ঢাকা , সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম
Logo কুষ্টিয়া সীমান্তে বিএসএফের পুশইন চেষ্টা, বিজিবির বাধায় ফিরে গেল ৪ জন Logo ঠাকুরগাঁওয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ও জেলা শিক্ষা অফিসের যৌথ পরিচ্ছন্নতা অভিযান Logo ১৫ বছর পর ভাঙ্গার কুমার নদে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচঃ লাখো মানুষের ঢল। Logo আলফাডাঙ্গা প্রেসক্লাবে লাইব্রেরি উদ্বোধন Logo রায়ের পর বদলে গেল গোগ্রামের পাঁচ বছরের নির্বাচনী হিসাব Logo শতবর্ষী সরকারি খাল দখলমুক্তে অভিযান, মালামাল স্পট নিলামে Logo মধুখালী থানার এএসআই শরীফুলের সাফল্য, ৬২ হারানো মোবাইল উদ্ধার Logo বিদ্যুৎ সংকটে গঙ্গাচড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সোলার-আইপিএস দিলেন জিওন Logo নরসিংদীর চরাঞ্চলে যৌথ অভিযান, অস্ত্র-গুলাবারুদ ও ১৩৬ ককটেলসহ গ্রেপ্তার ৩ Logo সারাদেশে জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস-২০২৬ পালিত
প্রতিনিধি নিয়োগ
সারা দেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রতিনিধি নিয়োগ করা হচ্ছে। আপনি আপনার এলাকায় সাংবাদিকতা পেশায় আগ্রহী হলে যোগাযোগ করুন। Hotline- +880 1728311111

জীবন সংগ্রামে পরাজিত বালিয়াকান্দির যাত্রাশিল্পী তারাপদ

-যাত্রাপালার মঞ্চ কাঁপানো অভিনেতা তারাপদ কর্মকার।

গোলাম মোর্তবা শিকদার রিজু, বালিয়াকান্দি (রাজবাড়ী) প্রতিনিধি

সত্তর দশকের যাত্রাপালার মঞ্চ কাঁপানো অভিনেতা তারাপদ কর্মকার (৭২) এখন সংসার জীবনে পরাজিত সৈনিক। যাত্রার মঞ্চে অভিনয় করে হাজার হাজার দর্শকের মন জয় করলেও শেষ বয়সে এসে তিনি এখন অসহায় হয়ে পড়েছেন। তারাপদ শুধু অভিনয় শিল্পীই নয়। একাধারে তিনি যাত্রা দলের মালিকও ছিলেন।

 

যাত্রার স্বর্ণযুগে তারাপদের অগ্রগামী নাট্য সংস্থায় জনবল ছিল প্রায় ৭৫ জনের মতো। সবার পরিবারের খরচ চলত এই দলের আয় থেকে। সেই সময়ের যাত্রাদলের মালিক এখন বিনা চিকিৎসায় ধুকছেন। ছেলে মিটুল কর্মকারের ছোট একটি চায়ের দোকন থেকে যে আয় হয় সেই অর্থ দিয়েই চলছে ৬ সদস্যের যাত্রাশিল্পী পরিবারের সংসার। অভাব-অনটনের মধ্যে দিয়েই চলছে খ্যাতিমান এই যাত্রাশিল্পীর জীবন।

 

তারাপদ কর্মকার রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দির রামদিয়া গ্রামের বাসিন্দা। শনিবার (৭ ডিসেম্বর) কথা হয় তারাপদ ও তাঁর বড় ছেলে মিটুলের সাথে। মস্তিস্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে সব সময় বিছানায় থাকতে হয় তাকে। তিন শতক জমির ওপর নির্মিত টিনের ছোট ঘরের একটি কক্ষের মধ্যেই কাটছে তার জীবন। স্পষ্ট করে বলতে পারেন না কথা। তারপরও চেষ্টা করেন অতীতের স্মৃতি স্মরণ করতে। অস্পষ্ট ভাষায় গল্প শোনাতে চান তার যৌবনের সোনালী দিনের কথা।

 

তারাপদ কর্মকারের বড় ছেলে মিটুল কর্মকার জানান, তারা সবাই যাত্রাপালার সাথে সম্পৃক্ত। অগ্রগামী নাট্য সংস্থা নামে তাদের সরকারি অনুমোদিত একটি যাত্রা দল ছিল। সেখানে ৭৫ জনের মতো শিল্পী ও কলা-কৌশলী ছিলেন। তার মা রেনুকা কর্মকার এবং বাবা দুজনই যাত্রাশিল্পী। তিনি নিজেও বাদ্যযন্ত্র শিল্পী। তার স্ত্রী লক্ষী কর্মকার প্রিন্সেস (নায়িকা) ছিলেন। এক সময় তাদের সুখের সংসার ছিল। কোন অভাব তাদের ছিলনা। কিন্তু সময়ের আবর্তনে যাত্রাশিল্পে ধস নামলে তাদের জীবনেও নেমে আসে অন্ধকার।

 

তিনি আরও জানান, ছোট বসত বাড়ীটি ছাড়া তাদের কোন সম্পত্তি নেই। চায়ের দোকান থেকে যে আয় হয় তাই দিয়েই চলতে হয়। তার বাবা ২০০৬ সালে স্টক করেন। সেই থেকে ঘরের মধ্যেই থাকতে হয় তাকে। তার যে ওষুধের প্রয়োজন সেটা তিনি মেটাতে পারছেন না। বিনা চিকিৎসায় তার বাবার এখন দিন কাটাতে হচ্ছে। বয়স্ক ভাতা ছাড়া আর কোন সরকারি সহযোগিতা পাননা তিনি। তবে বেশ কয়েক মাস আগে তিনি সমাজসেবায় আর্থিক সহযোগিতার জন্য আবেদন করেছেন। রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা আর্থিক সহযোগিতা পাওয়ার বিষয়ে তিনি সার্বিক সহযোগিতা করবেন বলে জানিয়েছেন। যাত্রাশিল্পী হিসেবেও মেলেনি কোন সম্মাননা।

 

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কবি সুজয় কুমার পাল বলেন, বাঙালি জীবনের একটি গৌরবময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য যাত্রাপালা। অসম্প্রদায়িক চেতনা ও সাম্য মৈত্রীর আহবান উচ্চারিত হয় যাত্রাপালার শিল্পীদের কণ্ঠে। প্রশাসনিক জটিলতা, ভীনদেশীয় সংস্কৃতির আগ্রাসন আর আকাশ সংস্কৃতির অবাধ বিচরণের ফলে আজ ধ্বংসের মুখে দেশীয় যাত্রা শিল্প। যাত্রাশিল্প ধ্বংসের সাথে সাথে যাত্রার সাথে সম্পৃক্ত সাংস্কৃতিকমনা মানুষগুলোও এখন নিদারুণ কষ্টে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সরকারি দপ্তরগুলোর উচিত এদের দিকে বিশেষ নজর দেয়া।

 

জেলা কালচারাল কর্মকর্তা পার্থ প্রতিম দাস জানান, সরকারি ভাবে যাত্রা বন্ধের কোন নির্দেশনা নেই। বরং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় দেশের যাত্রাশিল্প রক্ষায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন। এরই মধ্যে নভেম্বরে ঢাকাতে সপ্তাহব্যাপী যাত্রা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাছাড়া প্রতিটি জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার মহোদয়ের কাছে একটি চিঠি প্রদান করেছে। তাতে উল্লেখ করা হয়েছে, যদি কোন নিবন্ধিত দল যাত্রা করার করার জন্য অনুমতি চান তাহলে সেটা ১ সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে।

Tag :
এই অথরের আরো সংবাদ দেখুন

জনপ্রিয় সংবাদ

জাতি, ধর্ম, বর্ণের মধ্যে বিভেদ হতে দেব না : ড. মঈন খান

error: Content is protected !!

জীবন সংগ্রামে পরাজিত বালিয়াকান্দির যাত্রাশিল্পী তারাপদ

আপডেট টাইম : ০৬:২৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ৮ ডিসেম্বর ২০২৪
গোলাম মোর্তবা শিকদার রিজু, বালিয়াকান্দি (রাজবাড়ী) প্রতিনিধি :

গোলাম মোর্তবা শিকদার রিজু, বালিয়াকান্দি (রাজবাড়ী) প্রতিনিধি

সত্তর দশকের যাত্রাপালার মঞ্চ কাঁপানো অভিনেতা তারাপদ কর্মকার (৭২) এখন সংসার জীবনে পরাজিত সৈনিক। যাত্রার মঞ্চে অভিনয় করে হাজার হাজার দর্শকের মন জয় করলেও শেষ বয়সে এসে তিনি এখন অসহায় হয়ে পড়েছেন। তারাপদ শুধু অভিনয় শিল্পীই নয়। একাধারে তিনি যাত্রা দলের মালিকও ছিলেন।

 

যাত্রার স্বর্ণযুগে তারাপদের অগ্রগামী নাট্য সংস্থায় জনবল ছিল প্রায় ৭৫ জনের মতো। সবার পরিবারের খরচ চলত এই দলের আয় থেকে। সেই সময়ের যাত্রাদলের মালিক এখন বিনা চিকিৎসায় ধুকছেন। ছেলে মিটুল কর্মকারের ছোট একটি চায়ের দোকন থেকে যে আয় হয় সেই অর্থ দিয়েই চলছে ৬ সদস্যের যাত্রাশিল্পী পরিবারের সংসার। অভাব-অনটনের মধ্যে দিয়েই চলছে খ্যাতিমান এই যাত্রাশিল্পীর জীবন।

 

তারাপদ কর্মকার রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দির রামদিয়া গ্রামের বাসিন্দা। শনিবার (৭ ডিসেম্বর) কথা হয় তারাপদ ও তাঁর বড় ছেলে মিটুলের সাথে। মস্তিস্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে সব সময় বিছানায় থাকতে হয় তাকে। তিন শতক জমির ওপর নির্মিত টিনের ছোট ঘরের একটি কক্ষের মধ্যেই কাটছে তার জীবন। স্পষ্ট করে বলতে পারেন না কথা। তারপরও চেষ্টা করেন অতীতের স্মৃতি স্মরণ করতে। অস্পষ্ট ভাষায় গল্প শোনাতে চান তার যৌবনের সোনালী দিনের কথা।

 

তারাপদ কর্মকারের বড় ছেলে মিটুল কর্মকার জানান, তারা সবাই যাত্রাপালার সাথে সম্পৃক্ত। অগ্রগামী নাট্য সংস্থা নামে তাদের সরকারি অনুমোদিত একটি যাত্রা দল ছিল। সেখানে ৭৫ জনের মতো শিল্পী ও কলা-কৌশলী ছিলেন। তার মা রেনুকা কর্মকার এবং বাবা দুজনই যাত্রাশিল্পী। তিনি নিজেও বাদ্যযন্ত্র শিল্পী। তার স্ত্রী লক্ষী কর্মকার প্রিন্সেস (নায়িকা) ছিলেন। এক সময় তাদের সুখের সংসার ছিল। কোন অভাব তাদের ছিলনা। কিন্তু সময়ের আবর্তনে যাত্রাশিল্পে ধস নামলে তাদের জীবনেও নেমে আসে অন্ধকার।

 

তিনি আরও জানান, ছোট বসত বাড়ীটি ছাড়া তাদের কোন সম্পত্তি নেই। চায়ের দোকান থেকে যে আয় হয় তাই দিয়েই চলতে হয়। তার বাবা ২০০৬ সালে স্টক করেন। সেই থেকে ঘরের মধ্যেই থাকতে হয় তাকে। তার যে ওষুধের প্রয়োজন সেটা তিনি মেটাতে পারছেন না। বিনা চিকিৎসায় তার বাবার এখন দিন কাটাতে হচ্ছে। বয়স্ক ভাতা ছাড়া আর কোন সরকারি সহযোগিতা পাননা তিনি। তবে বেশ কয়েক মাস আগে তিনি সমাজসেবায় আর্থিক সহযোগিতার জন্য আবেদন করেছেন। রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা আর্থিক সহযোগিতা পাওয়ার বিষয়ে তিনি সার্বিক সহযোগিতা করবেন বলে জানিয়েছেন। যাত্রাশিল্পী হিসেবেও মেলেনি কোন সম্মাননা।

 

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কবি সুজয় কুমার পাল বলেন, বাঙালি জীবনের একটি গৌরবময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য যাত্রাপালা। অসম্প্রদায়িক চেতনা ও সাম্য মৈত্রীর আহবান উচ্চারিত হয় যাত্রাপালার শিল্পীদের কণ্ঠে। প্রশাসনিক জটিলতা, ভীনদেশীয় সংস্কৃতির আগ্রাসন আর আকাশ সংস্কৃতির অবাধ বিচরণের ফলে আজ ধ্বংসের মুখে দেশীয় যাত্রা শিল্প। যাত্রাশিল্প ধ্বংসের সাথে সাথে যাত্রার সাথে সম্পৃক্ত সাংস্কৃতিকমনা মানুষগুলোও এখন নিদারুণ কষ্টে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সরকারি দপ্তরগুলোর উচিত এদের দিকে বিশেষ নজর দেয়া।

 

জেলা কালচারাল কর্মকর্তা পার্থ প্রতিম দাস জানান, সরকারি ভাবে যাত্রা বন্ধের কোন নির্দেশনা নেই। বরং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় দেশের যাত্রাশিল্প রক্ষায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন। এরই মধ্যে নভেম্বরে ঢাকাতে সপ্তাহব্যাপী যাত্রা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাছাড়া প্রতিটি জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার মহোদয়ের কাছে একটি চিঠি প্রদান করেছে। তাতে উল্লেখ করা হয়েছে, যদি কোন নিবন্ধিত দল যাত্রা করার করার জন্য অনুমতি চান তাহলে সেটা ১ সপ্তাহের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে।