ইসমাইল হোসেন বাবু:
রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে যাত্রীবাহী সৌহার্দ পরিবহনের বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে ডুবে গিয়ে যাত্রীদের নিখোঁজ ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এদের মধ্যে কুষ্টিয়ার জুগিয়া এলাকার মর্জিনা খাতুন হাসি রয়েছেন। তার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। মর্মান্তিক এ ঘটনায় শোকে বিহ্বল এলাকাবাসী। এ সময় কান্নাজড়িত কণ্ঠে স্বজনদের বিলাপ করতে দেখা গেছে।
বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) সকাল ১০টায় পদ্মায় বাস দুর্ঘটনায় নিহত কুষ্টিয়া পৌর এলাকার বারখাদা পালপাড়া এলাকার বাসিন্দা মর্জিনা খাতুনের জানাজা শেষে জুগিয়া কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন করা হয়। সেখানে নিহতের স্বামী আবু বক্কর, ভাই, স্বজন ও প্রতিবেশীরা উপস্থিত ছিলেন এবং জানাজায় অংশ নেন।
ঢাকায় বসবাসরত চিকিৎসক মেয়ের বাসায় যাওয়ার জন্য রাজবাড়ীর পাংশা থেকে সৌহার্দ পরিবহনের বাসে ওঠেন স্থানীয় পল্লী বিদ্যুতের বিলিং সুপারভাইজার মর্জিনা খাতুন। এর ঘণ্টাখানেক পরই মৃত্যুর খবর পান পরিবারের সদস্যরা। বাস দুর্ঘটনাকে দায়িত্বে অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার ফল হিসেবে দেখছেন স্বজন ও এলাকাবাসী। তারা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিচার দাবি করেছেন।
এদিকে জেলার খোকসায় নিহত আরও তিনজনের লাশ পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন আয়েশা সিদ্দিকা, রাজীব বিশ্বাস ও তিন বছরের শিশু ইস্রাফীল।
মর্জিনা খাতুন হাসি— যাকে ‘হাসি আপা’ নামে চিনতেন পুরো এলাকার মানুষ— ছিলেন অত্যন্ত হাসিখুশি ও মিশুক স্বভাবের। সবার খোঁজখবর রাখতেন তিনি। তার এই চিরবিদায়ে এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনদের মধ্যে বইছে কান্নার রোল; হাসিকে হারিয়ে শোকাহত পুরো এলাকা।
রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ায় ফেরিতে উঠতে গিয়ে সৌহার্দ পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস উল্টে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। বাসটিতে চালক-হেলপারসহ অন্তত ৫০ জন যাত্রী ছিল বলে নিশ্চিত করেছেন সৌহার্দ পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার তন্ময় আহমেদ।
বাসটি বুধবার (২৫ মার্চ) দুপুর আড়াইটার দিকে কুষ্টিয়ার কুমারখালী পৌর বাস টার্মিনাল থেকে শিশুসহ ৮ জন যাত্রী নিয়ে ছেড়ে যায়। এরপর বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে ফেরিতে উঠতে গিয়ে নদীতে পড়ে যায় বাসটি। কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে তিনজন যাত্রী নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে পাঁচজন যাত্রী সাঁতরে তীরে উঠতে পেরেছেন বলে জানা গেছে।
কুমারখালী থেকে বাসে ওঠা যাত্রীদের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন— গিয়াস উদ্দিন রিপন (৪৫), তার স্ত্রী লিটা খাতুন (৩৭) এবং তাদের সন্তান আবুল কাসেম সাফি (১৭) ও আয়েশা বিনতে গিয়াস (১৩)। গিয়াস খোকসা উপজেলার শোমসপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি কুমারখালী পৌর ভবন এলাকার মৃত বকুল বিশ্বাসের জামাতা। শ্বশুরবাড়িতে ঈদের ছুটি কাটিয়ে পরিবার নিয়ে নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ঢাকার তাকওয়া ফুড প্রোডাক্টের কারখানায় ফিরছিলেন।
বাকিরা হলেন— মো. নুরুজ্জামান (৩২), তার স্ত্রী আয়েশা আক্তার (৩০) এবং তাদের সন্তান নওয়ারা আক্তার (৪) ও আরশান (৭ মাস)। তারা ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার কচুয়া ইউনিয়নের খোন্দকবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা। নুরুজ্জামান ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। এই দুই পরিবারের মধ্যে আয়েশা আক্তার, আরশান ও আয়েশা বিনতে গিয়াস নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্বজনরা।
নুরুজ্জামান জানান, ফেরিতে ওঠার সময় তিনি ও বড় মেয়ে বাস থেকে নেমে যান, কিন্তু স্ত্রী ও ছোট মেয়ে বাসে ছিলেন। পরে বাসটি নদীতে পড়ে গেলে তাদের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি।
গিয়াস উদ্দিন রিপন জানান, তার স্ত্রীকে উদ্ধার করা গেলেও মেয়ে আয়েশার এখনও সন্ধান মেলেনি।
সৌহার্দ পরিবহনের কুমারখালী বাস কাউন্টার মাস্টার তন্ময় আহমেদ জানান, বাসটি প্রথমে ৬ জন যাত্রী নিয়ে ছেড়ে গেলেও পথে খোকসা, মাছপাড়া ও পাংশা থেকে আরও যাত্রী ওঠেন।
হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল থেকে ১৪ জনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং আরও পাঁচটি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। এছাড়া গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে দুটি মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে।
কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা জানান, কুমারখালী থেকে শিশুসহ ৮ যাত্রী নিয়ে বাসটি ছেড়ে গিয়েছিল। তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২৬ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তাপস কুমার পাল জানান, নিহতদের মধ্যে ১১ জন নারী, ৮ জন শিশু ও ৭ জন পুরুষ রয়েছেন।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পন্টুন থেকে যাত্রীবাহী বাস পদ্মা নদীতে তলিয়ে যাওয়ার ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ২৬ জনে দাঁড়িয়েছে। উদ্ধার অভিযান ও শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া শেষে নিহতদের মধ্যে ২৩ জনের পরিচয় নিশ্চিত করেছে জেলা প্রশাসন। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ২২ জনের মরদেহ তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

দেড় লাখ টাকার গাছ ৫০ হাজারে নিলাম 
ইসমাইল হোসেন বাবু, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার 





















