়, অন্যকে জানার আগে নিজেকে জানার প্রশ্ন তোলে। সেই দর্শনের কারণেই তাঁর গান শুধু সংগীতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, হয়ে উঠেছে জীবন ও সমাজকে দেখার একটি বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি।
আগামীকাল থেকে শুরু হতে যাওয়া তিন দিনের স্মরণোৎসব ঘিরে ছেঁউড়িয়ায় তাই শুধু মেলার প্রস্তুতি নয়, প্রস্তুতি চলছে সাধুসঙ্গের ঐতিহ্যকে ধারণ করারও। লালনের গানের সুরে, সাধু-বাউলদের মিলনে এবং ভক্তদের পদচারণায় আবারও মুখর হয়ে উঠবে আখড়াবাড়ি।
মানুষের ভেতর মানুষকে খুঁজে ফেরার যে আহ্বান ফকির লালন শাহ রেখে গেছেন, সেই আহ্বানকে ধারণ করেই ছেঁউড়িয়ায় বসছে সাধুর হাট। জাত-পাত, ধর্ম-বর্ণের বিভেদ ভুলে মানবতার মিলনমেলায় পরিণত হওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে শুরু হচ্ছে লালন সাঁইজির ১৩৬তম তিরোধান দিবসের স্মরণোৎসব।

কুষ্টিয়া সীমান্তে বিএসএফের পুশইন চেষ্টা, বিজিবির বাধায় ফিরে গেল ৪ জন 
সময়ের প্রত্যাশা ডেস্ক : 




















