আলিফ হোসেনঃ
রাজশাহীর তানোর উপজেলা খাদ্য শস্যে উদ্বৃত্ত ইরি-বোরো ধান কাটা-মাড়াইয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে কৃষক। উপজেলার মাঠে মাঠে চলছে এ কর্মযজ্ঞ।তবে শেষ মুহুর্তে শ্রমিক সংকটে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে কৃষকদের। এক সপ্তাহের ব্যবধানে বিঘাপ্রতি ধান কাটায় মজুরি বেড়েছে অন্তত দেড় হাজার টাকা। হাট-বাজারে ধানের কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কৃষক। প্রাকৃতিক দুর্যোগে মাঝেমধ্যে বৃষ্টি কৃষকদের জন্য মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় বোরো চাষ হয়েছে ১৪ হাজার ১৩০ হেক্টর জমিতে।এর মধ্যে উপজেলার চান্দুড়িয়া থেকে কামারগাঁ ইউপির চৌবাড়িয়া মালশিরা পর্যন্ত বিলের জমিতে আগাম বোরো চাষ হয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর।
এদিকে মাঠে মাঠে দোল খাচ্ছে কৃষকের সোনালি স্বপ্ন ধান। দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর পরিচর্যার পর সেই সোনাফলা ধান এখন কৃষকের গোলায় ওঠার অপেক্ষা। কিন্তু গত কয়েকদিন থেকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ কৃষকের সেই স্বপ্নে হানা দিয়েছে। বৈশাখের আকাশে মেঘের ঘনঘটা চলছে। মাঝেমধ্যে ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছে। ঝড়ো হাওয়ায় ধান মাটিতে হেলে পড়েছে। জমিতে পানি জমেছে। এতে কৃষকের স্বপ্নগুলো দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।বিশেষ করে উজানের পানিতে বিল পাড়ের বোরো চাষিরা পড়েছেন চরম বিপাকে। অনেকের পাকা ও আধাপাকা ধান ডুবে গেছে।অন্যদিকে জ্বালানি তেল ও শ্রমিক সংকটে ধান ঘরে তোলা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়তে হয়েছে। এক সপ্তাহ আগেও প্রতি বিঘায় ধান কাটার মজুরি ছিল ৪ থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা। এখন তা বেড়ে হয়েছে ৬ হাজার থেকে সাড়ে ৬ হাজার।
এছাড়া ৬০০-৭০০ টাকার দিনমজুরি এখন বেড়ে হয়েছে ৮০০-৯০০ টাকা। প্রতি বিঘায় ধান মাড়াই ছিল ৫০০ টাকা। তেলের দাম এখন বৃদ্ধি হওয়ায় ৮০০ টাকা গুনতে হচ্ছে কৃষকদের। হাট-বাজারে প্রকারভেদে শুকনা ধান লম্বা জিরাশাইল ১ হাজার ১০০-১৫০ টাকা, খাটো জিরাশাইল ৯০০ টাকা থেকে ১ হাজার এবং সুফলতা ৮০০-৮৫০ টাকা মনদরে বিক্রি হচ্ছে। হালকা ভিজা ধান প্রকারভেদে ৮শ থেকে এক হাজার টাকা মন। এদিকে কৃষকের সামনে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি, কৃষিযন্ত্র ও শ্রমিক সংকট। সেচ মৌসুমে জ্বালানি সংকট সামাল না দিতেই এখন ফসল কাটা, মাড়াই ও পরিবহন নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারা।
মাঠ পর্যায়ের কৃষক, কৃষিযন্ত্র মালিক, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধান উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়া জ্বালানি নির্ভর। জমিতে সেচ দেওয়া থেকে শুরু করে ধান কাটা, মাড়াই, পরিবহন ও বাজারজাত সবকিছুতেই ডিজেল অপরিহার্য। ফলে সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেই সরাসরি প্রভাব পড়ছে উৎপাদন খরচ ও ফসল ঘরে তোলার ওপর।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়ের মধ্যে ধান ঘরে তুলতে না পারলে শুধু কৃষক নয়, পুরো দেশের খাদ্যব্যবস্থাই ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ফলে কৃষিতে ডিজেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
জ্বালানি নির্ভর কৃষি, পাঁচ ধাপে ডিজেলের ব্যবহার বর্তমানে ধান কাটার প্রতি ধাপেই জ্বালানি অপরিহার্য। ধান কাটা, মাড়াই, জমি থেকে সংগ্রহ, পরিবহন এবং আড়তে পৌঁছানো পর্যন্ত অন্তত পাঁচটি ধাপে ডিজেল ব্যবহার করতে হয়। শ্রমিক সংকট ও মজুরি বাড়ার কারণে কৃষকরা এখন ক্রমেই যন্ত্রনির্ভর হয়ে পড়ছেন। ধান কাটার ক্ষেত্রে কম্বাইন হারভেস্টারের ব্যবহার বেড়েছে। এই যন্ত্র দিয়ে একসঙ্গে ধান কাটা, মাড়াই এবং বস্তাবন্দির কাজ করা সম্ভব। তবে এটি পুরোপুরি ডিজেলচালিত। একইভাবে থ্রেশার, বোমা মেশিন, ট্রাক্টর, ট্রলি এবং নৌযান জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।কিন্ত্ত তানোরে ডিজেল চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অপ্রতুল্য হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা।
তানোরের পাঁচন্দর ইউনিয়নের (ইউপি)কৃষক দুরুল হুদা জানান, তিনি এবার তিন একর জমিতে ধান চাষ করেছেন। শ্রমিক সংকট ও উচ্চ মজুরির কারণে যন্ত্রের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু ১০৩ টাকার ডিজেল তাঁকে ১৩০ টাকায় কিনতে হয়েছে। এতে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ধান কাটার পুরো সময় যদি এই সংকট থাকে, তাহলে কৃষকরা বড় ক্ষতির মুখে পড়বেন।
কৃষক সাহেব আলী জানান, বিগত বছরগুলোতে ধান কাটার আগেই শ্রমিকরা জমি দেখে যেতো কখন কাটা হবে, কখন আসতে হবে। কিন্তু এবারের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। ধান পেকে গেছে, কাটার সঠিক সময়। কিন্তু শ্রমিক মিলছে না। তালন্দ এলাকার কৃষক আমিনুল, আরশাদসহ অনেকে জানান, ধানের চাষাবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না। সারের সংকট, জ্বালানির সংকট, দামে ধস সব মিলিয়ে শ্রমিক সংকটে ধান কাটা যাচ্ছে না। এক মণ (৩৮কেজি) ধানের দাম ১১০০ টাকা থেকে ১১২০ টাকা। কিন্তু শ্রমিকের মজুরি দিতে হচ্ছে ৮শ’ টাকা থেকে হাজার টাকা।এবার এক বিঘা (৩৩শতক) জমিতে ধানের ফলন হয়েছে ১৬ থেকে ২০ মণ।

দেড় লাখ টাকার গাছ ৫০ হাজারে নিলাম 
আলিফ হোসেন, তানোর (রাজশাহী) প্রতিনিধি 




















