ঢাকা , শুক্রবার, ০৮ মে ২০২৬, ২৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo দেড় লাখ টাকার গাছ ৫০ হাজারে নিলাম Logo ফরিদপুরে ট্রিপল মার্ডারঃ ১০ ঘণ্টায় গ্রেফতার প্রধান আসামি, উদ্ধার কোদাল Logo ফরিদপুরে ‘শ্মশান বন্ধু’ কানু সেন অনেকটাই সুস্থ Logo বাঘায় সুষ্ঠ সুন্দর পরিবেশে প্রাথমিকের বৃত্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিতঃ উপস্থিতির হারে বালিকা এগিয়ে Logo নরসিংদীর শিবপুরে ২৬ মামলার আসামিসহ দুই ডাকাত গ্রেপ্তার Logo খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের অন্যতম ধর্মীয় উৎসব ইস্টার সানডে পালিত হবে আগামীকাল Logo কুষ্টিয়া সীমান্তে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় মাদক উদ্ধার Logo সকল রাজনৈক দল, ধর্ম, বর্ণ ও শ্রেণী পেশার মানুষের সেবা করতে বিএনপি সরকার ওয়াদাবদ্ধ Logo সেনবাগে কাওমী ও হাফেজিয়া মাদ্রাসায় ঈদ উপহার বিতরণ করলেন লায়ন শাহাদাত হোসেন Logo সিংড়ায় পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা, গ্রেপ্তার ১০
প্রতিনিধি নিয়োগ
দৈনিক সময়ের প্রত্যাশা পত্রিকার জন্য সারা দেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আপনি আপনার এলাকায় সাংবাদিকতা পেশায় আগ্রহী হলে যোগাযোগ করুন। Hotline- +880 9617 179084

কুষ্টিয়ায় নিহত পীরের আস্তানা পরিদর্শন করলেন খুলনার অতিরিক্ত ডিআইজ

--দৌলতপুরে পীর শামীমের দরবার পরিদর্শন করেন খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি।

ইসমাইল হােসেন বাবুঃ

 

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে নিহত পীর আবদুর রহমান ওরফে শামীম জাহাঙ্গীরের দরবার এখন ধ্বংসস্তূপ। একদিন আগেও যা ছিল সাজানো-গোছানো। গতকাল শনিবার (১১ এপ্রিল) সেখানে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও হত্যাকাণ্ডের পর এলাকায় এখন থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। রোববার (১২ এপ্রিল) বেলা ১১টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ জয়নুদ্দীন। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি জানিয়ে তিনি বলেছেন, প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ নিজ উদ্যোগে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

 

খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ জয়নুদ্দীন বলেছেন, ধর্ম অবমাননার ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দেশে প্রচলিত আইনের মাধ্যমে এর সুষ্ঠু বিচার হওয়া উচিত। তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে সহিংসতা ঘটেছে, তা মোটেই কাম্য নয়। রোববার (১২ এপ্রিল) দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।

 

তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যাতে আইনশৃঙ্খলার অবনতি না ঘটে, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এলাকায় অবস্থান করছে। তিনি আরও বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ নিজ উদ্যোগে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

 

ঘটনার আগে প্রশাসনের কাছে গোয়েন্দা তথ্য থাকা সত্ত্বেও কেন কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেরি হলো- এমন প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত ডিআইজি বলেন, তথ্য পাওয়ার পরই পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল।

 

ঊল্লেখ্য,কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ধর্ম অবমাননাকর অভিযোগে পীর আবদুর রহমান ওরফে শামীম জাহাঙ্গীর (৫৫) নামে এক কথিত পীরকে কুপিয়ে হত্যা করেছে বিক্ষুব্ধ মুসল্লি ও এলাকাবাসী।গতকাল শনিবার (১১ এপ্রিল) দুপুর আড়াইটার দিকে উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের দক্ষিন-পশ্চিম ফিলিপনগর গ্রামে অবস্থিত ওই পীরকে হত্যা শেষে তার আস্তানায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। হামলায় পীর শামীমের আরও দুই অনুসারী গুরুতর আহত হয়েছেন। নিহত শামীম পীর ফিলিপনগর এলাকার সামসুল ইসলামের ছেলে। স্থানীয়দের দাবি, তিনি নিজেকে ‘কালান্দার বাবা জাহাঙ্গীর সুরেশ্বরী’র অনুসারী হিসেবে পরিচয় দিতেন।

 

অভিযোগ রয়েছে, সম্প্রতি শামীম তার দরবারে অনুসারীদের উদ্দেশ্যে পবিত্র কুরআন নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেন। এ বক্তব্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত কাল শনিবার এপ্রিল বেলা ১টার দিকে শত শত বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ফিলিপনগরে অবস্থিত শামীমের দরবার শরীফ ঘেরাও করেন। এক পর্যায়ে উত্তেজিত জনতা দরবারে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও একাধিক কক্ষে অগ্নিসংযোগ করেন। এ সময় দরবারের ভেতরে থাকা শামীম ও তার দুই অনুসারী এলোপাতাড়ি পিটুনির শিকার হন।

 

কথিত পীর শামীম রেজা স্থানীয়ভাবে ভণ্ড পীর হিসেবে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে নিজেকে কখনো আল্লাহ, কখনো নবী বা ভগবান দাবি করার অভিযোগ রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডে দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছিল।

 

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কথিত পীর শামীম রেজা ওরফে শামীম জাহাঙ্গীরের দেওয়া পবিত্র কোরআন অবমাননাকর বক্তব্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছড়িয়ে পড়লে এলাকাবাসী ও ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। পরে তারা সংঘবদ্ধ হয়ে বিক্ষোভ মিছিল বের করে তার দরবার বা আস্তায় হামলা চালায়। এসময় হামলকারীরা শামীম রেজাকে এলোপাতাড়িভাবে কুপিয়ে ও পিটিয়ে গুরুতর জখম করে আস্তানায় আগুন জ্বালিয়েদেয়।

 

শামীমের ভক্তরা আশংকজনক অবস্থায় শামীমকে উদ্ধার করে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে সেখান কার কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। খবর পেয়ে দৌলতপুর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।

 

আজ রবিবার সরেজমিনে ঘটনাস্থলে গিয়ে জানা যায়,উপজেলার ফিলিপনগরে নিহত পীর আবদুর রহমানের ভক্ত জামিরন বলেন গতকাল শনিবার দুপুরের দিক আমি দরবারের গেটের সামনে দাড়া ছিনু। দেখনু বেশ কিচ্ছু লােকজন রড–লাঠি নিয়ে মিছিল করছে। এরপর দরবারের গেট ভাঙচুর শুরু ভিতরে প্রবেশ করে তারা স্লোগান দিতে দিতে দরবারের ভিতরে ঢুকেই ভাঙচুর শুরু করতে থাকে। দরবারের দোতলায় বাবার (পীর) ঘরের সামনে যায় তারা। দরজা লাথি দিয়ে ভাঙে শুরু করে। এক পর্যায়র ভিতরে গিয়ে বাবাকে গলায় থাকা লার গামছা ধরে টেনে বের করে হাতে থাকা রড দিই বেদম মারপীট করতে থাকে।

 

এলোপাতাড়ি ভাবে মাথায় মারতে থাকে। টেনেহিঁচড়ে নিচে নামায়। সেখানে একজন বলতে থাকে, শালা ভন্ড এখন বাইচে আছেরে এ কথা বলে আবার মারতে থাকে পীরকে। মার ঠেকাতে গেলে আরেক ভক্ত রিমা খাতুন। হামলার সময় জামিরন তাঁর ডান হাতের মাঝখানের আঙুলের মাঝে আঘাত পায়। তিনি দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চিকিৎসা নিয়েছেন।

 

আজ রোববার বেলা সারে১২টার দিকে দরবারের সামনে একটি বাড়িতে বসে জামিরনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলতে থাকেন, বাবাকে মারতে মারতে নিচে নিয়ে আসা হয়। প্রথম যখন বাবাকে বের করে, তখন বাবা হাতজোড় করেছিল। কথা বলার সুযোগ চেয়েছিল। কিন্তু এলোপাতাড়ি যেভাবে মারছিল, কেউ তাঁর কথা শোনেনি। নিচে নামিয়ে যখন রড দিয়ে এলোপাতাড়ি মাথায়, মুখে, নাকের ওপর কোপাচ্ছিল, তখন একবার শুধু বলতে শোনা গেছে ‘ইয়া মুরশিদ’ এরপর আর কোনো কথা বাবা বলতে পারেননি।

 

জামিরন আরও বলেন, যারা লাঠিসোঁটা নিয়ে এসেছিল, তারা সংখ্যায় প্রায় ৮০ থেকে ৯০ জন। বয়স ১৫ থেকে ২৫ বছরের এর মধ্যে। কেউ কেউ বড় ছিল। তিনি আরও বলেন, তাদের আসা দেখে আমরা ভেবেছিনু হয়তো কোনো আলোচনা করতে আসছে। কিন্তু তারা ভাঙচুর, হামলা, বাবাকে মেরে ফেলবে এটা বুঝতে পারিনি। পরে বুঝছি তারা প্রস্তুতি নিয়ে আইছিল। পরিকল্পনা করে বাবাকে হত্যা করেছে।

 

দরবারে সরেজমিনে দেখা গেল, দুটি দালানের ভেতরে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়েছে। আগুনে ছাই হয়ে গেছে দুটি আধা পাকা ঘর। একটি ঘর থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছিল। ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে–ছিটিয়ে পড়ে আছে। আশেপাশের বিভিন্ন বয়সী নারী, পুরুষ, শিশু দরবারের এসে নীরব দাঁড়িয়ে আছে। দরবারের সামনে ১৫ থেকে ২০ জন পুলিশ সদস্য চেয়ার পেতে বসে আছেন।

 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, পীর শামীম পবিত্র কোরআন সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন,কয়েক বছর আগের ৩০ সেকেন্ডের এমন একটি ভিডিও গত শুক্রবার সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল শনিবার সকালে শামীমের দরবার থেকে আধা কিলোমিটার দূরে আবেদের ঘাট এলাকায় শতাধিক মানুষ জড়ো হন। এরপর দুপুরের পর তাঁরা ওই দরবারে হামলা চালান এবং পুলিশের উপস্থিতিতেই শামীমকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করেন।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ১৮ মিনিটের একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, গ্রামের পাকা সড়কে শতাধিক মানুষ স্লোগান দিয়ে শামীমের দরবারের দিকে যান। মিছিলে থাকা লোকজনের একটি অংশ তাঁর দরবারের একতলা দুটি পাকা ভবন ও একটি টিনশেড ঘরে ঢুকে পড়ে। তাঁরা ভবনের ছাদসহ ঘরগুলোতে ভাঙচুর চালান ও আগুন ধরিয়ে দেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা গেছে, হামলার সময় ওই দরবারের ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচ থেকে সাতজন আহত হয়েছেন। অন্যরা দৌড়ে চলে যান। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা এসে আগুন নেভান।পাশাপাশি পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

 

এ ঘটনায় গতকাল গণসংহতি আন্দোলন, জাতীয় নাগরিক পার্টি, এবি পার্টি, উদীচী, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও সুফি সমাজকেন্দ্রিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘মাকাম’সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন পৃথক বিবৃতি দেয়। বিবৃতিতে তারা পীর শামীম রেজা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে।

 

এর আগেও ২০২১ সালের মে মাসে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতসহ বিভিন্ন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দৌলতপুর থানায় মামলা দায়ের করা হয়। সে সময় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর মুক্তি পেয়ে তিনি পুনরায় একই ধরনের কর্মকাণ্ড শুরু করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পীরের আস্তানায় হামলা চালিয়ে হত্যার ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি। আজ শনিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ নিন্দা জানানো হয়েছে।

 

কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য রেজা আহম্মেদ বাচ্চু মোল্লা বলেন, ‘আমি ঢাকা থেকে ফেরার পথে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যাই। কেউ যদি সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, সেটা প্রশাসন দেখবে। হত্যা করার অধিকার কাউকে দেয়নি। সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রশাসন এর বিচার করবে।’

 

পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু এবং সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদের স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগকে কেন্দ্র করে পীর দাবিকারী ব্যক্তিকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা এবং তাঁর দরবারে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ন্যক্কারজনক ঘটনায় গভীর উদ্বেগ, তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন আমার বাংলাদেশ (এবি পার্টি)।

 

এক যৌথ বিবৃতিতে দুই নেতা বলেন, কোনো অভিযোগ বা মতভিন্নতার জবাব কখনোই দলবদ্ধ সন্ত্রাস, সহিংসতা কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মাধ্যমে হতে পারে না। এ ধরনের বর্বরতা শুধু মানবিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করে না বরং রাষ্ট্রের আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।

 

দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌহিদুল হাসান তুহিন জানান, শামীমের মুখমণ্ডলে ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। শরীরের বিভিন্ন স্থানেও আঘাত করা হয়েছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে।

 

এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহামুদ জানান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যা তারা দেখেছেন। ভিডিওটি পুরোনো বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভিডিওটি দেখে মুসল্লি ও বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী তার আস্তানায় হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা আছে।

 

তিনি আরও জানান, নিহতের মরদেহ কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। ময়নাতদন্তের কাজ আজ রবিবার দুপুরে শেষ হলে নিজ এলাকায় পীরের লাশ আনা হয়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কেউ মামলা করেনি। তবে মামলার প্রস্তুতি চলছে।

 

কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) জানান, বেলা ১টার দিকে মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। গোটা শরীরে একাধিক জখমের চিহ্ন পাওয়া গেছে এবং মাথা, ঘাড়, পিঠে তুলনামূলক গভীর যখমের আলামত দেখা যায়। একাধিক যখমের কারণে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে।

 

কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, পুরোনো একটি ভিডিও নতুন করে ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ তাকে উদ্ধার করলেও জনতার তুলনায় সদস্য সংখ্যা কম থাকায় পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের শনাক্তে কাজ চলছে। ঘটনাটি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

 

জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি শান্ত। বিজিবির টহলসহ সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মোতায়েন রয়েছেন। আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বাড়িতেও পুলিশি পাহারা থাকবে। এ ছাড়া দৌলতপুরের হোসেনাবাদের বাসিন্দা লালন শিল্পী শফি মণ্ডলের গ্রামের বাড়িতে ও পুলিশ পাহারা রাখা হয়েছে। যদিও শফি মণ্ডল বর্তমানে ঢাকায় রয়েছেন।

 

সকালে খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজ শেখ জয়নুদ্দিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সাংবাদিকদের জানান, যে হত্যাকাণ্ড হয়েছে এটা কোন ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিলে আমাদের প্রচলিত আইনেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতো। আমি চাইবো এই ফিলিপনগর এলাকার মানুষের কাছ থেকে আর কোনো আইনশৃঙ্খলার অবনতি যেন না হয়। আমাদের কোনো আটক নেই এখনও। আমরা এর সঠিক বিচার করবো।

 

কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য রেজা আহম্মেদ বাচ্চু মোল্লা বলেন, আমি ঢাকা থেকে ফেরার পথে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যাই। কেউ যদি সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, সেটা প্রশাসন দেখবে। হত্যা করার অধিকার কাউকে দেয়নি। সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রশাসন এর বিচার করবে।

 

ঘটনার পর থেকে ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনী ও র‌্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় সংসদ সদস্যও ঘটনাস্থল ঘুরে দেখেছেন।

 

কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, পুরোনো একটি ভিডিও নতুন করে ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তাঁকে (পীর শামীম) উদ্ধার করলেও জনতার তুলনায় পুলিশ সদস্য সংখ্যা কম থাকায় পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের শনাক্তে কাজ চলছে। ঘটনাটি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে।

 

নিহত আব্দুর রহমান ওরফে শামীম (৫৫) পীরের ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ তাঁর গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হচ্ছে। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে পাঁচ’শ বিঘার মাঠ এলাকার কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।

 

জানা যায়, জীবিতাবস্থায় তিনি উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের দারোগার মোড় এলাকায় তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘শামীম বাবার দরবার শরিফে’ই সমাহিত হতে চেয়েছিলেন। তবে নানা রাজনৈতিক ও সামাজিক জটিলতায় পরিবার তাঁকে গ্রামের বাড়িতে সমাহিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

Tag :
এই অথরের আরো সংবাদ দেখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

সেনবাগ ছাত্রদলে ছাত্রলীগ আতঙ্ক! গুরুত্বপূর্ণ পদে আসছেন ‘বিতর্কিত’ মুখ?

error: Content is protected !!

কুষ্টিয়ায় নিহত পীরের আস্তানা পরিদর্শন করলেন খুলনার অতিরিক্ত ডিআইজ

আপডেট টাইম : ০৫:৫৭ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬
ইসমাইল হোসেন বাবু, সিনিয়র ষ্টাফ রিপোর্টার :

ইসমাইল হােসেন বাবুঃ

 

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে নিহত পীর আবদুর রহমান ওরফে শামীম জাহাঙ্গীরের দরবার এখন ধ্বংসস্তূপ। একদিন আগেও যা ছিল সাজানো-গোছানো। গতকাল শনিবার (১১ এপ্রিল) সেখানে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও হত্যাকাণ্ডের পর এলাকায় এখন থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। রোববার (১২ এপ্রিল) বেলা ১১টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ জয়নুদ্দীন। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি জানিয়ে তিনি বলেছেন, প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ নিজ উদ্যোগে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

 

খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ জয়নুদ্দীন বলেছেন, ধর্ম অবমাননার ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। দেশে প্রচলিত আইনের মাধ্যমে এর সুষ্ঠু বিচার হওয়া উচিত। তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে সহিংসতা ঘটেছে, তা মোটেই কাম্য নয়। রোববার (১২ এপ্রিল) দুপুরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।

 

তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যাতে আইনশৃঙ্খলার অবনতি না ঘটে, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এলাকায় অবস্থান করছে। তিনি আরও বলেন, পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ নিজ উদ্যোগে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

 

ঘটনার আগে প্রশাসনের কাছে গোয়েন্দা তথ্য থাকা সত্ত্বেও কেন কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেরি হলো- এমন প্রশ্নের জবাবে অতিরিক্ত ডিআইজি বলেন, তথ্য পাওয়ার পরই পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল।

 

ঊল্লেখ্য,কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ধর্ম অবমাননাকর অভিযোগে পীর আবদুর রহমান ওরফে শামীম জাহাঙ্গীর (৫৫) নামে এক কথিত পীরকে কুপিয়ে হত্যা করেছে বিক্ষুব্ধ মুসল্লি ও এলাকাবাসী।গতকাল শনিবার (১১ এপ্রিল) দুপুর আড়াইটার দিকে উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের দক্ষিন-পশ্চিম ফিলিপনগর গ্রামে অবস্থিত ওই পীরকে হত্যা শেষে তার আস্তানায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। হামলায় পীর শামীমের আরও দুই অনুসারী গুরুতর আহত হয়েছেন। নিহত শামীম পীর ফিলিপনগর এলাকার সামসুল ইসলামের ছেলে। স্থানীয়দের দাবি, তিনি নিজেকে ‘কালান্দার বাবা জাহাঙ্গীর সুরেশ্বরী’র অনুসারী হিসেবে পরিচয় দিতেন।

 

অভিযোগ রয়েছে, সম্প্রতি শামীম তার দরবারে অনুসারীদের উদ্দেশ্যে পবিত্র কুরআন নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেন। এ বক্তব্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত কাল শনিবার এপ্রিল বেলা ১টার দিকে শত শত বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ফিলিপনগরে অবস্থিত শামীমের দরবার শরীফ ঘেরাও করেন। এক পর্যায়ে উত্তেজিত জনতা দরবারে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও একাধিক কক্ষে অগ্নিসংযোগ করেন। এ সময় দরবারের ভেতরে থাকা শামীম ও তার দুই অনুসারী এলোপাতাড়ি পিটুনির শিকার হন।

 

কথিত পীর শামীম রেজা স্থানীয়ভাবে ভণ্ড পীর হিসেবে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে নিজেকে কখনো আল্লাহ, কখনো নবী বা ভগবান দাবি করার অভিযোগ রয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডে দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছিল।

 

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কথিত পীর শামীম রেজা ওরফে শামীম জাহাঙ্গীরের দেওয়া পবিত্র কোরআন অবমাননাকর বক্তব্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছড়িয়ে পড়লে এলাকাবাসী ও ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। পরে তারা সংঘবদ্ধ হয়ে বিক্ষোভ মিছিল বের করে তার দরবার বা আস্তায় হামলা চালায়। এসময় হামলকারীরা শামীম রেজাকে এলোপাতাড়িভাবে কুপিয়ে ও পিটিয়ে গুরুতর জখম করে আস্তানায় আগুন জ্বালিয়েদেয়।

 

শামীমের ভক্তরা আশংকজনক অবস্থায় শামীমকে উদ্ধার করে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে সেখান কার কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। খবর পেয়ে দৌলতপুর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।

 

আজ রবিবার সরেজমিনে ঘটনাস্থলে গিয়ে জানা যায়,উপজেলার ফিলিপনগরে নিহত পীর আবদুর রহমানের ভক্ত জামিরন বলেন গতকাল শনিবার দুপুরের দিক আমি দরবারের গেটের সামনে দাড়া ছিনু। দেখনু বেশ কিচ্ছু লােকজন রড–লাঠি নিয়ে মিছিল করছে। এরপর দরবারের গেট ভাঙচুর শুরু ভিতরে প্রবেশ করে তারা স্লোগান দিতে দিতে দরবারের ভিতরে ঢুকেই ভাঙচুর শুরু করতে থাকে। দরবারের দোতলায় বাবার (পীর) ঘরের সামনে যায় তারা। দরজা লাথি দিয়ে ভাঙে শুরু করে। এক পর্যায়র ভিতরে গিয়ে বাবাকে গলায় থাকা লার গামছা ধরে টেনে বের করে হাতে থাকা রড দিই বেদম মারপীট করতে থাকে।

 

এলোপাতাড়ি ভাবে মাথায় মারতে থাকে। টেনেহিঁচড়ে নিচে নামায়। সেখানে একজন বলতে থাকে, শালা ভন্ড এখন বাইচে আছেরে এ কথা বলে আবার মারতে থাকে পীরকে। মার ঠেকাতে গেলে আরেক ভক্ত রিমা খাতুন। হামলার সময় জামিরন তাঁর ডান হাতের মাঝখানের আঙুলের মাঝে আঘাত পায়। তিনি দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স চিকিৎসা নিয়েছেন।

 

আজ রোববার বেলা সারে১২টার দিকে দরবারের সামনে একটি বাড়িতে বসে জামিরনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলতে থাকেন, বাবাকে মারতে মারতে নিচে নিয়ে আসা হয়। প্রথম যখন বাবাকে বের করে, তখন বাবা হাতজোড় করেছিল। কথা বলার সুযোগ চেয়েছিল। কিন্তু এলোপাতাড়ি যেভাবে মারছিল, কেউ তাঁর কথা শোনেনি। নিচে নামিয়ে যখন রড দিয়ে এলোপাতাড়ি মাথায়, মুখে, নাকের ওপর কোপাচ্ছিল, তখন একবার শুধু বলতে শোনা গেছে ‘ইয়া মুরশিদ’ এরপর আর কোনো কথা বাবা বলতে পারেননি।

 

জামিরন আরও বলেন, যারা লাঠিসোঁটা নিয়ে এসেছিল, তারা সংখ্যায় প্রায় ৮০ থেকে ৯০ জন। বয়স ১৫ থেকে ২৫ বছরের এর মধ্যে। কেউ কেউ বড় ছিল। তিনি আরও বলেন, তাদের আসা দেখে আমরা ভেবেছিনু হয়তো কোনো আলোচনা করতে আসছে। কিন্তু তারা ভাঙচুর, হামলা, বাবাকে মেরে ফেলবে এটা বুঝতে পারিনি। পরে বুঝছি তারা প্রস্তুতি নিয়ে আইছিল। পরিকল্পনা করে বাবাকে হত্যা করেছে।

 

দরবারে সরেজমিনে দেখা গেল, দুটি দালানের ভেতরে ব্যাপক ভাঙচুর করা হয়েছে। আগুনে ছাই হয়ে গেছে দুটি আধা পাকা ঘর। একটি ঘর থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছিল। ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে–ছিটিয়ে পড়ে আছে। আশেপাশের বিভিন্ন বয়সী নারী, পুরুষ, শিশু দরবারের এসে নীরব দাঁড়িয়ে আছে। দরবারের সামনে ১৫ থেকে ২০ জন পুলিশ সদস্য চেয়ার পেতে বসে আছেন।

 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, পীর শামীম পবিত্র কোরআন সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন,কয়েক বছর আগের ৩০ সেকেন্ডের এমন একটি ভিডিও গত শুক্রবার সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল শনিবার সকালে শামীমের দরবার থেকে আধা কিলোমিটার দূরে আবেদের ঘাট এলাকায় শতাধিক মানুষ জড়ো হন। এরপর দুপুরের পর তাঁরা ওই দরবারে হামলা চালান এবং পুলিশের উপস্থিতিতেই শামীমকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করেন।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ১৮ মিনিটের একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, গ্রামের পাকা সড়কে শতাধিক মানুষ স্লোগান দিয়ে শামীমের দরবারের দিকে যান। মিছিলে থাকা লোকজনের একটি অংশ তাঁর দরবারের একতলা দুটি পাকা ভবন ও একটি টিনশেড ঘরে ঢুকে পড়ে। তাঁরা ভবনের ছাদসহ ঘরগুলোতে ভাঙচুর চালান ও আগুন ধরিয়ে দেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা গেছে, হামলার সময় ওই দরবারের ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচ থেকে সাতজন আহত হয়েছেন। অন্যরা দৌড়ে চলে যান। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা এসে আগুন নেভান।পাশাপাশি পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

 

এ ঘটনায় গতকাল গণসংহতি আন্দোলন, জাতীয় নাগরিক পার্টি, এবি পার্টি, উদীচী, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও সুফি সমাজকেন্দ্রিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘মাকাম’সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন পৃথক বিবৃতি দেয়। বিবৃতিতে তারা পীর শামীম রেজা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে।

 

এর আগেও ২০২১ সালের মে মাসে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতসহ বিভিন্ন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে দৌলতপুর থানায় মামলা দায়ের করা হয়। সে সময় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর মুক্তি পেয়ে তিনি পুনরায় একই ধরনের কর্মকাণ্ড শুরু করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পীরের আস্তানায় হামলা চালিয়ে হত্যার ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি। আজ শনিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ নিন্দা জানানো হয়েছে।

 

কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য রেজা আহম্মেদ বাচ্চু মোল্লা বলেন, ‘আমি ঢাকা থেকে ফেরার পথে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যাই। কেউ যদি সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, সেটা প্রশাসন দেখবে। হত্যা করার অধিকার কাউকে দেয়নি। সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রশাসন এর বিচার করবে।’

 

পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু এবং সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদের স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগকে কেন্দ্র করে পীর দাবিকারী ব্যক্তিকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা এবং তাঁর দরবারে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ন্যক্কারজনক ঘটনায় গভীর উদ্বেগ, তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন আমার বাংলাদেশ (এবি পার্টি)।

 

এক যৌথ বিবৃতিতে দুই নেতা বলেন, কোনো অভিযোগ বা মতভিন্নতার জবাব কখনোই দলবদ্ধ সন্ত্রাস, সহিংসতা কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার মাধ্যমে হতে পারে না। এ ধরনের বর্বরতা শুধু মানবিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করে না বরং রাষ্ট্রের আইনের শাসন ও বিচারব্যবস্থাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।

 

দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তৌহিদুল হাসান তুহিন জানান, শামীমের মুখমণ্ডলে ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। শরীরের বিভিন্ন স্থানেও আঘাত করা হয়েছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে।

 

এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহামুদ জানান, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যা তারা দেখেছেন। ভিডিওটি পুরোনো বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভিডিওটি দেখে মুসল্লি ও বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী তার আস্তানায় হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা আছে।

 

তিনি আরও জানান, নিহতের মরদেহ কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। ময়নাতদন্তের কাজ আজ রবিবার দুপুরে শেষ হলে নিজ এলাকায় পীরের লাশ আনা হয়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কেউ মামলা করেনি। তবে মামলার প্রস্তুতি চলছে।

 

কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) জানান, বেলা ১টার দিকে মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। গোটা শরীরে একাধিক জখমের চিহ্ন পাওয়া গেছে এবং মাথা, ঘাড়, পিঠে তুলনামূলক গভীর যখমের আলামত দেখা যায়। একাধিক যখমের কারণে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে।

 

কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, পুরোনো একটি ভিডিও নতুন করে ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশ তাকে উদ্ধার করলেও জনতার তুলনায় সদস্য সংখ্যা কম থাকায় পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের শনাক্তে কাজ চলছে। ঘটনাটি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

 

জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি শান্ত। বিজিবির টহলসহ সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মোতায়েন রয়েছেন। আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বাড়িতেও পুলিশি পাহারা থাকবে। এ ছাড়া দৌলতপুরের হোসেনাবাদের বাসিন্দা লালন শিল্পী শফি মণ্ডলের গ্রামের বাড়িতে ও পুলিশ পাহারা রাখা হয়েছে। যদিও শফি মণ্ডল বর্তমানে ঢাকায় রয়েছেন।

 

সকালে খুলনা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজ শেখ জয়নুদ্দিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সাংবাদিকদের জানান, যে হত্যাকাণ্ড হয়েছে এটা কোন ভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিলে আমাদের প্রচলিত আইনেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতো। আমি চাইবো এই ফিলিপনগর এলাকার মানুষের কাছ থেকে আর কোনো আইনশৃঙ্খলার অবনতি যেন না হয়। আমাদের কোনো আটক নেই এখনও। আমরা এর সঠিক বিচার করবো।

 

কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য রেজা আহম্মেদ বাচ্চু মোল্লা বলেন, আমি ঢাকা থেকে ফেরার পথে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যাই। কেউ যদি সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, সেটা প্রশাসন দেখবে। হত্যা করার অধিকার কাউকে দেয়নি। সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রশাসন এর বিচার করবে।

 

ঘটনার পর থেকে ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশ, বিজিবি, সেনাবাহিনী ও র‌্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসক ও স্থানীয় সংসদ সদস্যও ঘটনাস্থল ঘুরে দেখেছেন।

 

কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, পুরোনো একটি ভিডিও নতুন করে ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তাঁকে (পীর শামীম) উদ্ধার করলেও জনতার তুলনায় পুলিশ সদস্য সংখ্যা কম থাকায় পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের শনাক্তে কাজ চলছে। ঘটনাটি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে।

 

নিহত আব্দুর রহমান ওরফে শামীম (৫৫) পীরের ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ তাঁর গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হচ্ছে। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে পাঁচ’শ বিঘার মাঠ এলাকার কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।

 

জানা যায়, জীবিতাবস্থায় তিনি উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের দারোগার মোড় এলাকায় তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘শামীম বাবার দরবার শরিফে’ই সমাহিত হতে চেয়েছিলেন। তবে নানা রাজনৈতিক ও সামাজিক জটিলতায় পরিবার তাঁকে গ্রামের বাড়িতে সমাহিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।