ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ৫ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
প্রতিনিধি নিয়োগ
দৈনিক সময়ের প্রত্যাশা পত্রিকার জন্য সারা দেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আপনি আপনার এলাকায় সাংবাদিকতা পেশায় আগ্রহী হলে যোগাযোগ করুন।

আইনি জটিলতা কিডনি প্রতিস্থাপনে বাধা

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউটের (নিকডু) প্রবেশপথের একটি ডিজিটাল বোর্ডে চোখ আটকে যায়। যেখানে বলা হচ্ছে, রক্ত সম্পর্কিত নিকটাত্মীয় (বাবা, মা, ভাইবোন, ছেলে, মেয়ে, মামা, চাচা, খালা, ফুপু ও তাদের সন্তানরা এবং দাদা-দাদি, নানা-নানি, স্বামী-স্ত্রী) কিডনি দান করতে পারবেন। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কিডনি রোগীর জীবন রক্ষায় ২২ ধরনের আত্মীয় নিজের একটি কিডনি দিতে পারেন। এর বাইরে অন্য কারও শরীর থেকে কিডনি নিয়ে প্রতিস্থাপন করার আইনি সুযোগ নেই।

 

এই পরিপ্রেক্ষিতে সারা বিশ্বের মতো আজ বৃহস্পতিবার দেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব কিডনি দিবস। কিডনি রোগ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে মার্চ মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার দিবসটি পালন করা হয়। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়েছে ‘সবার জন্য সুস্থ কিডনি’। দিবসটি উপলক্ষে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজ অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। সভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, কিডনি ফাউন্ডেশন, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র, বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশন এবং ক্যাম্পসসহ বিভিন্ন সংগঠন নানা কর্মসূচি পালন করবে।

 

কিডনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও বিভিন্ন সংগঠন এবং রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশে প্রতি বছর ৪০ থেকে ৫০ হাজার মানুষের কিডনি বিকল হয়। এর মধ্যে কমপক্ষে ১৫ হাজার রোগীর জরুরি ভিত্তিতে কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু দেশে কিডনি প্রতিস্থাপনের হার খুবই কম। কিডনি বিকল রোগীর ক্ষেত্রে দেখা যায়, নিকটাত্মীয়ের মধ্যে কেউ কিডনি দান করতে আগ্রহী থাকেন না। আবার কেউ কেউ আগ্রহী থাকলেও রোগীর সঙ্গে ম্যাচ করে না, কিছু ক্ষেত্রে ম্যাচ করার পর গিয়ে দেখা যায় দাতা অন্য কোনো রোগে আক্রান্ত। ফলে তিনি শেষ পর্যন্ত কিডনি দান করতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে আইন সংশোধন করে কিডনি দানকে সবার জন্য উন্মুক্ত করার বিষয়টি সরকারকে বিবেচনা করতে অনুরোধ জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

কিডনি হাসপাতালে কথা হয় নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা আক্তার হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ডাক্তাররা জানিয়েছেন, আমার ছেলের কিডনি বিকল হয়ে গেছে। তার বয়স কম হওয়ায় কিডনি প্রতিস্থাপন করতে বলছেন চিকিৎসকরা। এরপর থেকে কিডনির সংগ্রহে ঘুরছি। আমার স্ত্রী হার্টের রোগী, আমার ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে। ফলে ডাক্তাররা জানিয়েছেন, আমাদের কিডনি নেওয়া যাবে না। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করছি কিন্তু সবাই ভয় পায়, কেউ আমার ছেলেটাকে বাঁচাতে সাহায্য করতে রাজি নয়।’

 

একই হাসপাতালে কথা হয় ফিরোজ মিয়া নামে আরেক রোগীর স্বজনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার ভাই সিদ্দিকের কিডনিতে সমস্যা ধরা পড়ে দুই বছর আগে। এরপর নানা চিকিৎসা দিলেও সুস্থ হচ্ছে না। চিকিৎসকরা কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দিয়েছেন কিন্তু অনেক খোঁজাখুঁজি করেও কেউ কিডনি দিতে আগ্রহী নয়। আমার ভাইয়ের এক বন্ধু কিডনি দিতে রাজি হয়েছিলেন, কিন্তু চিকিৎসকরা জানিয়েছেন আত্মীয়স্বজনরা ছাড়া কেউ নাকি কিডনি দান করতে পারবে না। এই আইনটা যদি সংশোধন করা যেত তাহলে আমার ভাইটাকে সুস্থ করা যেত।’

 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকার বাসিন্দা ফাতেমা জোহরা ২০১৫ সালে তার মেয়ে ফাহমিদাকে একটি কিডনি দান করেছিলেন, যা কিছুদিন পর বিকল বা অকেজো হয়ে যায়। এরপর ফাতেমা কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য দাতা পেলেও আইনগত বাধায় মেয়েকে কিডনি দিতে না পেরে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন।

 

২০১৯ সালের ৫ ডিসেম্বর দেওয়া রায়ে আদালত বলেছিল, বিশেষ কোনো পরিস্থিতিতে মানবিক বিবেচনা ও সহানুভূতিশীল কেউ নিকটাত্মীয় ছাড়াও সম্পর্ক কিংবা পরিচিতি আছে, এমন ব্যক্তিকে স্বেচ্ছায় এবং শর্ত সাপেক্ষে কিডনিসহ শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিতে পারবেন বলে রায় দেয়। একই সঙ্গে বিদ্যমান এ-সংক্রান্ত আইন সংশোধন করে এ রায় অন্তর্ভুক্ত করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রাণলয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে ছয় মাস সময় দিয়েছিল আদালত। বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি খোন্দকার দিলিরুজ্জামানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেয়। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না, রাশনা ইমাম ও মো. শাহীনুজ্জামান শাহীন।

 

প্রচলিত আইন অনুসারে শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বেচা ও কেনা নিষিদ্ধ। তাই আদালত এ বিষয়ে বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছিল। অঙ্গদানের ক্ষেত্রে আবেগপ্রবণ কোনো দান করা হচ্ছে কি না, তা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য প্রতিটি হাসপাাতলে একটি করে প্রত্যয়ন বোর্ড গঠন করতে হবে। ওই বোর্ড আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে দাতার সঙ্গে রোগীর পরিচয় নির্ধারণ করবে। একই সঙ্গে দাতা তার নিজ ইচ্ছায় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দান করছেন কি না, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বেচা-কেনা হচ্ছে কি না তা দেখবে। পাশাপাশি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দাতা মাদকাসক্ত কিংবা মানসিকভাবে সুস্থ কি না, সেটিও নির্ণয় করতে হবে।

 

আদালতের নির্দেশনা কেন বাস্তবায়ন হয়নি কিংবা আইনটি কোথায় আটকে আছে এমন প্রশ্নের জবাবে মো. শাহীনুজ্জামান শাহীন বলেন, আদালত সে সময় অনেকের মতামত নিয়ে শুনানি শেষে মানবিক দিক বিবেচনা করে এ রায় দিয়েছিল। এখন আদালতের রায় বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরকারের। কোনো রোগী বা তার স্বজন যদি সংক্ষুব্ধ হন এ ক্ষেত্রে তিনি পুনরায় রায় বাস্তবায়ন না হওয়ায় সংক্ষুব্ধ হয়ে আদালতে যেতে পারেন।

 

অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৮২ সালে দেশে প্রথম কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউতে)। এরপর প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত ৬১০টি ও সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে ২৬টি, জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউটে ১৮৫ টি, ঢাকা মেডিকেলে ৫টি ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২টি কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। তবে সরকারি হাসপাতালে যত কিডনি প্রতিস্থাপন হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি কিডনি প্রতিস্থাপন করেছেন রাজধানীর সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস (সিকেডি) অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম। তিনি একাই দেড় হাজার কিডনি প্রতিস্থাপন করেছেন। এর বাইরে এভারকেয়ার হাসপাতাল, ইউনাইটেড হাসপাতাল, বারডেম ও পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়।

 

কিডনি প্রতিস্থাপন বৃদ্ধি না পাওয়ার জন্য আইনি সংকট একটা বড় প্রতিবন্ধকতা বলে মনে করেন বিএসএমএমইউর প্রক্টর ও খ্যাতিমান ইউরোলজিস্ট অধ্যাপক হাবিবুর রহমান দুলাল। তিনি বলেন, একটা সময় কেবল বাবা, মা, ভাই, বোন, চাচা, মামাসহ একদম নিকটাত্মীয়রা কিডনি দান করতে পারতেন। এরপর আইন সংসোধন করে ২২ ধরনের আত্মীয়রা কিডনি দান করতে পারবেন বলে আইন করা হয়। যদি কিডনি দানকে উন্মুক্ত করে দেওয়া যেত, অর্থাৎ যে কেউ মানবিক জায়গা থেকে কিডনি দান করতে পারবেন, তাহলে কিডনি প্রতিস্থাপন আরও বাড়ত।

 

কিডনি প্রতিস্থাপন যাতে দেশে না বাড়ে এর জন্য ষড়যন্ত্র চলছে বলে মনে করেন এই চিকিৎসক। তিনি বলেন, দালালদের একটা বড় সিন্ডিকেট আছে যারা চায় না দেশে কিডনি প্রতিস্থাপন হয়। তারা দেশের বাইরে রোগী ও কিডনি ডোনারদের নিয়ে যায় এতে বড় অঙ্কের টাকা পায়। এই সিন্ডিকেট খুব শক্তিশালী। আমাদের গবেষণায় দেখা যায়, যারা দেশ থেকে ভারতে গিয়ে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট করেন, তাদের কিডনি দাতার বড় অংশ দেশ থেকে দালালের মাধ্যমে ভারত যায়। এতে একেকজন রোগীর ২০-৩০ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে। অথচ দেশে কিডনি প্রতিস্থাপন করতে সরকারি হাসপাতালে ২-৩ লাখ ও বেসরকারি হাসপাতালে ১০-১২ লাখ টাকা খরচ হতো।

 

গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশের বাইরে কিডনি প্রতিস্থাপন করতে গিয়ে প্রতি বছর দেশ থেকে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট, যাতায়াত ও চিকিৎসার আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে ২৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা খরচ হয়। যাদের সামর্থ্য আছে তারা সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং ইউরোপ ও আমেরিকায় কিডনি প্রতিস্থাপন করতে যান। এতে তাদের খরচ হয় ৫০ লাখ টাকার বেশি।

 

দেশে দীর্ঘদিন ধরে কিডনি নিয়ে গবেষণা করছেন কিডনি অ্যাওয়ারনেস মনিটরিং অ্যান্ড প্রিভেনশন সোসাইটির (ক্যাম্পস) সভাপতি অধ্যাপক ডা. সামাদ। তিনি বলেন, আদালতের নির্দেশনা মেনে সরকারের উচিত মানবিক দিক বিবেচনা করে যারা কিডনি দান করতে চান, তাদের উৎসাহ দেওয়া। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি হাসপাতালে প্রত্যয়ন বোর্ডকে কার্যকর করতে হবে। এই বোর্ড তদন্ত করে দেখবে কিডনি দান নাকি বিক্রি হচ্ছে। কিডনি দান উন্মুক্ত করে দিলে কিডনি বেচাকেনা বেড়ে যাবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যারা আত্মীয়দের মধ্যে কিডনি দান করেন, তাদের মধ্যে বাবা-মা ছাড়া আর সবাই বিনিময় নিয়েই কিডনি দান করেন। সবচেয়ে ভালো হয় সরকার যদি একটা উদ্যোগ নিয়ে যারা কিডনি দান করতে চায়, তাদের একটা ডেটাবেইস তৈরি করে। এ ক্ষেত্রে যারা কিডনি দান করবে, তাদের সরকার আর্থিক সহযোগিতা করবে, তাদের পরে জটিল রোগ দেখা দিলে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেবে।

 

তিনি বলেন, প্রতি বছর আর্থিক দেনায় যত মানুষ আত্মহত্যা করে, তারা যদি কিডনি দান করে তাদের দেনা মেটাতে পারে, তাহলেও কিন্তু জীবন বেঁচে যায়। এ ক্ষেত্রে যারা সচ্ছল রোগী, তারা কিডনি দাতাকে সাহায্য করতে পারে আর যারা অসচ্ছল তাদের হয়ে সরকার অনুদান দেবে। সবকিছু কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করলে এই কৌশল ইতিবাচক হবে। যারা ভারতে কিডনির দালালি করে আমি দেখেছি তারা বিলাসবহুল জীবন যাপন করে। তাদের বাড়ি-গাড়ি আছে। ভারতে প্রতিস্থাপন হওয়া কিডনির বড় অংশ আমাদের দেশ থেকে যাচ্ছে। আমাদের দাতা ও রোগী, শুধু চিকিৎসা হচ্ছে ভারতে আর এতে বছরে কোটি কোটি টাকা ভারতে চলে যাচ্ছে।

 

  • সংগৃহীত- দেশ রূপান্তর
  • প্রতিবেদক- আব্দুল্লাহ আল তোফায়েল
Tag :
এই অথরের আরো সংবাদ দেখুন

জনপ্রিয় সংবাদ
error: Content is protected !!

আইনি জটিলতা কিডনি প্রতিস্থাপনে বাধা

আপডেট টাইম : ০৯:২৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মার্চ ২০২৪

রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউটের (নিকডু) প্রবেশপথের একটি ডিজিটাল বোর্ডে চোখ আটকে যায়। যেখানে বলা হচ্ছে, রক্ত সম্পর্কিত নিকটাত্মীয় (বাবা, মা, ভাইবোন, ছেলে, মেয়ে, মামা, চাচা, খালা, ফুপু ও তাদের সন্তানরা এবং দাদা-দাদি, নানা-নানি, স্বামী-স্ত্রী) কিডনি দান করতে পারবেন। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী কিডনি রোগীর জীবন রক্ষায় ২২ ধরনের আত্মীয় নিজের একটি কিডনি দিতে পারেন। এর বাইরে অন্য কারও শরীর থেকে কিডনি নিয়ে প্রতিস্থাপন করার আইনি সুযোগ নেই।

 

এই পরিপ্রেক্ষিতে সারা বিশ্বের মতো আজ বৃহস্পতিবার দেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব কিডনি দিবস। কিডনি রোগ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে মার্চ মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার দিবসটি পালন করা হয়। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়েছে ‘সবার জন্য সুস্থ কিডনি’। দিবসটি উপলক্ষে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজ অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। সভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, কিডনি ফাউন্ডেশন, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র, বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশন এবং ক্যাম্পসসহ বিভিন্ন সংগঠন নানা কর্মসূচি পালন করবে।

 

কিডনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও বিভিন্ন সংগঠন এবং রোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশে প্রতি বছর ৪০ থেকে ৫০ হাজার মানুষের কিডনি বিকল হয়। এর মধ্যে কমপক্ষে ১৫ হাজার রোগীর জরুরি ভিত্তিতে কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন হয়। কিন্তু দেশে কিডনি প্রতিস্থাপনের হার খুবই কম। কিডনি বিকল রোগীর ক্ষেত্রে দেখা যায়, নিকটাত্মীয়ের মধ্যে কেউ কিডনি দান করতে আগ্রহী থাকেন না। আবার কেউ কেউ আগ্রহী থাকলেও রোগীর সঙ্গে ম্যাচ করে না, কিছু ক্ষেত্রে ম্যাচ করার পর গিয়ে দেখা যায় দাতা অন্য কোনো রোগে আক্রান্ত। ফলে তিনি শেষ পর্যন্ত কিডনি দান করতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে আইন সংশোধন করে কিডনি দানকে সবার জন্য উন্মুক্ত করার বিষয়টি সরকারকে বিবেচনা করতে অনুরোধ জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

কিডনি হাসপাতালে কথা হয় নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা আক্তার হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ডাক্তাররা জানিয়েছেন, আমার ছেলের কিডনি বিকল হয়ে গেছে। তার বয়স কম হওয়ায় কিডনি প্রতিস্থাপন করতে বলছেন চিকিৎসকরা। এরপর থেকে কিডনির সংগ্রহে ঘুরছি। আমার স্ত্রী হার্টের রোগী, আমার ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে। ফলে ডাক্তাররা জানিয়েছেন, আমাদের কিডনি নেওয়া যাবে না। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করছি কিন্তু সবাই ভয় পায়, কেউ আমার ছেলেটাকে বাঁচাতে সাহায্য করতে রাজি নয়।’

 

একই হাসপাতালে কথা হয় ফিরোজ মিয়া নামে আরেক রোগীর স্বজনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার ভাই সিদ্দিকের কিডনিতে সমস্যা ধরা পড়ে দুই বছর আগে। এরপর নানা চিকিৎসা দিলেও সুস্থ হচ্ছে না। চিকিৎসকরা কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দিয়েছেন কিন্তু অনেক খোঁজাখুঁজি করেও কেউ কিডনি দিতে আগ্রহী নয়। আমার ভাইয়ের এক বন্ধু কিডনি দিতে রাজি হয়েছিলেন, কিন্তু চিকিৎসকরা জানিয়েছেন আত্মীয়স্বজনরা ছাড়া কেউ নাকি কিডনি দান করতে পারবে না। এই আইনটা যদি সংশোধন করা যেত তাহলে আমার ভাইটাকে সুস্থ করা যেত।’

 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকার বাসিন্দা ফাতেমা জোহরা ২০১৫ সালে তার মেয়ে ফাহমিদাকে একটি কিডনি দান করেছিলেন, যা কিছুদিন পর বিকল বা অকেজো হয়ে যায়। এরপর ফাতেমা কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য দাতা পেলেও আইনগত বাধায় মেয়েকে কিডনি দিতে না পেরে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন।

 

২০১৯ সালের ৫ ডিসেম্বর দেওয়া রায়ে আদালত বলেছিল, বিশেষ কোনো পরিস্থিতিতে মানবিক বিবেচনা ও সহানুভূতিশীল কেউ নিকটাত্মীয় ছাড়াও সম্পর্ক কিংবা পরিচিতি আছে, এমন ব্যক্তিকে স্বেচ্ছায় এবং শর্ত সাপেক্ষে কিডনিসহ শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিতে পারবেন বলে রায় দেয়। একই সঙ্গে বিদ্যমান এ-সংক্রান্ত আইন সংশোধন করে এ রায় অন্তর্ভুক্ত করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রাণলয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে ছয় মাস সময় দিয়েছিল আদালত। বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি খোন্দকার দিলিরুজ্জামানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেয়। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্না, রাশনা ইমাম ও মো. শাহীনুজ্জামান শাহীন।

 

প্রচলিত আইন অনুসারে শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বেচা ও কেনা নিষিদ্ধ। তাই আদালত এ বিষয়ে বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছিল। অঙ্গদানের ক্ষেত্রে আবেগপ্রবণ কোনো দান করা হচ্ছে কি না, তা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য প্রতিটি হাসপাাতলে একটি করে প্রত্যয়ন বোর্ড গঠন করতে হবে। ওই বোর্ড আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে দাতার সঙ্গে রোগীর পরিচয় নির্ধারণ করবে। একই সঙ্গে দাতা তার নিজ ইচ্ছায় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দান করছেন কি না, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বেচা-কেনা হচ্ছে কি না তা দেখবে। পাশাপাশি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দাতা মাদকাসক্ত কিংবা মানসিকভাবে সুস্থ কি না, সেটিও নির্ণয় করতে হবে।

 

আদালতের নির্দেশনা কেন বাস্তবায়ন হয়নি কিংবা আইনটি কোথায় আটকে আছে এমন প্রশ্নের জবাবে মো. শাহীনুজ্জামান শাহীন বলেন, আদালত সে সময় অনেকের মতামত নিয়ে শুনানি শেষে মানবিক দিক বিবেচনা করে এ রায় দিয়েছিল। এখন আদালতের রায় বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরকারের। কোনো রোগী বা তার স্বজন যদি সংক্ষুব্ধ হন এ ক্ষেত্রে তিনি পুনরায় রায় বাস্তবায়ন না হওয়ায় সংক্ষুব্ধ হয়ে আদালতে যেতে পারেন।

 

অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৮২ সালে দেশে প্রথম কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউতে)। এরপর প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত ৬১০টি ও সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে ২৬টি, জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউটে ১৮৫ টি, ঢাকা মেডিকেলে ৫টি ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২টি কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। তবে সরকারি হাসপাতালে যত কিডনি প্রতিস্থাপন হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি কিডনি প্রতিস্থাপন করেছেন রাজধানীর সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস (সিকেডি) অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম। তিনি একাই দেড় হাজার কিডনি প্রতিস্থাপন করেছেন। এর বাইরে এভারকেয়ার হাসপাতাল, ইউনাইটেড হাসপাতাল, বারডেম ও পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়।

 

কিডনি প্রতিস্থাপন বৃদ্ধি না পাওয়ার জন্য আইনি সংকট একটা বড় প্রতিবন্ধকতা বলে মনে করেন বিএসএমএমইউর প্রক্টর ও খ্যাতিমান ইউরোলজিস্ট অধ্যাপক হাবিবুর রহমান দুলাল। তিনি বলেন, একটা সময় কেবল বাবা, মা, ভাই, বোন, চাচা, মামাসহ একদম নিকটাত্মীয়রা কিডনি দান করতে পারতেন। এরপর আইন সংসোধন করে ২২ ধরনের আত্মীয়রা কিডনি দান করতে পারবেন বলে আইন করা হয়। যদি কিডনি দানকে উন্মুক্ত করে দেওয়া যেত, অর্থাৎ যে কেউ মানবিক জায়গা থেকে কিডনি দান করতে পারবেন, তাহলে কিডনি প্রতিস্থাপন আরও বাড়ত।

 

কিডনি প্রতিস্থাপন যাতে দেশে না বাড়ে এর জন্য ষড়যন্ত্র চলছে বলে মনে করেন এই চিকিৎসক। তিনি বলেন, দালালদের একটা বড় সিন্ডিকেট আছে যারা চায় না দেশে কিডনি প্রতিস্থাপন হয়। তারা দেশের বাইরে রোগী ও কিডনি ডোনারদের নিয়ে যায় এতে বড় অঙ্কের টাকা পায়। এই সিন্ডিকেট খুব শক্তিশালী। আমাদের গবেষণায় দেখা যায়, যারা দেশ থেকে ভারতে গিয়ে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট করেন, তাদের কিডনি দাতার বড় অংশ দেশ থেকে দালালের মাধ্যমে ভারত যায়। এতে একেকজন রোগীর ২০-৩০ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে। অথচ দেশে কিডনি প্রতিস্থাপন করতে সরকারি হাসপাতালে ২-৩ লাখ ও বেসরকারি হাসপাতালে ১০-১২ লাখ টাকা খরচ হতো।

 

গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দেশের বাইরে কিডনি প্রতিস্থাপন করতে গিয়ে প্রতি বছর দেশ থেকে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট, যাতায়াত ও চিকিৎসার আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে ২৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা খরচ হয়। যাদের সামর্থ্য আছে তারা সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং ইউরোপ ও আমেরিকায় কিডনি প্রতিস্থাপন করতে যান। এতে তাদের খরচ হয় ৫০ লাখ টাকার বেশি।

 

দেশে দীর্ঘদিন ধরে কিডনি নিয়ে গবেষণা করছেন কিডনি অ্যাওয়ারনেস মনিটরিং অ্যান্ড প্রিভেনশন সোসাইটির (ক্যাম্পস) সভাপতি অধ্যাপক ডা. সামাদ। তিনি বলেন, আদালতের নির্দেশনা মেনে সরকারের উচিত মানবিক দিক বিবেচনা করে যারা কিডনি দান করতে চান, তাদের উৎসাহ দেওয়া। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি হাসপাতালে প্রত্যয়ন বোর্ডকে কার্যকর করতে হবে। এই বোর্ড তদন্ত করে দেখবে কিডনি দান নাকি বিক্রি হচ্ছে। কিডনি দান উন্মুক্ত করে দিলে কিডনি বেচাকেনা বেড়ে যাবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যারা আত্মীয়দের মধ্যে কিডনি দান করেন, তাদের মধ্যে বাবা-মা ছাড়া আর সবাই বিনিময় নিয়েই কিডনি দান করেন। সবচেয়ে ভালো হয় সরকার যদি একটা উদ্যোগ নিয়ে যারা কিডনি দান করতে চায়, তাদের একটা ডেটাবেইস তৈরি করে। এ ক্ষেত্রে যারা কিডনি দান করবে, তাদের সরকার আর্থিক সহযোগিতা করবে, তাদের পরে জটিল রোগ দেখা দিলে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেবে।

 

তিনি বলেন, প্রতি বছর আর্থিক দেনায় যত মানুষ আত্মহত্যা করে, তারা যদি কিডনি দান করে তাদের দেনা মেটাতে পারে, তাহলেও কিন্তু জীবন বেঁচে যায়। এ ক্ষেত্রে যারা সচ্ছল রোগী, তারা কিডনি দাতাকে সাহায্য করতে পারে আর যারা অসচ্ছল তাদের হয়ে সরকার অনুদান দেবে। সবকিছু কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করলে এই কৌশল ইতিবাচক হবে। যারা ভারতে কিডনির দালালি করে আমি দেখেছি তারা বিলাসবহুল জীবন যাপন করে। তাদের বাড়ি-গাড়ি আছে। ভারতে প্রতিস্থাপন হওয়া কিডনির বড় অংশ আমাদের দেশ থেকে যাচ্ছে। আমাদের দাতা ও রোগী, শুধু চিকিৎসা হচ্ছে ভারতে আর এতে বছরে কোটি কোটি টাকা ভারতে চলে যাচ্ছে।

 

  • সংগৃহীত- দেশ রূপান্তর
  • প্রতিবেদক- আব্দুল্লাহ আল তোফায়েল