শাকিল মিয়াঃ
আমন ইরি ধান চাষের মৌসুম শুরু হলেও কৃষকরা পড়েছেন চরম বিপাকে। রোপণের আগেই বাজার থেকে কেনা ধানের বীজে শীষ বের হয়ে আসছে। এতে পুরো মৌসুমের স্বপ্ন ভেঙে গেছে পাথরঘাটার প্রান্তিক কৃষকদের।
বৃহস্পতিবার ১৮ সেপ্টেম্বর পাথরঘাটা পৌরসভার গোলত্বরে প্রায় ২ শতাধিক কৃষক মানববন্ধন করে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: মিজানুর রহমান এর বরাবর স্মারকলিপি জমা দিয়ে ডিলারের কাছ থেকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরন দাবি করেছে। পরে তারা পাথরঘাটা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে ডিলারের বিরুদ্ধে।
উপজেলায় নকল ধানের বীজ রোপণ করে ৪৫৬ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।যার উপযুক্ত ধানের মূল্য গিয়ে দাড়াতো ৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। কৃষি বিজ্ঞানের ভাষায় এ ধরনের বীজ অস্বাভাবিক যা কৃষকদের জন্য ক্ষতিকর।
কৃষক ফিরোজ মিয়া বলেন, আমরা নিঃস্ব হয়ে গেলাম, ডিলার নাসির সরদার আমাদের সাথে প্রতারণা করে নকল বীজ দিয়েছে। এখন পরিবার নিয়ে পথে বসা ছাড়া আর কোন উপায় নেই।
কৃষক ইব্রাহিম মুন্সী বলেন আমি ডিলারের দোকানের সামনে গিয়ে চালের ভীতরে দেয়া গ্যাসের ঔষধ খেয়ে আত্মহত্যা করা ছাড়া আর কোন পথ খোলা নেই, বউ এর নাকের আংটি বন্ধক রেখে ধার করে জমি চাষ করেছি এখন কী করবো, মাথায় কাজ করেনা।
সরজমিন ঘুরে দেখা যায়, বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলার এই ধরনের ভেজাল বীজের কারণে একদিকে কৃষকের মূলধন নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ধানের ফলনও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এতে কয়েক শতাধিক কৃষকের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং শতাধিক মেট্রিকটন ধান নষ্ট হয়েছে বলে কৃষকরা অভিযোগ করেছেন ।
ভুক্তভোগী কৃষকের প্রতি কেজি বীজ কিনতে গড়ে ১২০ থেকে ১৩০ টাকা ব্যয় হয়েছে, অথচ এসব বীজ বীজতলা থেকে জমিতে রোপণের আগেই অস্বাভাবিকভাবে গর্ভে শীষ বের হয়ে যাচ্ছে ।
জানা গেছে গত মৌসুমে সাউথ এশিয়ান সীডস এর ২২ নাম্বার বীজে বাম্পার ফলন হওয়ায় এ বছরেও কৃষকেরা আশায় বুক বেঁধে স্থানীয় ডিলার নাসির উদ্দিন সরদারের কাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করেছিলেন।
যে বীজ থেকে তিন মাস পর ফলন আসার কথা ছিল। কিন্তু ১৫-২০ দিন পর বীজতলা থেকে চারা গাছ তুলতে গিয়ে দেখা যায় গাছে অকালেই শীষ এসেছে । ফলে মাঠে বীজ রোপণের আগেই পুরো বীজ নষ্ট হয়ে গেছে। এতে জমি খালি পড়ে রয়েছে এবং কৃষকদের আর নতুন করে বীজতলা তৈরির সময় ও সুযোগ নেই ।
স্থানীয়দের কৃষকদের অভিযোগ, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী বিভিন্ন কোম্পানির ডিলার হয়ে অরিজিনাল কোম্পানির বস্তায় নিম্নমানের বীজ ভরে বাজারজাত করেছেন।
তবে ডিলার পয়েন্টের মালিক এ অভিযোগ অস্বীকার করে নাসির উদ্দিন সরদার দাবি করেছেন, তিনি দীর্ঘদিন সুনামের সাথে ব্যবসা করছেন। এ বছর সাউথ এশিয়ান সীডস থেকে ২৫ মেট্রিকটন বীজ কিনেছেন তিনি , এর মধ্যে মাত্র ১ মেট্রিকটনে সমস্যা হয়েছে এবং বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলে দাবী করছেন।
প্রবীন কৃষক আব্দুস সোবহান বলেন, আমি এখন আর মাঠে কাজ করতে পারি না আমার জমিটুকুই আমার শেষ সম্বল তাই এই জমিতেই চাষ করে সংসারের খরচ জোগাই, বাকি ধান বাজারে বিক্রি করে আগামী বৎসরের জন্য বীজ কেনার কাজে ব্যায় করি“আমার ৩০০ শতাংশ জমির জন্য আমি বাজারের ডিলার নাসির সরদার এর কাছে থেকে উচ্চ ফলনশীল ধানের কথা বলে বিআর -২২ বীজ ধান আমাদের দেয়, তখন আমি ২৫ কেজি বীজ কিনেছি। কিন্তু এখন দেখি অর্ধেকেরও বেশি বীজে আগেই শীষ বের হয়ে গেছে। পুরো জমি রোপণ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।”
কৃষকের বীজের ক্ষতির সত্যতা স্বীকার করে পাথরঘাটা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা এস.এম বদরুল আলম জানান,কৃষকদের অভিযোগ পত্র পেয়েছি ও তাদের কথা শুনেছি,তাদের এ ক্ষতি অপূরণীয়। বিষয়টি দেখবেন বলে কৃষকদের আশ্বাস দেন।পাশাপাশি কৃষকদের ক্ষতি পূরণের জন্য উচ্চ পর্যায়ে প্রতিবেদন পাঠানো হবে জানান। বাজারে কিছু ডিলার ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ বীজ বিক্রি করছে । এতে কৃষকরা প্রতারিত হচ্ছেন।
এ বিষয়ে জেলা কৃষি কর্মকর্তা রথিন্দ্র নাথ বিশ্বাস বলেন, বাজারে কিছু ডিলার ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ বীজ বিক্রি করছে । এতে কৃষকরা প্রতারিত হচ্ছেন।
ঠিক তেমনি পাথরঘাটা উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা ও প্রান্তিক কৃষকেরা আমাকে বিষয়টি জানিয়েছেন। তদন্ত করে ডিলারের বিরুদ্ধে কার্যকারি পদক্ষেপ গ্রহন করবো ।
পাথরঘাটা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মিজানুর রহমান বলেন আমি কৃষি কর্মকর্তার সাথে কথা বলেছি এটা আমাদের সরকারি প্রণোদনার মধ্যে নেই, কৃষকরা বাহিরের দোকান থেকে বীজ কিনে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। তবে এখানে যদি ডিলার নিম্নমানের বীজ ধান দিয়ে কৃষকের সাথে প্রতারণা করে থাকে তাহলে তাদের অভিযোগের ভিত্তিতে সত্যতা প্রমাণিত হলে আমরা ডিলারের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
সংবাদ সম্মেলনে কৃষক সমাজ বলছেন, “এখন শুধু টাকাই নয়, আমাদের সময়, শ্রম সবকিছু শেষ হয়ে গেল। নতুন করে জমি চাষ করার মতো টাকা নেই । “এভাবে ভেজাল বীজ সরবরাহের কারণে আমাদের লোকসানের মুখে পরতে হয়েছে, ঋণের বোঝা বেড়েছে, ডিলারদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নিয়ে আমরা যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি আমাদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

কুষ্টিয়া সীমান্তে বিএসএফের পুশইন চেষ্টা, বিজিবির বাধায় ফিরে গেল ৪ জন 
শাকিল মিয়া, জেলা প্রতিনিধি, বরগুনা 
























