ইসমাইল হোসেন বাবু, কুষ্টিয়া: কুষ্টিয়ার হরিজন সম্প্রদায় আজও সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। স্বাধীনতার পর ৫৫ বছরেও বাংলাদেশের বাঙালি সমাজ ও অল্প কিছু আদিবাসী সম্প্রদয়ের ব্যাপক উন্নতি হলেও সমাজবিচ্ছিন্ন, উপেক্ষিত ও সমাজে অস্পৃশ্য বলে বিবেচিত সম্প্রদায় হিসেবে চিহ্নিত হরিজনদের আজও কোনো উন্নতি হয়নি। শুধু সমাজ নয়, তারা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত। শহরটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার ক্ষেত্রে যাদের ভূমিকা সর্বাগ্রে, যাদের কারণে শহরের পরিবেশের উন্নয়ন, তাদের মাঝেই নেই কোনো উন্নয়নের ছোঁয়া। হরিজনরা সাধারণত পৌরসভা এবং সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কলোনিতে বসবাস করে। এরই ধারাবাহিকতায় কুষ্টিয়া শহর এবং শহরের আশপাশে কবি আজিজুর রহমান সড়ক, চৈতন্য পল্লী পৌর হরিজন কলোনি, মিল লাইন কলোনি, জিকে কলোনি, পুলিশ লাইন কলোনি, জগতি সুগার মিল কলোনি, ডিসি কোর্ট পৌর মার্কেট, কুমারখালী পৌর হরিজন কলোনি, পোড়াদাহ হরিজন কলোনি, ভেড়ামারা পৌর হরিজন কলোনি ও খোকসা পৌরসভা হরিজন কলোনিতে হরিজনরা বসবাস করে থাকে।
জানা যায়, ব্রিটিশ সরকার হরিজন সম্প্রদায়কে এ দেশে এনেছিলেন তাদের জমিদারি কাজ ত্বরান্বিত করার জন্য। নীল চাষ থেকে শুরু করে বর্জ্য পরিষ্কারের জন্য হরিজন সম্প্রদায়কে ব্যবহার করতেন। তাদেরকে নেপালসহ বিভিন্ন রাষ্ট্র থেকে নিয়ে আসার সময় যেসকল সুযোগ-সুবিধা দিয়েছিল তার মধ্যে বাসস্থান অন্যতম। কুষ্টিয়ার হরিজনদের প্রতিটি পল্লীতে প্রতিটি পরিবারের জন্য একটি করে লাল দালানের ঘর বরাদ্দ ছিল। প্রতিটি ঘরের দৈর্ঘ্য ৬ হাত এবং প্রস্থ ৫ হাত। দীর্ঘদিনের তৈরি পুরোনো ঘিঞ্জি জরাজীর্ণ ঘরের প্রতিটি পরিবারের জন্য একটি কক্ষে রুম বরাদ্দ। এখানে স্বামী-স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে, জামাইসহ পরিবারের অনেককে নিয়ে একটি রুমে অতি মানবেতর জীবনযাপন করে তারা। বিশুদ্ধ খাবার পানি ও স্যানিটেশনের সুব্যবস্থা না থাকায় পুরো কলোনিবাসীর স্বাস্থ্যব্যবস্থা হুমকির মুখে। এভাবে ১২টি পল্লীতে ৫০০টি পরিবারের ৩ হাজার ৫০০ লোক বসবাস করে। এদের মধ্যে শিক্ষার হারও নিতান্তই নগণ্য।
কুষ্টিয়ার অধিকাংশ স্কুলে হরিজন শিশুরা ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত। কিছু কিছু স্কুলে হরিজন শিশুদের ভর্তি নিলেও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তারা স্কুল ছাড়তে বাধ্য হয়। হরিজন শিশুদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারাও স্কুলে যেতে চায়, মানুষের মতো মানুষ হয়ে বাঁচতে চায়। কুষ্টিয়ার কবি আজিজুর রহমান সড়কের চৈতন্য পল্লীর শিশু পূজা বলে, আমার খুব স্কুলে যেতে ইচ্ছে করে এবং বড় হয়ে ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছা। এ রকম অসংখ্য হরিজন শিশুর দাবি—আমরা নিচু হাত হয়ে বাঁচতে চাই না, আমাদেরও ইচ্ছে করে ফুল হয়ে ফুটতে এবং পাখি হয়ে উড়তে। হরিজনদের অধিকাংশ শ্রমজীবী কুষ্টিয়া পৌরসভা এবং বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও চাকরি করে। তাদের অধিকাংশেরই মাসিক সর্বোচ্চ আয়ও তেমন একটা নেই। চাকরির নিয়োগে বৈষম্যের কারণে এরা এখানেও বঞ্চিত হচ্ছে। হরিজনদের দাবি, জেলার প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে তাদের যথাযথ নিয়োগ দিলে তাদের মধ্যে ও বেকারত্ব থাকত না। শহরের পাঁচ রাস্তার মোড়ের হরিজন কলোনির বাসিন্দা চাকরিপ্রত্যাশী বাশন্তী বলেন, আমার যে চাকরিটা হওয়ার কথা ছিল, সেটি অন্যজন ভুয়া সার্টিফিকেট দেখিয়ে সেখানে কাজ করছেন। এভাবে চলতে থাকলে আমরা না খেয়ে মারা যাব। এভাবেই শোষণ, বঞ্চনা আর অবহেলার শিকার হচ্ছেন হরিজনেরা।
এ ব্যাপারে কুষ্টিয়া পৌরসভার কাউন্সিলরগণ বলেন, হরিজনরা অবহেলিত ছিল কারণ তারা মানবমলমূত্র মাথায় নিয়ে পরিষ্কার করত। এখন আর তেমন নেই। তারপরও তাদের জন্য নিজস্ব বাসস্থান ও স্কুলের চিকিৎসা কেন্দ্র ইতিমধ্যে পৌরসভার পক্ষ থেকে আমরা সরকারের কাছে আবেদন করেছি। খুব শীঘ্র হয়তো এটি বাস্তবায়িত হবে। ফলে অচিরেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। মূলত অজ্ঞতা আর অশিক্ষার অভাবে তারা জানে না তাদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে। তাদেরও সমাজে সকলের মতোই মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকবার অধিকার আছে। আর এ অধিকার রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত বাংলাদেশের সংবিধানে—অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র এবং নারী-পুরুষ ভেদে কোনো প্রকার বৈষম্য প্রদর্শন করা চলবে না। এছাড়া সংবিধানের ২৮(৩) অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে জনসাধারণের কোনো বিনোদন বা বিশ্রামের স্থানে প্রবেশের কিংবা কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে কোনো নাগরিককে কোনো রূপ অক্ষমতা, বাধ্যবাধকতা বা শর্তের অধীন করা যাবে না।
এ রকম দলিত থাকা সত্ত্বেও কুষ্টিয়াতে হরিজন সম্প্রদায় সকল ক্ষেত্রে অধিকারবঞ্চিত এবং সকল ক্ষেত্রে বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। কুষ্টিয়াতে ফেয়ার নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কুষ্টিয়ার হরিজন সম্প্রদায়ের দারিদ্র্য বিমোচন ও ক্ষমতায়নের কৌশল নির্ধারণ নিয়ে কাজ করছে।
ফেয়ারের পরিচালক দেওয়ান আক্তারুজ্জামান বলেন, হরিজনরাও মানুষ। একজন মানুষ হিসেবে তার সব অধিকার পাওয়ার কথা কিন্তু তারা সে সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে সকলকে সচেতন হতে হবে।

কুষ্টিয়া সীমান্তে বিএসএফের পুশইন চেষ্টা, বিজিবির বাধায় ফিরে গেল ৪ জন 
সময়ের প্রত্যাশা ডেস্ক : 





















